আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

নরেন্দ্র মোদির রথ দেখা ‘কলা বেচার’ সফর

Untitled-1-78

বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত শুরু হতে যাচ্ছে আগামীকাল ১৭ মার্চ ২০২১ থেকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের ১০ দিনের উৎসব শুরু হবে সেদিন থেকে। এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে একের পর এক আসছেন ৫ দক্ষিণ এশীয় শীর্ষ নেতা।

প্রথম দিনে আসছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ। পর্যায়ক্রমে আসবেন শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারি, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

এদের মধ্যে সবার চোখ মোদির সফরের ওপর। কোভিড মহামারির মধ্যে কোনও দেশে মোদির এটি প্রথম সফর। চীন ভারতের উত্তেজনা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম বৈরী হাওয়া, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হটিয়ে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ দখলের সর্বাত্মক চেষ্টা এবং ভারতের গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার বহির্বিশ্বের কাছে যখন প্রশ্নবিদ্ধ তখন মোদির এই সফর অনেক তাৎপর্যময়। বাংলাদেশকে কাছে পাওয়ার জন্য চীন-ভারতের প্রতিযোগিতার মধ্যে মোদির এই সফর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। সব দিক থেকে বিবেচনা করলে কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যে শীর্ষ নেতাদের আগমন অভূতপূর্ব।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে ২৬-২৭ মার্চ বাংলাদেশ সফর করবেন। তিনি মুজিববর্ষ উদযাপন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের যৌথ উদযাপন উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই সফর করলেও তার এই সফরকে রথ দেখা এবং ‘কলা বেচার’ সঙ্গে তুলনা করা যায়। তিনি শুধু বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী কিংবা ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উপলক্ষে ঢাকা সফর করছেন না, তার এই সফর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে হিন্দুত্ববাদীদের মনোবল চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার চেষ্টা হচ্ছে। সফরকালে তিনি দুটি মন্দির পরিদর্শনে যাবেন, তার মধ্যে গোপালগঞ্জের মন্দিরটি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো এবং পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সফরের দ্বিতীয় দিন, ২৭ মার্চ সকালে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ পরিদর্শন করে শ্রদ্ধা জানাবেন। তার অনুরোধে সফরসূচিতে সাতক্ষীরা ও গোপালগঞ্জে দুটি মন্দির পরিদর্শন রাখা হয়েছে, যেখানে তিনি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পরিসরে মতবিনিময় করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে সফরে মোদি যাতে গোপালগঞ্জ জেলায় মতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান ওড়াকান্দি গ্রাম দর্শনে যেতে পারেন, সে জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে ভারত।

নরেন্দ্র মোদির এই প্রস্তাবিত ওড়াকান্দি সফরের তাৎপর্য অবশ্য পুরোপুরি রাজনৈতিক। সেই কারণে ভারতীয় সুধী সমাজের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশের শেখ হাসিনার সরকার মোদির দল বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে কিনা? প্রশ্নটি যুক্তিযুক্ত হলেও মোদির অনুরোধ উপেক্ষা করাও বাংলাদেশের জন্য ছিল বিব্রতকর। ভারতকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক সময়ে এরকম অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন।

ভারতের কংগ্রেস, বিজেপি সব দলই বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি ভারতীয় নেতারা খুবই আস্থাশীল। কিন্তু বিব্রতকর বিষয় হচ্ছে, এই আস্থার মধ্যেও কোনও কোনও রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য হজম করা কঠিন হয়ে যায়। নরেন্দ্র মোদি যখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেন তখন তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিজেপির নেতৃত্বস্থানীয় নেতা অমিত শাহের লাগামহীন কথাবার্তা দুই দেশের সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেখানকার স্থানীয় নেতাদের বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশিদের সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করার আরেকটি কারণ। তাদের হিন্দুত্ববাদী কার্যক্রম এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে লাগামহীন কথাবার্তা বাংলাদেশের রাজনীতিতেও উত্তেজনার প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে চলমান করতে চাইলেও এসব নেতার কথাবার্তা সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করে। সে কারণে ভারতীয় নেতাদের বাংলাদেশ সম্পর্কে কথাবার্তায় লাগাম দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

ওড়াকান্দির মতুয়ারা হলো নিম্নবর্ণীয় বা নমঃশূদ্র হিন্দুদের একটি শাখা-সম্প্রদায় বা ‘সেক্ট’, যারা উনিশ শতকের ধর্মগুরু হরিচাঁদ ঠাকুর ও তার পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রবর্তিত মতবাদের অনুসারী। হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুর দুজনেরই জন্মস্থান ওড়াকান্দি। আর সেই গ্রামের ‘ঠাকুরবাড়ি’ বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মতুয়ার কাছে এক পবিত্র পুণ্যভূমি।

ভারতের কোনও প্রধানমন্ত্রী এর আগে কখনও বাংলাদেশ সফরে এসে ওড়াকান্দি যাননি। সফরে এসে তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দির কিংবা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাচ্ছেন না, যাচ্ছেন ওড়াকান্দি। ফলে নরেন্দ্র মোদি যদি সেখানে যান, তা যে রাজনৈতিক এবং পশ্চিমবঙ্গের মতুয়াদের ভোট বিজেপির বাক্সে যাওয়ার জন্য চাল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ভদ্র ভাষায় বললে মতুয়াদের কাছে তিনি ইতিবাচক একটি বার্তা পৌঁছে দিতে চান।

