আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২১

কোভিড-১৯: প্রকৃতির আশীর্বাদ ও অভিশাপ মেনে নেয়া ছাড়া পথ নেই

করোনাভাইরাসের সময়ে সঙ্কট

করোনাভাইরাস বিশ্বের বেশির ভাগ এলাকায় হানা দেয়ায় স্বাস্থ্য ছাড়াও নানা প্রশ্নের উদয় ঘটছে। মূলত এটি স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ইস্যু হলেও এটি একইসাথে নানা বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও তাদের সক্ষমতার সাথেও সংশ্লিষ্ট। একটার পর একটা দেশ এর শিকার হচ্ছে এবং সংক্রমণ ও মৃত্যু হার বেড়েই চলেছে। ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, কোথাও এই প্রশ্নটি থেকে রেহাই পাচ্ছে না যে বর্তমান বিশ্বে বিশ্বায়নের অর্থ কী। প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে, নতুন একটির উদয় হচ্ছে।

বাংলাদেশেও আঘাত

বাংলাদেশে সংক্রমণ দুই অঙ্কে না গেলেও এর তুলনায় আতঙ্ক দেখা গেছে অনেক বেশি। অনেকেই আশঙ্কা করছে যে তারা কোথাও হয়তো আক্রান্ত লোকের সংস্পর্শে এসেছিল। তারা এখন কোয়ারেন্টাইনে সময় কাটাচ্ছে। এটাও সত্য যে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়ার ইত্যাদি (প্রতি বছর হানা দেয়) সামাল দেয়ার রেকর্ডের আলোকে স্বাস্থ্য খাতের ওপর জনসাধারণের আস্থা খুবই কম।

এটা অনিবার্য যে ইউরোপসহ উচ্চ আক্রান্ত জোনগুলোতে খুবই ব্যাপকসংখ্যক অভিবাসী থাকায় বাংলাদেশে আঘাতটি হঠাৎ করেই খুবই বেড়ে যাবে। অনেকেই নথিহীন এবং অনেকে শুরুতে বিমানবন্দর ও স্থলবন্দর দিয়ে পরীক্ষা ছাড়াই দেশে প্রবেশ করেছে। প্রবাসী আয়ে পরিচালিত একটি দেশের জন্য এটি জীবনের বাস্তবতা। এখন পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দেয়া হবে, তা এটি প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যগত বিষয়টি সামাল দেয়া ও ক্ষতি ন্যূনতম করার সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে কিনা তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে জনসংখ্যার চরম ঘনত্বের প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করাই শ্রেয়। একেবারে পরীক্ষার আগে পর্যন্ত কেউ জানবে না।

অর্থনীতি আক্রান্ত

ভাইরাসটির উৎস হিসেবে চীন বাংলাদেশকে তুলনামূলকভাবে রেহাই দিয়েছে এবং সেখান থেকে আসা কারো এখনো পর্যন্ত রোগটি আছে বলে শনাক্ত হয়নি। সতর্কতা খুবই প্রবল হলেও চীনা ব্যক্তিদের সাথে সম্পৃক্ত প্রকল্পগুলোর কোনোটিই বন্ধ করা হয়নি। কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী হয়েছেন এবং প্রথমে যতটা ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা করেছিলেন, এখন কম হবে বলে মনে করছেন। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য চীন প্রধান সমস্যা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও ইউরোপিয়ান শ্রমবাজারই মূল সঙ্কটের কারণ।

এখন পর্যন্ত আক্রান্ত লোকজন প্রধানত ইতালিফেরত। এর মানে হচ্ছে যে এক মাস আগেও যেটি কোনো সমস্যা ছিল না সেখান থেকেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়ে গেছে যে ইউরোপ এ ধরনের স্বাস্থ্য সঙ্কট ব্যবস্থাপনা করার সক্ষমতা রাখে না। সমস্যাটি কেবল ইতালির নয়। জার্মানি ও যুক্তরাজ্যেও সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে। সব দেশেই বাংলাদেশীরা শ্রমিক। ফলে তারা আক্রান্ত হবে এবং অনেক দিক থেকেই বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব পড়বে।

