আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

চীনের বিপরীতে নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করতে হবে ভারতকে

TOP NEWS-ENG-15-06-2020 updated

পশ্চিমাদের যদি ক্ষমতা ও উপায় থাকতো, তাহলে করোনা মহামারী প্রতিরোধের জন্য তারা সব কিছু করতো। আক্রান্তের হার, মৃতের সংখ্যা বা অর্থনৈতিক অবনতির বিষয়টি এখন আর পশ্চিমাদের কাছে কোন বিবেচ্য নয়। তাদের চিন্তা হলো বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে তাদের অবনতি হচ্ছে। পশ্চিমাদের শ্রেষ্ঠত্ব এখন মারাত্মক প্রশ্নের মুখে রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে মহামারী নিয়ে চীন যে দুর্দশার মধ্যে পড়েছিল, সেটা নিয়ে তৃপ্তিতে ভোগার আর সুযোগ নেই, কারণ বিশেষ করে পশ্চিমসহ বিশ্বের বেশ কিছু অঞ্চলে এখন মহামারী ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে গেছে। 

ট্রান্স-এশিয়ান অঞ্চল

মহামারী শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই বহু ক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতি জোরালো করতে বাধ্য করেনি, বরং চীনও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের সুযোগ সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে চীনের মনোযোগ হলো তার নিজের অঞ্চল এশিয়ার দিকে। তাদের প্রচেষ্টার পরিস্কার উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষ শক্তিগুলোর উদ্দেশ্যে একটা বার্তা দেয়া। কিন্তু পশ্চিমারা এখনও এই বার্তার জবাব দিয়ে উঠতে পারেনি। চীনের স্পষ্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষা হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের প্রভাবের বাইরে একটা বৃহৎ ট্রান্স-এশিয়ান অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। 

মহামারী দেখিয়ে দিয়েছে যে, ক্ষমতার প্রথাগত ধারণাগুলো অনিশ্চিত এবং জটিল। চীন এখন এশিয়ার স্থানীয় পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেটা দেখে এতদিনের প্রহরী যুক্তরাষ্ট্র ভয়ে সরে গেছে। কোন যুদ্ধের কারণে এটা হয়নি, হয়েছে একটা মহামারীর কারণে। 

Lifts-01-Top News-Bangla-চীনের বিপরীতে নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করতে হবে ভারতকে

এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ায় ইন্দো-চীন সীমান্তে আবারও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ভারতে এটা নিয়ে ব্যাপক অস্থিরতা বিরাজ করছে। চীনে, এটা তাদের বৃহত্তর আগ্রাসী নীতির একটা অংশ মাত্র। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় যেটা হচ্ছে, সেটা বৈশ্বিক পরিস্থিতি পরিবর্তনেরও একটা প্রতিফলন, যেটা যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ঠেলে দিয়েছে। 

মার্কিন দ্বিধাদ্বন্দ্ব

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশানের ব্লগে লেখক রায়ান হ্যাস ও কেভিন ডোং (১ এপ্রিল, ২০২০) বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যে চলমান সঙ্ঘাতের মূল বিষয়টি তুলে ধরেছেন। “নিম্নমুখী এই পতনের গতি কমার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে, উহানে মহামারীর ব্যাপারে চীনের প্রাথমিক অবহেলা এবং সারা বিশ্বে ভাইরাস ছড়ানোর মধ্যে সংযোগের বিষয়টি প্রচারের একটা নৈতিক দায়িত্ব পড়েছে তাদের উপর। সারা বিশ্বে কোভিড-১৯ এর ক্ষয়ক্ষতি যত বেশি হবে, চীনের কর্তৃত্ববাদী সরকারী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য এই সব কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টা তত প্রবল হবে। এই ধরনের নৈতিক প্রতিজ্ঞার সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা জড়িয়ে যেতে পারে। আসছে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থনীতি আর শক্তিশালী জায়গায় নেই, বেকারত্ব বেড়েছে আর চার বছর ক্ষমতায় থাকার পর ওয়াশিংটনের নতুন করে প্রতিশ্রুতি দেয়ার মতো কোন অবস্থা না থাকায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপর হয়তো চাপ বাড়তে পারে, যাতে তিনি ‘চীনা ভাইরাস’ নিয়ে আমেরিকার ক্ষোভের উপর বেশি জোর দেন। 