গোটা পশ্চিমবঙ্গে প্রায় দেড় কোটি মতুয়ার বাস। রাজ্যের অনেক আসনে মতুয়া ভোট জয়-পরাজয় নিষ্পত্তি করে দেয় বলে ধারণা করা হয়। বিশেষ করে ২৪ পরগনা এবং নদীয়া জেলার ছয়-সাতটি নির্বাচনি আসনের ভোটে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে এই মতুয়ারা। সেই জায়গায় পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক মুখে প্রধানমন্ত্রী মোদির ওড়াকান্দি যাওয়াটা বিজেপির জন্য রাজনৈতিক সুফল বয়ে আনতে পারে।

ঘটনাচক্রে, নরেন্দ্র মোদি যেদিন ওড়াকান্দি সফর করছেন (২৭ মার্চ) সেদিনই পশ্চিমবঙ্গে আট পর্বের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হচ্ছে। সেখানে ভোট চলবে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত। এরমধ্যে ১৭ এপ্রিল পঞ্চম এবং ২৬ এপ্রিল সপ্তম পর্বের যে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেখানে মতুয়ারা ভূমিকা রাখবে। এই পটভূমিতে ভারত সরকার যেনতেন-প্রকারে ওড়াকান্দিতে প্রধানমন্ত্রী মোদির সফর চূড়ান্ত করতে মরিয়া ছিল, যদিও ওড়াকান্দি ভিভিআইপি যাতায়াতের ক্ষেত্রে খুব সুবিধাজনক না। ওই গ্রামে যাওয়ার রাস্তাটি মোদির কনভয় যাওয়ার পক্ষে বেশ সরু এবং কাছাকাছি হেলিপ্যাড তৈরির উপযুক্ত জায়গারও অভাব ছিল।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মোদির এই আবদার পূরণে খুব আপত্তির কারণ ছিল না। কারণ, ২৬ মার্চ ঢাকায় পৌঁছে নরেন্দ্র মোদির পরদিন এমনিতেই গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবরে শ্রদ্ধার্পণ করার কর্মসূচি রয়েছে।

ভারতে প্রায় সোয়া বছর আগে পার্লামেন্টে পাস হওয়া নাগরিকত্ব আইন এখনও বাস্তবায়ন শুরু না হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাড়ি দেওয়া মতুয়ারা বেশ হতাশ। এই আইন তাদের ভারতের স্থায়ী নাগরিকত্ব দেবে বলে তারা আশা করেছিলেন। যে স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি। তাদের সেই ক্ষতেও প্রলেপ দিতে পারে মোদির ঠাকুরবাড়ি দর্শন।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও বিভিন্ন দফতরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মোদির সফরসঙ্গী হিসেবে যোগ দেবেন বলে জানা গেছে। তার সফরসঙ্গী হবেন হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুর বংশের উত্তরাধিকারী মতুয়া নেতা ও বিজেপির এমপি শান্তনু ঠাকুরও।

উল্লেখ করা দরকার এটি, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরেও মতুয়া সম্প্রদায়ের অনেকের পশ্চিমবঙ্গে যাওয়া অব্যাহত ছিল। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের বংশধর পি আর ঠাকুর ১৯৬২ সালে কংগ্রেসের মন্ত্রী ছিলেন এবং তার বিধবা স্ত্রী বিনপনি দেবী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে মোদি তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর ২০২১ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় মাতুয়ারা বিজেপির দিকে সরে এসেছে।

মমতাও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন যে কেন্দ্র সিএএ প্রয়োগের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। করোনার টিকাদান কর্মসূচি শেষ হলে সিএএ বাস্তবায়ন করে মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।

সফরের প্রথম দিন ২৬ মার্চ বিকালে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে তিনি বঙ্গবন্ধু-বাপু ডিজিটাল প্রদর্শনী পরিদর্শন করবেন।

মোদির সফর বাতিলের জন্য হেফাজতে ইসলাম, কয়েকটি বাম সংগঠন ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে। যদিও সরকার বলছে ১৭ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত কোনও বিক্ষোভ বিশৃঙ্খলা তারা সহ্য করবে না। আমার মনে হয় মোদি যখন রাষ্ট্রীয় সফরের সঙ্গে তার রাজনৈতিক কর্মসূচিও মাথায় নিয়ে ঢাকায় আসছেন, তখন যারা নরেন্দ্র মোদির সফর নিয়ে প্রতিবাদ করতে চান সেটা দমনের দরকার নেই। তবে বিক্ষোভকারীদের এটা মনে রাখতে হবে যে নরেন্দ্র মোদি বিজেপির নেতা হিসেবে শুধু বাংলাদেশ সফর করছেন না, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ সফর করছেন। বাংলাদেশের অত্যন্ত বন্ধুপ্রতিম একটি রাষ্ট্রের সরকার প্রধানের বাংলাদেশ সফরের সময় এমন কোনও বিশৃঙ্খলা যাতে না হয়, যেটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে এবং বিশ্বের কাছে আমাদের মাথা হেঁট হতে হয়।

 

লেখক: সাংবাদিক কলামিস্ট, ইরাক আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।