অবশ্য এই প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদের হবে। এর অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতি পেছনে চলবে, বাইরে থেকে লোক নেয়া কমাবে। এর ফলে বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের অর্থনীতিতে এর প্রবল প্রভাব পড়বে। তৈরী পোশাক খাতে ইতোমধ্যেই আশঙ্কা অনুযায়ী সমস্যায় পড়েছে। এর জের ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে সতর্ক ঘণ্টা বাজছে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের ঘর। যদি তৈরী পোশাক ও প্রবাসী আয় উভয়টিই আক্রান্ত হয়, তবে এর প্রভাব সব শ্রেণী, গ্রুপ ও নগর-গ্রাম সব স্থানেই অনুভূত হবে।

সবার নিরাপত্তাই বিঘ্ন

অবশ্য এমন দৃশ্যপট কেবল বাংলাদেশের জন্যই হবে না। করোনাভাইরাস সঙ্কট প্রমাণ করেছে যে বিশ্বে, বিশেষ করে স্বচ্ছল দেশগুলোতে যে নিরাপত্তার অনুভূতি বিদ্যামান, সেটি নিছকই কল্পকথা। বিশ্বায়নের মূল কথা হলো চলাচল এবং এর মানে হলো বেশি বেশি লোকের মেলামেশা ও তার মাধ্যমে রোগ ও মৃত্যুর বিস্তার।

ইতিহাসে এ ধরনের মহামারি নতুন কিছু নয়। অতীতে কোটি কোটি লোক প্রাণ হারিয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের সঙ্কট সামাল দেয়ার সামর্থ্য অনেক বেশি। কিন্তু অর্থনীতি ও সমাজগুলোও অনেক বেশি নাজুক হয়ে পড়েছে, শিল্পের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কৃষি খাত চালিত অর্থনীতির চেয়ে শিল্প বেশি খারাপ অবস্থায় পড়েছে। কারণ কৃষিপ্র্রধান দেশগুলো বৈশ্বিক চাহিদা ও সরবরাহের ওপর অনেক কম নির্ভরশীল। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এ ধরনের আঘাত হজম করার সামর্থ্যও অনেক কম। আর এটিই ভাইরাস-পরবর্তী অনেক বড় সঙ্কটের কথা জানিয়ে দিচ্ছে।

পরিচালনা ব্যবস্থাপনা প্রশ্ন?

চীন দেখিয়ে দিয়েছে যে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক পরিস্থিতি (যা ওই দেশে রয়েছে) এই ভাইরাসটি দমনে অনেক ফলপ্রসূ। দেশটিতে এই সঙ্কট কমে আসছে। অবশ্য ইউরোপ ও অন্যত্র রয়েছে ভিন্ন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। আগামী কয়েক মাসে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতির পরীক্ষাও হবে। অবাধ রাজনৈতিক সমাজগুলো নাকি বদ্ধসমাজ এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল ভালোভাবে দিতে পারে, তা জানা যাবে। অনিবার্যভাবেই দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব-সংবলিত রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হবে এটি।

পুরো পরিস্থিতির প্রান্তভাগে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি খুবই ভয়াবহ পরীক্ষার সময়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবাষির্কীর প্রধান অনুষ্ঠান স্থগিত করায় বোঝা যাচ্ছে, এটি কত গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এটি ছিল ১৯৭১ সালের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ঘটনা। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র এর জন্য মোতায়েন করা হয়েছিল। ভাইরাসটির বাস্তবতা প্রমাণ করেছে যে এমনকি আজকেও, প্রাকৃতিক দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং সবাইকে এর সাথেই তাল মিলিয়ে চলতে হয়, এর নেয়ামত ও অভিশাপকে মেনে নিতে হয়।