আমরা লাইভে English রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

কোভিড-১৯: দুঃখিত, কর্ম খালি নেই!

bangladeshi-1

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারি ছড়িয়ে পড়ার বেশ খানিক আগে থেকেই দেয়ালের লিখন চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। দল বেঁধে অদক্ষ শ্রমিকদেরকে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে পাঠানো, এবং যাদুর মতো রেমিটেন্স পাওয়ার দিন শেষ। এটা যেন ছিল এক ধরনের রূপকথার যন্ত্রের মতো, যেটার এক দিক দিয়ে খড় দেয়া হয় আর অন্য দিক দিয়ে স্বর্ণ বেরিয়ে আসে। যন্ত্রের মধ্যে খড়গুলো হয়তো দলে মলে ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু শেষে যেটা পাওয়া যাবে, সেটাই আসল বিষয়। 

ওই দিনগুলো দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে, আসলে এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে। এক সময় যেভাবে তারা ঝাঁক বেঁধে দেশ ছেড়েছিল, এখন আমরা দেখছি সেই দেশগুলো থেকে কর্মীরা আমরা বাংলাদেশে ফিরে আসছে। কোভিড মহামারিতে শক্ত আঘাত পাওয়ার পর সৌদি আরব, কুয়েত এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো বাংলাদেশী কর্মীদের গণহারে ফেরত পাঠাচ্ছে। যে কোম্পানিগুলো এই কর্মীদেরকে কাজ দিয়েছিল, তারা এখন বড় ধরনের কর্মী ছাটাই করছে। অদক্ষ শ্রমিকদের উপর আঘাতটা আসছে সবচেয়ে বেশি কারণ অধিকাংশ নির্মাণ কাজই থমকে গেছে এবং শিগগিরই সেগুলো পুনরায় শুরুর কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। 

তেলের দামও কমে গেছে এবং আরব দেশগুলো তাদের পেট্রোডলার খরচের ব্যাপারে হয়তো আগের মতো আর উদার নেই। এর অর্থ হলো এমনকি মহামারি শেষ হওয়ার পরও বাংলাদেশ থেকে বড় সংখ্যক কর্মী নেয়ার সম্ভাবনাও কমে গেছে। 

দেশেও চাকরির বাজার সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। কোভিডের কারণে সৃষ্টি অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যায় কমাচ্ছে, এটা কমানো হচ্ছে ব্যাপক হারে। তাদের অর্থ বাঁচানোর একটা প্রধান উপায় হলো কর্মীদেরকে কাজ থেকে অব্যাহতি দেয়া। আর এই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েও গেছে। ব্যাঙ্কগুলো বড় মাপের কর্মী ছাটাই-ই শুধু শুরু করেনি, বরং একইসাথে তারা বেতনও কাটছাট করছে। অনেকগুলো ব্যাংক এমনকি তাদের এমডি এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেতন পর্যন্ত কাটছাট করছে। 

অন্যান্য খাতগুলোতেও একই অবস্থা। গার্মেন্ট শিল্পেও শ্রমিকদেরকে অন্যান্য শিল্পের মতো কাজ থেকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে। গৃহকর্মীরা আগেই তাদের কাজ হারিয়েছে। ক্ষুদ্র আর মাঝারি এন্টারপ্রাইজগুলো হোচট খাচ্ছে। তারা কোনরকমে পানির উপরে মাথাটা তুলে রেখেছে এবং সেখানেও মানুষ চাকরি হারাচ্ছে। 

এই সামগ্রিক চিত্রটা খুব একটা সুখকর নয়। এটা হতাশাজনক। আর এটা বাস্তব। 

অন্যদিকে, হাজার হাজার তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। চাকরির জগতে প্রবেশের জন্য এই নতুনদের জন্য এটা চ্যালেঞ্জিং সময়। তারা গ্রাজুয়েট শেষ করে শিক্ষাজীবন থেকে মাত্র বের হয়েছে এবং ‘বাস্তব’ জগতে প্রবেশের জন্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তব জগতে একটা অবাস্তব উদ্বেগ বিরাজ করছে। কাজ খালি কোথায়?

করোনাভাইরাস চাকরির বাজারকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। সরকারী আর প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো এই মুহূর্তে নতুন নিয়োগ দিচ্ছে না, কারণ বাংলাদেশে মহামারি কমে আসার কাছাকাছিও এখনও যায়নি। 

আরও পড়ুনঃ করোনাভাইরাস: বাংলাদেশে অর্থনীতি নিম্নগামী, বাড়ছে দারিদ্র্য

বর্ধিত বেতন ও সুবিধাসহ সিভিল সার্ভিস আবারও স্মার্ট তরুণ গ্রাজুয়েটদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পেশা হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। 

ব্যাংকিং খাতও চাকরিপ্রার্থীদের কাছে আকর্ষণীয়, কিন্তু নতুন নিয়োগের জন্য কোন নোটিশ প্রকাশিত হচ্ছে না। চাকরির কোন বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়নি। ফার্মাসিউটিক্যাল খাতও নতুন নিয়োগের কোন বিজ্ঞাপন দেয়নি। বড় খাতগুলোর কোনটাই চাকরির জন্য তাদের দরজা খুলছে না। 

এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাঙ্কের (এডিবি) সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের চাকরির বাজার ধসে পড়েছে। চাকরির বিজ্ঞাপন মার্চ মাসে আগের বছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে। এপ্রিলে এটা কমে গেছে ৮৭ শতাংশ। উৎপাদন শিল্প খাতে চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে ৯২ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে চাকরির বিজ্ঞাপন করেছে ৮১ শতাংশ। 

এটা ভাবা হয়েছিল যে, অন্য কিছু না হলেও আইটি খাতই হবে ভবিষ্যৎ। হ্যাঁ, এটা ভবিষ্যৎ হতে পারে, কিন্তু বর্তমান নয়। এই খাতেও কোন কর্ম খালি নেই। এই খাতে নিয়োগের বিজ্ঞাপন কমেছে ৮২ শতাংশ। এনজিও খাতে চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে ৬৪ শতাংশ। 

সামনের পথ

যে সব তরুণরা চাকরির বাজারে প্রবেশের এবং একটা জীবিকার জন্য অপেক্ষা করছে, তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে। মনে হচ্ছে যে, করোনাভাইরাস মহামারি যথেষ্ট উদ্বেগজনক নয়, চাকরির যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটাও সমান আতঙ্কের। 

শুধু যুবকেরাই যে হতাশ তা নয়। যারা নিরাপদ চাকরি করে আসছে, তারাও বুঝতে পারছে যে তাদের চাকরিও নিরাপদ নয়। যারা এখনও তাদের চাকরি হারায়নি, তারাও সবসময় অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। তারা শঙ্কায় আছে যে, পরবর্তী ছাটাইয়ের কবলে তারা পড়ে যায় কি না। 

কিন্তু হতাশা বা আতঙ্কে ডুবে থেকে কোন লাভ হচ্ছে না। এটা একটা বাস্তবতা এবং এই বাস্তবতটাকে অবশ্যই মোকাবেলা করতে হবে। 

নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে অনেক আলোচনায় আগে থেকেই চলে আসছে। রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নতুন বিবর্তিত কর্মক্ষেত্রের কারণে মানুষ এমনিতেও কাজ হারাবে। একজন রোবট যেখানে ১০০ জনের কাজ করতে পারবে, সেটার অর্থ হলো অন্তত ৯০ জন কর্মী সেখানে কাজ হারাবে। 

আরও পড়ুনঃ ‘নতুন স্বাভাবিক’? স্বাভাবিক জিনিসটাই বা কি?

করোনাভাইরাস আমাদেরকে ঘর থেকে কাজ করার দক্ষতা শিখিয়েছে। এটা আমাদেরকে অনলাইন শপিং শিখিয়েছে। মানুষের সাথে বিনিময় কমিয়ে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে শিখিয়েছে। ভাল বা মন্দ, সেটাই এখন এই খেলার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

তাহলে, কি করা যাবে এখন? এখন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন দক্ষতা অর্জনের সময়। 

বাংলাদেশে মহামারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উদোম করে দিয়েছে এবং এর সমস্ত দুর্বলতার দিকগুলো প্রকাশ করে দিয়েছে। এতে বোঝা গেছে যে, স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ টেকনিশিয়ান, সুপ্রশিক্ষিত স্বাস্থ্য কর্মীদের চাহিদা রয়েছে অনেক। এই দিকেই এখন তরুণদের তাদের প্রচেষ্টা কাজে লাগানো উচিত। 

তাছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তির বিশ্ব রয়েছে যেখানে দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন রয়েছে। 

প্রযুক্তি অর্থনীতি, মানসিক স্বাস্থ্য, গেমিং, অনলাইন শিক্ষা, বিকল্প জ্বালানি, ডাটা সায়েন্সসহ আরও অনেক খাতের ভবিষ্যৎ রয়েছে। 

পুরনো প্রজন্মকেও পুনরায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ইতস্তত করার বা অনেক বয়স হয়ে গেছে, এমনটা ভাবার সময় নেই। আপনি কি চিন্তা করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক কোন কনফারেন্সে গর্বের সাথে পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান না করে, ঘরে বসে জুমেই আপনি প্রায় একই কাজ করতে পারবেন, বহু মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন? কিন্তু আপনি এটা এখন করছেন। 

মানুষের সম্ভাবনা, উদ্যোগ আর কর্মপ্রচেষ্টার কোন শেষ নেই। করোনাভাইরাস আমাদের উপর শক্ত আঘাত হেনেছে। কিন্তু বিশ্ব এতে থেকে যায়নি, এবং আমরাও থেমে যেতে পারি না। 

তাই, আসুন সামনের চ্যালেঞ্জিং সময়ের জন্য আমরা দক্ষতা অর্জন করি, পুরনো দক্ষতা ঝালাই করি এবং আমাদেরকে প্রস্তুত করে তুলি। সবচেয়ে দক্ষ ব্যক্তিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।