আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১

‘নিরাপদ জোনের’ পরিকল্পনা: রোহিঙ্গাদের বাস্তবতা মেনে নিচ্ছে বাংলাদেশ

ISSUE-4-ENG-30-09-2020-BD (1)

বাংলাদেশ সরকার চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যাতে রোহিঙ্গাদের তাদের জন্মভূমিতে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার জন্য তারা মিয়ানমারের ভেতরে ‘নিরাপদ জোন’ গড়ে তোলেন। এটা হয়তো হবে না, তবে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের ভেতরে একটা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এখানে। 

২০১৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে যখন রোহিঙ্গা সঙ্কটের শুরু হলো মিয়ানমার থেকে হাজার হাজার শরণার্থী বাংলাদেশের কক্সবাজারে প্রবেশ করলো, ঢাকার সরকার তখন পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে এবং নিজেদের দায়বদ্ধতার হিসেব কষতে ভুল করেছিল। তারা ধরে নিয়েছিল এই সমস্যাটা সাময়িক এবং মিয়ানমারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে শরণার্থীদের তারা ফিরিয়ে দিতে পারবে। 

মিয়ানমার সরকার ঠিকই আলোচনায় বসেছিল এবং ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশের চুক্তিও হয়, কিন্তু যে কাগজে চুক্তি হয়েছে, চুক্তির মূল্য সেই কাগজের সমানও হয়নি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রত্যাবাসন নিরাপদ হলেই কেবল শরণার্থীদের ফেরানো যাবে এবং সৌভাগ্যক্রমে ঢাকার সরকার এই নীতির প্রতি নিষ্ঠাবান রয়েছে। বাংলাদেশের নেতারা যেখানে ভুল করেছে, সেটা হলো তারা মনে করেছে যে, মিয়ানমারের নেতারা সততা নিয়ে আলোচনা করছে এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য তারা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করবে। 

শরণার্থী সঙ্কট সৃষ্টির পর তিন বছর চলে গেছে। মিয়ানমারে যে রোহিঙ্গারা এখনও রয়ে গেছে, তাদের আইনি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি তখন যেমন ছিল, তেমনই আছে। আর কোন গ্রাম মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়নি, কারণ আর কোন গ্রাম অবশিষ্টই নেই। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আর কোন অভিযান চালানো হয়নি, কারণ যে কজন রোহিঙ্গা সেখানে অবশিষ্ট আছে, তাদের অধিকাংশকেই অভ্যন্তরীণ ঘরবাড়িহারা মানুষের ক্যাম্পে ‘নিরাপদে’ রাখা হয়েছে। 

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে কথা বলেছি, তাদের অধিকাংশই মিয়ানমারে নিজেদের গ্রামে ফিরে যেতে চায়, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তারা সেখানে ফিরবে না। আর তাদের এই বক্তব্যও সঠিক যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের ফিরে যাওয়াটা মোটেই নিরাপদ নয়। 

বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষকে মিয়ানমারের ভেতরে নিরাপদ জোন গড়ার আহ্বান জানিয়েছে। মনে হচ্ছে, ঢাকা শেষ পর্যন্ত মেনে নিচ্ছে যে, মিয়ানমার সততা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়নি এবং আন্তর্জাতিক শক্তির মাধ্যমে মিয়ানমারকে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টিতে বাধ্য করা গেলেই কেবল রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা যাবে। 

দুর্ভাগ্যজনক হলো, এটা ঘটনার কোন সুযোগ নেই। মিয়ানমার আরও বেশি করে চীনের বলয়ে ঢুকেছে, এবং জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক ফোরামে বিধিনিষেধের হাত থেকে বেইজিং তাদেরকে রক্ষা করেছে, যেখানে চীনের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তাছাড়া, মিয়ানমারে বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-কেন্দ্রিক স্বার্থ রয়েছে, যেটার অধীনে মিয়ানমারের সিত্তুইয়ে বন্দর এবং এর সাথে সংশ্লিস্ট সড়ক ও রেলের উন্নয়ন করছে বেইজিং, যেগুলো রোহিঙ্গাদের এলাকা দিয়ে গেছে। নিজেদের অবকাঠামোর পাশেই জাতিসংঘের অনুমোদিত নিরাপদ জোন গড়ার জন্য চীন ছাড় দেবে, এমন সম্ভাবনা একেবারেই নেই। 

এই আহ্বানে কাজ না হলেও বাংলাদেশ সরকারের এই পদক্ষেপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, পরিস্থিতির বাস্তবতাটা তারা বুঝতে শুরু করেছে। এর অর্থ হলো আমরা এখন টেবিলে সেই প্রস্তাব রাখতে পারি যে, রোহিঙ্গাদের আসলেই কিভাবে সাহায্য করা যাবে। এর যে অনিবার্য সমাধান, সে ব্যাপারে আরও কিছুকাল হয়তো প্রতিবাদ করে যাবে তারা। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য একমাত্র বাস্তবসম্মত সমাধান হলো দেশে এই শরণার্থী জনগোষ্ঠির উপস্থিতিকে স্থায়ীভাবে মেনে নেয়া এবং যে ক্যাম্পে তারা থাকছে, সেখানে তাদের জীবনমানের উন্নয়নের চেষ্টা করা। 

ঢাকা আরও যেটা করতে পারে, এবং যেটা তাদের করা উচিত, সেটা হলো এই পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো। তারা এই সম্প্রদায়কে ধীরে ধীরে দেশের মধ্যে গ্রহণ করে নিতে পারে এবং তাদের মেধাকে বাংলাদেশের সুবিধার জন্য কাজে লাগাতে পারে। একই সাথে তাদের সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আর্থিক ও লজিস্টিক্স সহায়তার জন্যও তারা আবেদন করতে পারে, যেটা পাওয়ার নৈতিক অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে।