আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

আফগানিস্তান: ভারত মহাসাগরে ক্ষমতার রাজনীতি

ISSUE-4-ENG-09-11-2020-Afg

আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর কাছে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই শক্তিগুলো মনে করে এই অঞ্চলে তাদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে। কারণ এখানে বিপুল সম্পদ, বিশাল জনগোষ্ঠি ও ভোক্তা বাজার রয়েছে। এই অঞ্চলের ব্যাপারে তাদের পদক্ষেপ ও নীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গতি নির্ধারণ করে দেয়। তাই দেখা দরকার যে বৃহৎ পরাশক্তিগুলো এই অঞ্চলের ব্যাপারে ব্যাপারে কিভাবে কৌশল সাজাচ্ছে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কি পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং সার্বিকভাবে এই সব পদক্ষেপের পরিণতি কি হতে পারে। 

যুক্তরাষ্ট্র

ভারত মহাসাগর অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক এবং সামরিক শক্তি বাড়ানোর দিকে তাদের মনোযোগ বেশি। ট্রাম্প প্রশাসন যে ইন্দো-প্রশান্ত কৌশল গ্রহণ করেছে এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরকে মিলিয়ে অভিন্ন ক্ষেত্র ঘোষণা দিয়েছে, সেখান থেকে তাদের কৌশল বোঝা যায়। নাম আলাদা হলেও কৌশলের দিক থেকে ওবামা প্রশাসনের এশিয়া-প্রশান্ত রিব্যালান্স নীতি থেকে এর খুব একটা পার্থক্য নেই। ওবামার কৌশলগুলোই ইন্দো-প্রশান্ত কৌশলের মধ্যে আছে। পার্থক্য হলো ইন্দো-প্রশান্ত কৌশল ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট থেকে বেরিয়ে এসেছে। 

ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলের অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে ভারতের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে চাচ্ছে। জর্জ ডাব্লিউ বুশের কোয়াড গঠনের ধারণাটাও এই কৌশলের সাথে জড়িত। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে নিয়ে এই কোয়াড গঠিত। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার এবং চীনা প্রভাবের মোকাবেলা করা। বাস্তবে এ অঞ্চলে চীনের বিপরীতে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার শক্তি হিসেবেই ভারতকে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। 

তবে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক কৌশলকে বুঝতে হলে ইন্দো-প্রশান্ত কৌশলকে তাদের দক্ষিণ এশিয়া নীতির সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে, যে নীতির অধীনে তারা পাকিস্তানকে সন্ত্রাস দমন তৎপরতা বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়েছে এবং আফগান ইস্যু সমাধানের চেষ্টা করেছে। এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এর একটি কারণ হলো চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর (সিপিইসি)। সিপিইসির মাধ্যমে চীনের বেল্ট অ্যাণ্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়িত হচ্ছে, যেটা উপসাগরীয় ও আফ্রিকান দেশগুলোর সাথে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। একই সাথে এই প্রকল্প পাকিস্তানকেও বিআরআই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যাবে। 

এ কারণেই ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে নিরাপত্তামুখী হিসেবে বিবেচনা করা যায়। মূলত চীন, রাশিয়া আর ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কেন্দ্র করেই এখানে মার্কিন কৌশল সাজানো হয়েছে। 

চীন

চীন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে তাদের মহাপরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ মনে করে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল তাদের ম্যারিটাইম সিল্ক রোডের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেটা বৃহৎ বিআরআইয়ের একটা অংশ। চীনের ভারত মহাসাগর নীতি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। পূর্ব এশিয়া থেকে পারস্য উপসাগর এবং আফ্রিকা মহাদেশ সবই তাদের কৌশলের অংশ। তাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো সিপিইসি বাণিজ্য করিডোর। পশ্চিম চীন থেকে শুরু হয়ে পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে গিয়ে গোয়াদর বন্দরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত হয়েছে এটা। বহু বিলিয়ন ডলারের এই কর্মসূচির মধ্যে উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্প রয়েছে, এবং এর উদ্দেশ্য হলো চীনের সাথে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকান দেশগুলোর বাণিজ্য আরও গতিশীল করা। 

চীন একই সাথে উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশ ও ইরানের সাথেও গুরত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সংযোগ গড়ে তুলছে। 

উপসাগরীয় দেশগুলোতে চীনের প্রযুক্তি ব্যবসার বিশাল বাজার রয়েছে। তবে চীন এটা নিশ্চিত করে যাতে সৌদি আরবের মতো দেশের সাথে তাদের সম্পর্ক যেন ইরানের সাথে সম্পর্কের উপর প্রভাব না ফেলে। তাছাড়া, চীন আফ্রিকান দেশগুলোতেও পৌঁছেছে এবং আফ্রিকান দেশগুলোর কাছে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হলো চীন। সম্প্রতি জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে চীন, যেটা দেশের বাইরে তাদের একমাত্র সামরিক ঘাঁটি। তাছাড়া, ভারত মহাসাগরে রাশিয়ার সাথে সামরিক মহড়াতেও অংশ নিয়েছে চীন। তবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন বাণিজ্যকেই সবসময় অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। 

উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে এটা বোঝাটা খুব একটা কঠিন নয় যে, ভারত মহাসাগরে বিশ্বের দুই অন্যতম বৃহৎ পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যে একটা তীব্র ক্ষমতার সংগ্রাম চলছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে এই প্রতিযোগিতা যাতে সামরিক অ্যাডভেঞ্চারে রূপ না নেয়। অর্থনীতি কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা হলে সেটা আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত ও ইরানকে উপকৃত করবে। কিন্তু সামরিক আধিপত্যের জন্য ক্ষমতার রাজনীতি করা হলে সেটা দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্য পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া অঞ্চলে দুর্দশা নিয়ে আসবে।