আমরা লাইভে English রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

করোনা সঙ্কটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের গৃহকর্মীরা

REPORT-2-BNG-14-05-2020-BD

করোনার চেয়েও ক্ষুধায় কাবু এখন বাংলাদেশের লাখ লাখ গৃহকর্মী। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে যেদিন প্রথম করোনার রোগি শনাক্ত হয় সেদিনের পর থেকে অ্যাপার্টমেন্ট এসোসিয়েশন অথবা বাড়ির মালিকরা গৃহকর্মীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। কোথাও কোথাও গৃহকর্মীদের ‘একবাক্যে’ কাজ থেকে বিদায় করা হয়। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকির চেয়েও অন্নের প্রয়োজন এখন তাদের হাত পাততে রাস্তায় নামিয়েছে। এই সবকিছুকে ইউরোপের ধাচের স্বাস্থ্যবিধির প্রাচারণার কুফল বলছেন নারী নেত্রী ও উন্নয়ন কর্মীরা।

রোজার মাস, আরেক দিকে লকডাউন। বিকেল হলেই রাজধানীর পাড়া-মহল্লায় জুড়ে ধীরে ধীরে নীরবতা নামতে থাকে। সেই নীরবতা ভেঙ্গে সন্ধ্যা অব্দি রাস্তা থেকে আর্তি শোনা যায় সাহায্যের আবেদনের। অনেককে ছেলে-মেয়ে নিয়ে শহরের বড় রাস্তার ধারে বসে থাকতে দেখা যায়। দ্রুত গতিতে ছুটে চলা গাড়িগুলোর কোন একটি দাঁড়িয়ে খাবার কিংবা সাহায্যের প্যাকেট দেয়া শুরু করলে সবাই ছুটে গিয়ে ঘিরে ধরে। কিন্তু কোন প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় নেই এই গৃহকর্মীরা।

হিসাবও নেই গৃহকর্মীদের। কেউ কেউ অনুমান করছেন তাদের সংখ্যা সারা দেশে ২০ লাখের অধিক। শুধু ঢাকা শহরে নয় আঞ্চলিক ছোট-বড় শহরগুলোতেও রয়েছে তাদের উপস্থিতি। লকডাউনের ছুটির ফাঁকে তাদের কেউ গ্রামে বাড়িতে ছুটেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় আটকে পরার কারণে সেখানেও টান পড়েছে খাবারের। ‘ঢাকা থেকে গেছেন’ বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেয়া সাহায্যও তারা পাননি।

উপায় না দেখে সাবেক কর্মস্থলের গৃহকর্তাকে ফোন করে কাজে ফেরার সুযোগ চান অনেকে। কোন কোন গৃহকর্তা আংশিক বা পূর্ণ বেতন পাঠিয়েছেন। ময়মনসিংহের সালেহা বেগম তাদেরই একজন যারা টাকা পেয়ে মা-মেয়ে-বোন নিয়ে লকডাউনেরা মধ্যে ঢাকায় আসেন অনেক কষ্টে। কিন্তু সমস্যা এখন অন্যখানে-বলা হচ্ছে কমপক্ষে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার পরে কাজে যোগ দিতে পারবে।

সালেহা বলেন, এত সবের আমরা কি বুঝি? ক্ষুধার কষ্টে কাজ ছাড়া এখন আর কিছু বুঝিনা।

বেসরকারি সংস্থা এ্যাকশন ফর স্যোসাল ডেভলপমেন্টের (এএসডি)অভিজ্ঞতা রয়েছে গৃহকর্মীদের নিয়ে কাজ করার । সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক জামিল এইচ চৌধুরী বলেন, গৃহকর্মীদের অধিকাংশ মহিলা হওয়াতে তাদের ঝুঁকি আরও বেশি। তারা বস্তিতে থাকেন, অধিকাংশ বিধবা বা স্বামী পরিত্যাক্তা, কারো স্বামী আবার অসুস্থ। ফলে পুরো পরিবারের দায়িত্ব তার ওপর। করোনাকাল তাদের জন্য প্রকৃত অর্থেই দুর্যোগ কাল।