আরও পড়ুনঃ ১৯৬২ সালের যুদ্ধ: ব্রুকস-ভগত রিপোর্ট থেকে শিক্ষা নেয়নি ভারত

তবে, কূটনৈতিক বা অন্যভাবে খুব সামান্যই চাপের মধ্যে আছে চীন। বহু দেশই নতুন সমীকারণের দিকে নজর দিতে শুরু করবে। এর অর্থ হলো পররাষ্ট্র নীতির নতুন সমীকরণগুলো মূলত চীনের দ্বারাই চালিত হচ্ছে। অনেকের জন্যই এটা তিক্ত বাস্তবতা হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি সবাইকেই হতে হবে। 

দক্ষিণ এশিয়া ও চীন

চীন সুযোগ সুবিধার সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহন করছে। সে কারণে তাদের ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাটা খুবই কম। ফিলিপাইন্স, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান ইত্যাদি দেশের সাথে সঙ্ঘাত লেগেছে চীনের। সবশেষ উত্তেজনা বেড়েছে ভারতের সাথে, যেখানে মনে হচ্ছে সীমান্তে আবারও ঠেলাঠেলি হচ্ছে এবং চাপও জারি রয়েছে। 

Lifts-02-Top News-চীনের বিপরীতে নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করতে হবে ভারতকে

ভারতের ভাষ্যকারেরা বলেছেন যে, এখানে ভারতের পশ্চিম-পন্থী নীতি এবং চীন-বিরোধী কোয়াডের ব্যাপারে চীনের ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু, অন্যদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রেও চীন ভিন্ন কোন আচরণ করেনি। ফিলিপাইন্স যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি ঝেড়ে ফেলতে প্রস্তুত। সে কারণে চীনের এই পেশি প্রদর্শনীর নীতিটি সাধারণভাবে সবার জন্য প্রযোজ্য। 

তাদেরকে এটা স্বীকার করে নিতে হবে যে, চীন বাকি দক্ষিণ এশিয়ার মতো নয়। 

এ অঞ্চলের কোন দেশই চীনের ক্ষমতার সাথে তুল্য নয়, এবং সে কারণে শান্তি বজায় রাখাটা সাধারণ একটি সুযোগ নয়, বরং একমাত্র উপায় মাত্র। তবে, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কৌশল রয়েছে। ভারতের জন্য এই সমস্যাটা আরও বড়। 

আরও পড়ুনঃ প্রতিবেশীদের দূরে ঠেলে দিয়েছে মোদি সরকারের পেশী শক্তির পররাষ্ট্রনীতি

পাকিস্তান চীনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। নেপাল চীনকে ব্যবহার করে তাদের সীমান্তের মানচিত্র তৈরি করছে, যেটাকে তারা নেপাল-বান্ধব মনে করছে। বাংলাদেশের দর কষাকষির জায়গাটা সংকীর্ণ, কারণ তারা ভারতের সাথে সেঁটে আছে। কিন্তু পানি বণ্টন বা অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী প্রশ্নে ভারতের বহু নীতি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ এ অঞ্চলে চীনের বৃহৎ উপস্থিতিকে স্বাগত জানিয়েছে যেটা ভারতের চাপের বিপরীতে পাল্টা ভারসাম্য আনতে সাহায্য করেছে। 

পরিবর্তনের বড় হাওয়া

ভারতের ইস্যু হলো দক্ষিণ এশিয়া ব্লকে এখন তাদের চেয়েও বড় কেউ রয়েছে। ভারত সামরিক শক্তি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে চীনের প্রতিপক্ষ হতে চায় কিন্তু সেটা এখনও সুদূর পরাহত। এ অঞ্চলে চীনের ব্যাপক প্রভাব সম্পর্কে আরও বাস্তবসম্মত পররাষ্ট্র নীতি যদি ভারত খুঁজে বের করতে না পারে, তাহলে নিজেদের শর্ত দিয়ে তারা কোন শান্তি খুঁজে পাবে না। 

সাম্প্রতিক ইতিহাসে ভারত এমন কোন প্রতিকূল শক্তির মোকাবেলা করেনি যেটা তাদের চেয়ে শক্তিশালী – এখানে একমাত্র ব্যতিক্রম হলো চীন। ১৯৬২ সালে সীমান্ত যুদ্ধে যে বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল ভারত, সেটা এখনও তাদের নীতি নির্ধারকদের তাড়িয়ে বেড়ায়। আর ১৯৬২ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে পার্থক্যও বেড়েছে। সে কারণে ভারতকে তাদের কৌশলগত ও কূটনীতিক বাস্তবতাটা যাচাই করে দেখতে হবে। তাদেরকে এটা স্বীকার করে নিতে হবে যে, চীন বাকি দক্ষিণ এশিয়ার মতো নয়। সে কারণে, একটা সত্যিকারের নতুন কৌশলের প্রয়োজন। এই ধরনের পুনর্বিবেচনা করা হলেই কেবল সেটা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে।