আমরা লাইভে English রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

অব্যাহত সংগ্রামে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা

ISSUE-2-ENG-28-04-2020-BD

চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে দেশটি এ বছর তৈরি পোশাক খাতে অন্তত ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব হারাতে পারে। বৈশ্বিক রিটেইলার ও ব্রান্ডগুলো একের পর এক অর্ডার বাতিল করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, এ ব্যাপারে মালিকরা আগে থেকে কিছু জানায়নি। অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদের পাওনা মজুরিও পরিশোধ করা হয়নি। ফলে দেশব্যাপী লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব উপেক্ষা করেই হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে বাধ্য হয়।

পুলিশ কিছু কারখানা মালিকের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা মজুরি পরিশোধ করতে রাজি হয়েছে। কিন্তু বিশৃঙ্খলা ও এলোমেলো ব্যবস্থার অবসান হয়নি, এটাই চিন্তার বিষয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি তৈরি পোশাক রফতানির উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ফলে যারা এই শিল্পের চালিকা শক্তি সেই শ্রমিকদেরই সঙ্কটের সময়ে উপক্ষিত থাকার বিষয়টি বিস্ময়কর। দু:খের সঙ্গ বলতে হচ্ছে এমন চিত্র আমরা বার বার দেখছি।

টেক্সটাইল টুডে’র হিসাব মতে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ তৈরী পোশাক রফতানি করেছিলো ৩৪.১৩ বিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছরের তুলনায় ১১.৪৯% বেশি। এর আগের বছর আইন শৃঙ্খলা-রক্ষা বাহিনীর নিপীড়নের প্রতিবাদে গ্রেফতার ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পোশাক-কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে।

এর ফলে সরকার সর্বনিম্ন বেতন বৃদ্ধি করে ৮,০০০ টাকা ধার্য করে। মজার বিষয় হলো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরগুলোর একটি হলো ঢাকা। এখানে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ফলে পোশাক শ্রমিকরা যে মজুরি পান তা শুধু জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার মতো। বিশ্বকে মহামারী আঘাত হানার আগে এই অবস্থা বিরাজ করছিলো।

গত মাসে সরকার পোশাক কারখানাগুলোর জন্য ৫৫৮ মিলিয়ন ডলারের মহামারীকালীন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে, যাতে এই দুর্যোগের সময়ে স্টাফদের বেতন দেয়া যায়। কিন্তু কারখানা মালিকরা বলছেন যে এই অর্থ পর্যাপ্ত নয়।

বাংলাদেশ সরকার কেন প্রণোদনার অর্থ সরাসরি পোশাক শ্রমিকদের হাতে না দিয়ে মালিকদের হাতে দিচ্ছে সেটা ধাধার মতো। যে ব্যবস্থায় কোন চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নেই সেখানে শ্রমিকদের কয়জন এই অর্থ পাবেন তা চিন্তার একটি বিষয়।

তাছাড়া, কারখানা মালিক ও ব্যবস্থাপনা প্রায় ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের কল্যাণের দিকে নজর দেয় না। ফলে সরকারের সিদ্ধান্তটি কৌতুহলজনকও বটে। এই প্রণোদনা যুক্তরাষ্ট্রের অনুরূপ মনে হতে পারে। সেখানে সরকার ২.২ ট্রিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। সেখানেও নাগরিকদের বদলে কর্পোরেশনগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

এই চতুর পরিকল্পনা সরকারকে আত্মতুষ্টি দিতে পারে। এতে কর্পোরেট খাত খুশি হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো পোশাক কারখানাগুলোর যেখানে শ্রমিকরাই ৯৯%, এটা তাদের খুব একটা কাজে আসবে না।

এসব শ্রমিকের অধিকাংশ কায়ক্লেশে জীবন যাপন করে। তাদেরকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ভরনপোষণ করতে হয়। এদের কোন স্বাস্থ্যবীমা নেই। এরা কারাখানা মালিক ও ব্যবস্থাপকদের কাছ থেকে শালিনতা ও নৈতিকতা কি আশা করতে পারে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্ভবত না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে একজন নারী। পোশাক শ্রমিকদের বেশিরভাগও তাই। অথচ এদের কাছ থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি মুনাফা করছে।

রাষ্ট্রের উচিত ছিলো পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা দেয়া। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দুর্নীতিপ্রবণ ও নৈরাজ্যের মধ্যে তেমনটা শুধু কল্পনাই করা যায়।