আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১

ফাতেমিয়ুন ব্রিগেড: সিরিয়া-যুদ্ধে যাওয়া তরুণ আফগানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যত

ISSUE-2-ENG-29-09-2020-Afg (1)

২০১৪ সালে সিরিয়া যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখন আলেপ্পো, হামা, দারা, হোমস, দেইর ইজোর ও পালমিয়ার রণাঙ্গনগুলোতে হঠাৎ করে ভরে যাচ্ছিল প্রথমে শত শত, পরে হাজার হাজার তরুণ আফগানে।

এই আফগানদের কারো কারো বয়স ছিল ১৪ বছর। তাদেরকে ইরান থেকে বিমানে করে আনা হয়েছিল। তারা সেখানে বাস করত উদ্বাস্তু হিসেবে। এসব লোককে ইরান বলেছিল, তাদেরকে তাদের ইসলামি দায়িত্ব পালনোর জন্য পাঠানো হচ্ছে, তারা দামেস্কে নবী হজরত মোহাম্মদের নাতনির মাজার রক্ষা করবে।

হজরত জয়নব বিনতে আলীর মাজার জিয়ারত করার পরপরই এসব লোককে সাথে সাথে হয় রাজধানীতে টহল দেয়া কিংবা রণাঙ্গনে পাঠানো হতো। তাদেরকে বলা হতো, তারা ইসলামিক স্টেট (আইএস) গ্রুপের হয়ে কাজ করছে।

বাস্তবে লিওয়া ফাতেমিয়ুন বা ফাতেমিয়ুন ব্রিগেড নামে পরিচিত আফগানিস্তান থেকে আসা এসব লোককে দিয়ে তেহরান একটি আধা সামরিক বাহিনী গঠন করেছিল প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সহায়তা করতে।

এরপর থেকে আফগান যোদ্ধাদের কবর পাওয়া যাচ্ছে সিরিয়া এবং ইরানের বিভিন্ন নগরীতে।

তবে এখন আসাদের অবস্থান মনে হচ্ছে সুরক্ষিত হয়ে পড়েছে। আর এসব আফগানের ভবিষ্যত কী হবে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যদিও তাদের সেবার বিনিময়ে তাদেরকে ইরানে বসবাস করার সুযোগ দেয়া হবে বলে নিশ্চিয়তা দেয়া হয়েছিল।

ভুতুরে বাহিনী

আফগান যোদ্ধাদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপকভাবে ভিন্ন দুটি ছবি উপস্থাপন করে মিডল ইস্ট আইয়ের সাথে কথা বলা সূত্রগুলো।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নেয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো ফিলিপ স্মিথ বলেন, ইরান এশিয়া মহাদেশজুড়ে তার প্রত্যক্ষ ও রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা প্রদর্শন করতে যে দীর্ঘ মেয়াদি নীতি প্রণয়ন করেছে, ফাতেমিয়ুনরা তার অংশবিশেষ।

স্মিথ বলেন, সারা দুনিয়ার যোদ্ধদের নিয়ে একটি সত্যিকারের ইসলামি বিপ্লবী বাহিনী গঠনের ধারণা থেকে এর সৃষ্টি। এই বাহিনীকে যেকোনো সঙ্ঘাতে মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়।

তিনি বলেন, ইরান চায় ফাতেমিয়ুনকে (পাকিস্তান থেকে যোদ্ধাদের নিয়ে একই ধরনের একটি ব্রিগেড গঠন করা হয়, যার নাম জয়নবিয়ুন) ভুতুরে বাহিনীতে পরিণত করতে। হাজার হাজার না হলেও শত শত যোদ্ধাকে পুরোপুরি প্রশিক্ষণ দিয়ে লড়াই করতে সক্ষম হিসেবে গড়ে তোলা। তাদেরকে আফগানিস্তানসহ যেকোনো দেশে পাঠানো সম্ভব বলে তারা মনে করতে থাকে।

ইরান-সংলগ্ন আফগানিস্তানের হেরাত প্রদেশের সাবেক গভর্নর আবদুল কাইয়ুম রাহিমি বলেন, ইরান ও পাকিস্তান গত ৪০ বছর ধরে আফগানিস্তানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যে প্রভাব বিস্তার করছে, তার একটি উদাহরণ হলো এই বাহিনী।

তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই বৈরী অবস্থানে চলে এসেছে। তাদের মধ্যকার সম্পর্কে আরো অবনতি ঘটল আফগানিস্তান হয়ে পড়তে পারে সহজাত যুদ্ধক্ষেত্র।

গেরিলা যুদ্ধ

অনেক বছর ধরেই ইরান ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে যে তারা তালেবানকে সহায়তা করছে।

ইরান ও পাকিস্তানে প্রস্তুত অস্ত্র আফগান বিদ্রোহীদের হাতে যাওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

অধিকন্তু আফগানিস্তানের শিয়া হাজারা উদ্বাস্তুদের সহায়তা করে আসছে ইরান। রাহিমি বলেন, ৪০ বছর ধরে চলা যুদ্ধের ফলে আফগানরা গেরিলা যুদ্ধে বেশ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

স্মিথ ও রাহিমি উভয়ে বলেন, ফাতেমিয়ুন যোদ্ধাদের কেবল বসবাসের নিশ্চয়তাই দেয়া হয়নি, তাদেরকে সিরিয়ায় যুদ্ধের বিনিময়ে মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ ডলার করে দেয়ার প্রতিশ্রুতিও প্রদান করা হয়েছে।

উভয়ে বলেন, আফগান যোদ্ধাদেরকে ইতোমধ্যেই ইয়েমেন, বাহরাইন ও ইরাকেও মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রমাণ নেই

অবশ্য, আফগান নিরাপত্তা বাহিনী বলছে, ফাতেমিয়ুনরা আফগানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। সিরিয়া থেকে ওইসব যোদ্ধা আফগানিস্তানে ফিরে আসবে বলেও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন

তবে নিরাপত্তা বাহিনী সূত্র জানাচ্ছে, ফাতেমিয়ুন যোদ্ধাদের অন্য দেশে লড়াই করার সম্ভাবনা কম। কারণ তাদেরকে ইরান যেসব সুবিধা দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা দেয়া হয়নি।

স্মিথ বলেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যাপারে ইরানের সুনাম নেই।

তিনি বলেন, মার্কিন অবরোধের কারণে সঙ্কটে থাকা ইরানি অর্থনীতির পক্ষে ওইসব আর্থিক প্রতিশ্রুতি পূরণ করাও সম্ভব নয়।

কঠিন ভবিষ্যত

হেরাতের সাবেক গভর্নর রাহিমি বলেন, আফগানিস্তানে ফাতেমিয়ুনের হুমকি প্রশমনের সবচেয়ে ভালো পথ হলো যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান চুক্তি বাস্তবায়ন।

স্মিথ বলেন, দোহা চুক্তি বাস্তবায়িত হলেই আফগানিস্তানে শান্তি আসতে পারে। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে ইরান বা পাকিস্তানের পক্সে পক্সি ব্যবহার করা সহজ হবে না।

তবে কয়েক বছর যুদ্ধের পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরাটা খুবই কঠিন হবে বলে মনে করেন রাহিমি।