আর এই দুর্যোগকালে প্রত্যেক গৃহকর্তাকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান হাঙ্গার প্রজেক্টের পরিচালক নাসিমা আক্তার জলি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিবেচনায় তাদের আসতে হয়তো বিরত রাখা হয়েছে। কিন্তু তাদের বেতন-বোনাসটা বজায় রাখা উচিত।

তিনি বলেন, গৃহকর্মীরা আমাদের পরিবারেরই সদস্য। আমাদের বিপদ-আপদে তারাইতো পাশে থাকেন। চলমান বিপদ কেটে গেলে আবার তারা আমাদের সঙ্গেই যোগ দেবেন। আমি মনে করি, শুধু মানবিক বিবেচনায় নয়, এই সময়ে তাদের পাশে থাকাটা আমাদের নৈতিক দায়িত্বও বটে।

তবে এই সবকিছুর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পশ্চিমা ধাচের স্বাস্থ্যবিধি প্রচারণাকে দায়ী করেন ফরিদা আক্তার। উন্নয়ন বিকল্পের নীতি নির্ধারণী গবেষণা-উবিনীগ এর এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে: স্টে হোম - বাড়িতে থাকো। যাদের ঘর আছে তারা না হয় এই বিধি মেনে চলতে পারলো। কিন্তু যাদের ঘর নেই তারা থাকবে কোথায়?

তিনি বলেন, বস্তির ছোট একটি রুমে এক সঙ্গে কতগুলো লোকের এক সঙ্গে থাকাটাও কি যৌক্তিক? তাছাড়া বস্তিতে অনেকগুলো লোক যেখানে একটা টয়লেট ব্যবহার করে, একটা রান্না ঘর ব্যবহার করে সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধিটা কি হওয়া উচিত? আমি বলবো, বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যবিধিতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বস্তিবাসীদের প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকা উচিত ছিল।

এই উন্নয়নকর্মী আরও বলেন, আমাদের এখানে পুলিশ অনেক আক্রান্ত হচ্ছেন। এই ধরনের পেশাজীবীদের জন্য সেফটি মেজারসগুলো উল্লেখ থাকা দরকার ছিল। একইভাবে গৃহকর্মীদের সেফটি মেজারসও থাকতে পারতো। সবাই সেগুলো মেনেই তাদের রাখার ব্যবস্থা করতো। আমি বলবো, “এখানে বস্তি নিয়ে, বস্তিবাসীদের নিয়ে স্টাডি আছে। একটা মাত্র গাইডলাইন পেলে আমরা অনেককে স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও আর্থিক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারতাম।”  

আর ত্রাণ দেয়ার ত্রুটি উল্লেখ করে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবির বলেন, প্রচলিত সংস্কৃতিতে যে পদ্ধতিতে ত্রাণ দেয়া হয় তাতে মানুষের আত্মমর্যােদাকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। এটা রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা। আরেকটি দুর্বলতা হলো- এসব গৃহকর্মীরা এখনও ওয়ার্কার হিসেবে স্বীকৃত নয়। সব সেক্টরের শ্রমিকদের জন্যই প্রণোদনা প্যাকেজ আছে কিন্তু গৃহকর্মীরা সবকিছুর বাইরে।

তিনি বলেন, শিল্প মালিকরা প্রফিট যখন করেন সেটা তাদের প্রাইভেটাইজ। কিন্তু তারা যখন ব্যবসায় লস করেন সেটা সোস্যালাইজড। আমি মনেকরি প্রফিট যখন সোস্যালাইজড হবে তখন অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। যেমন, আপতকালীন ফান্ড গঠন করা যাবে। যা দিয়ে এধরনের ছোট ছোট চাহিদাগুলোকে পুরন সম্ভব।