আমরা লাইভে English রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

মোদির বাংলাদেশ সফর বাতিল সম্পর্ক মূল্যায়নের জন্য একটি সুযোগ

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের তিনটি ঘটনা শনাক্ত করার পর জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কারণে মুজিব জন্মশতবর্ষের প্রকাশ্য উদযাপন বাতিল করার সরকারি সিদ্ধান্ত একটি ইতিবাচক ঘটনা এবং প্রশংসার দাবি রাখে। এটি সরকারকে একটি রাজনৈতিক অস্বস্তি থেকেও রক্ষা করেছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকারী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের পরিকল্পনা করেছিল তার মেয়ে শেখ হাসিনার সরকার। সরকার ১৭ মার্চ থেকে শুরু বছরকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক অতিথির উপস্থিত হওয়ার কথা ছিল। মোদির সফর বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয় এবং বাংলাদেশে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি করে। গত সপ্তাহে বামপন্থী রাজনৈতিক দল, ইসলামপন্থী, নাগরিক সমাজের অনেক সদস্য ও ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং দাবি জানায় যে সরকারের উচিত হবে আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করা। মোদির ঢাকায় আগমনকে সামনে রেখে প্রতিবাদকারীরা আরো বিক্ষোভ প্রদর্শনের পরিকল্পনা করেছিল।

মোদির বিরুদ্ধে ব্যাপক মাত্রার বিক্ষোভ ও তাকে আমন্ত্রণ জানানোর বিরুদ্ধে তীব্র সমালেচনা এই অঞ্চলের বাইরের অনেক পর্যবেক্ষককে বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশ ও ভারত সরকার বর্তমান সম্পর্ককে ‘সোনালি যুগ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ২০১৮ সালে মোদির পূর্ববর্তী সফরে এ ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফরে বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যাপক প্রতিবাদ নজিরবিহীন। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া ভারত সরকারকে কিছুটা চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে উদ্দীপ্ত হলেও বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনৈতিক পরিবেশ ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক ধারণা এসব বিক্ষোভে ইন্ধন যুগিয়েছে। অনুষ্ঠানটি ও মোদির সফর বাতিল সংবাদ চিত্র থেকে ইস্যুটিকে সরিয়ে দেবে। তবে তা অগ্রাহ্য করা হবে একটি ভুল। এর বদলে, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও ভারতের নীতিনির্ধারক- উভয়ের কাছে মূল বিষয়গুলো মূল্যায়ন করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।

মোদির সফরের বিরোধিতাকারীরা তাদের আন্দোলনের কারণ হিসেবে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনসহ (সিএএ) মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মোদি সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কথা বলেছে। ফেব্রুয়ারিতে দিল্লিতে বিজেপি কর্মীদের মুসলিমবিরোধী সহিংসতা বাংলাদেশে গত সপ্তাহের বিক্ষোভকে চাঙ্গা করে। ভারত সরকার বারবার আশ্বস্ত করেছে যে এনআরসি ও সিএএ বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে না। কিন্তু এ ধরনের আশ্বাস বাংলাদেশীদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। কারণ নির্যাতনের আশঙ্কায় ভারতীয়দের বাংলাদেশে অভিবাসন, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ বিরুদ্ধে বিজেপি নেতাদের ভাইরাল হওয়া বাগাড়ম্বড়তা, বিজেপি নেতাদের তাদেরকে ‘উইপোকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা এবং তাদেরকে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করার হুমকির খবর প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশী কর্মকর্তারা ভারতীয় অবস্থান প্রতিধ্বনিত করে এনআরসি ও সিএএকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বলে এলেও তাদের অস্বস্তি বোধগম্য। কারণ হাসিনা মন্তব্য করেছেন যে ‘এর দরকার ছিল না’ এবং বাংলাদেশ সিএএ পাস হওয়া ও দিল্লি সহিংসতার প্রেক্ষাপটে বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর সফর বাতিল করেছে।

এ ধরনের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আমন্ত্রণের ব্যাপারে আরো নাছোড়বান্দা মনোভাব প্রকাশ করে, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো থেকে বিরত থাকা হবে অকৃতজ্ঞতামূলক কাজ। ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সমর্থকেরা অভিযোগ করছে যে তাদের বিরোধীরা ‘মুজিব বর্ষকে’ বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে। হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুজিবের সমালোচনা করা একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে বলবত কঠোর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ‘নেতিবাচক প্রপাগান্ডা’ শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচিত হয়। গত বছর এই আইনের আওতায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।

বিরোধী দলের বর্জনে হওয়া ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশ নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদের দিকে মোড় নেয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের ভাষায় ‘প্রহসন’ ও ইকোনমিস্টের ভাষায় ‘স্বচ্ছভাবে জালিয়াতিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণিত ২০১৮ সালের নির্বাচন পরিস্থিতিকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে যায়। কারণ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব হয়, বিরোধীদের নিস্ক্রিয় করা হয়, বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম অনেক বেড়ে যায়। সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা এর আগে ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো তৃণমূল আন্দোলনগুলো নির্মমভাবে দমন করে। শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সরকারের বিরুদ্ধে ইস্যুভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন হয়ে পড়েছে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনের উপায়ে। মোদির সফরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আংশিকভাবে এই ঘরোয়া রাজনৈতিক পরিবেশে ইন্ধন পেয়েছে। অনেক বাংলাদেশী মনে করে, আমন্ত্রণটি ছিল হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে ভারতকে অন্যায় অনুমোদন। ভারতের সমালোচনা করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র কর্মীদের হাতে গত অক্টোবরে এক প্রকৌশল ছাত্র তার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাসে নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করে। হাসিনার ভারত সফরকালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সই হওয়া চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুক পোস্ট দেয়ায় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়।

ব্যাপকভত্তিক ধারণা রয়েছে যে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক অসম এবং বাংলাদেশ যতটা ভারতকে দিয়েছে, তার তুলনায় পেয়েছে অনেক কম। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সীমান্তে মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও ২০১৯ সালে তা তিন গুণ বেড়ে ৪১ জনে দাঁড়ায়। গত ৫ বছরে সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর হাতে ১৫৮ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছে। সীমান্তে ভারতীয় ও বাংলাদেশীদের নিহতের সংখ্যা সমান বলে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সম্প্রতি যে দাবি করেছেন তা তথ্যভিত্তিক নয় এবং তা বাংলাদেশীদের আরো উদ্বিগ্ন করেছে। ২০১১ সালে সই হওয়া তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। অবশ্য বাংলাদেশ ফেনী নদী থেকে পানি তুলে নিতে ভারতকে অনুমতি দিয়েছে। হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পণ্য পরিবহনের অনুমতি দিয়েছে ভারতকে এবং কোনো ধরনের শুল্ক ও ট্রানজিট ফি ছাড়াই বাংলাদেশী সমুদ্রবন্দরগুলো দিয়ে ভারতীয় পণ্য ট্রান্সশিপমেন্টের সুযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর উপকূলে নজরদারি রাডার সিস্টেম স্থাপনে দিল্লিকে সুযোগ দেয়া হয়েছে। অথচ রোহিঙ্গা সঙ্কটে মিয়ানমারকে সমর্থন করে ভারত, যা বাংলাদেশীরা ভালোভাবে নেয়নি।

মোদির সফরের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ আক্ষরিক ও রূপক অর্থে অনেক কথাই বলে। এগুলোকে ষড়যন্ত্র হিসেবে খারিজ করার বদলে উভয় দেশের নীতিনির্ধারকেরা যদি শোনেন এবং এটাকে তাদের সম্পর্ক ও বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনৈতিক পরিবেশ পুনঃমূল্যায়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন, তবে অনেক ভালো হবে।