আমরা লাইভে English সোমবার, মে ১৬, ২০২২

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অব্যাহত সঙ্ঘাত গুরুতর প্রভাব ফেলবে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে

 হাসান রুহানি, ইরানের প্রেসিডেন্ট

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে এখনো যুদ্ধের কালো মেঘ পুরোপুরি সরে যায়নি। আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বিদেশী শক্তিগুলোকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের বাহিনী সরিয়ে নিতে বলেছেন। তারা এখানে থাকলে বিপদে পড়তে হবে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।

বুধবার এক টেলিভিশন ভাষণে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি বলেন, আজ আমেরিকান সেনারা বিপদে, কাল ইউরোপিয়ানরা বিপদে পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মাঝে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোকেও সতর্ক করলেন রুহানি। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি যদি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য ইরানকে দায়ি না করে তাহলে দেশগুলো থেকে আমদানি করা গাড়ির উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে এক বিবৃতিতে দেশ তিনটি বলে যে তারা এখনো চুক্তিটির সফলতা কামনা করে। এছাড়াও তারা ইরানের উপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টির মার্কিন প্রচারণায় যোগ দেবে না। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি একতরফা বাতিল করে দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আবারো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা উত্তেজনার গুরুতর প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর। এসব দেশ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল, এখানে তাদের লাখ লাখ লোক কাজ করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠায়, যা তাদের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখে।

বাংলাদেশ

বাংলাদেশের কথাই প্রথমে বিবেচনা করা যাক। এই দেশটি তার শ্রমিকদের প্রবাসী আয় ও পশ্চিম এশিয়ার তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আর যুক্তরাষ্ট্র হলো বাংলাদেশের অন্যতম বাজার। ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর প্রকাশের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৪ ভাগ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি দাঁড়ায় ৭১.৭৫ ডলার। সেপ্টেম্বর থেকে এটিই সর্বোচ্চ দাম। আর বাংলাদেশে সাথে সাথে তরলকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের খুচরা দাম বেড়ে যায় ২০ ভাগ।

তেল সঙ্কটে বাংলাদেশের অবস্থা কী হতে পারে তার একটি চিত্র পাওয়া যেতে পারে এই পরিসংখ্যান থেকে যে বাংলাদেশ বছরে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের তেল আমদানি করে। তেলের দাম বাড়া মানে স্থানীয় বাজারেও বৃদ্ধি এবং সব পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের তৈরী পোশাক আমদানি করে। যুদ্ধ মানে এই আকর্ষণীয় বাজার সঙ্কুচিত হওয়া এবং বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের অবস্থা খারাপ হওয়া।

বাংলাদেশের ৪০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয়ের মধ্যে ৩৪ বিলিয়ন ডলার আসে তৈরী পোশাক থেকে। ফলে তৈরী পোশাক খাতে রফতানি হ্রাস পাওয়া মানে বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর খারাপ প্রভাব পড়া। আবার যুদ্ধের ফলে জাহাজ পরিবহন বীমা বেড়ে যাবে।

মধ্য প্রাচ্য হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক চাকরির বাজার। এখানে প্রায় ৬০ লাখ শ্রমিক কাজ করে। তারা ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের (১৫.৫ বিলিয়ন ডলার) প্রায় ৬০ ভাগ পাঠিয়েছে। যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশীরা চাকরি হারালে প্রবাসী আয়েও প্রভাব ফেলবে।

ভারত

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ওয়াশিংটন অনুরোধ করবে দিল্লিকে তার বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর ঘাঁটিগুলোকে ব্যবহার করতে দিতে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে লজিস্টিকস এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অব এগ্রিমেন্ট (এলইএমওএ) রয়েছে।

এক্ষেত্রে ভারতের মার্কিনবান্ধব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উভয় সঙ্কটে পড়ে যাবেন। তিনি তার বন্ধু ট্রাম্পের সহায়তা কামনা করলেও অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তেমন সাহায্য পাচ্ছেন না বলে ভারতবাসী মনে করছে। ২০১৪ সাল থেকে তার আমলেই ভারতের শিল্প উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে, কৃষি খাতে সমস্যা হচ্ছে, কৃষকেরা আত্মহত্যা করছে। ব্যবসা হ্রাস পাওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে।

ইরানি তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারতকে বেশি দামে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব থেকে তেল আমদানি করতে হচ্ছে। ভারতকে বেশ সুবিধাজনক শর্তে দিনে ৫০ হাজার ব্যারেল তেল রফতানির প্রস্তাব দিয়েছিল ইরান। কিন্তু মার্কিনিদের খুশি রাখতে ওই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি মোদি।

ভারতীয় চায়ের একক বৃহত্তম আমদানিকারণ হলো ইরান। তারা ২০১৯ সালে ৫০ মিলিয়ন কেজির বেশি চা কিনেছে। এটি ভারতের মোট চা রফতানির ১০ ভাগ। পাকিস্তানকে এড়িয়ে মধ্য এশিয়ায় যাওয়ার জন্য ইরানে চাবাহার বন্দর উন্নয়নের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল ভারত, তাতেও সমস্যার সৃষ্টি হবে।

প্রবাসী আয়ের দিক থেকে ভারত ২০১৮ সালে রেকর্ড ৮০ বিলিয়ন ডলার পেয়েছিল। বিশ্বে তারা প্রথম স্থান অধিকার করেছিল প্রবাসী আয়ের দিক থেকে। আর এর মাধ্যমে চীনকে (৬৭) দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিয়েছিল। তাদের পরে রয়েছে মেক্সিকো ও ফিলিপাইন। উভয়ের আয় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। মিসরের আয় ২৬ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধ হলে এই আয়ে প্রভাব পড়বে।

পাকিস্তান

সোভিয়েত আমলে যুক্তরাষ্ট্রের এবং বর্তমানে তালেবানের পক্ষ নিয়ে আফগান যুদ্ধে পাকিস্তান অনেক ভুগেছে। ফলে তারা আরেকবার এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে চাইবে না। পাকিস্তান জানিয়ে দিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ হলে তারা কোনো পক্ষ নেবে না।

প্রতি বছর পাকিস্তানের প্রবাসী আয় ১৯.৩ বিলিয়ন ডলার। এ দিক থেকে তারা পঞ্চম স্থানে রয়েছে। এর বড় অংশটিই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

তাছাড়া যুদ্ধ হলে আফগান শান্তিপ্রক্রিয়ায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

আফগানিস্তান

ভারতের মতো আফগানিস্তানও ইরানের চাবাহার বন্দরের উন্নয়নের ব্যাপারে আগ্রহী। আর কাবুল সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। চাবাহারের ব্যাপারে কিছুটা পরোক্ষভাবে ছাড় দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরানের সাথে যুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে খুবই কঠিন হবে।

তাছাড়া যুদ্ধ হলে ইরান প্রক্সিও ব্যবহার করবে। বিশেষ করে কাবুল সরকারের বিরুদ্ধে তার ফাতেমিয়ুন ব্রিগেডকে ব্যবহার করতে পারে।

শ্রীলঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শ্রীলঙ্কার চা শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান ও ইরাক হলো শ্রীলঙ্কার চায়ের প্রধান ক্রেতা। তারা নভেম্বরে যথাক্রমে ২০,২৬৩ টন ও ৩৫,৩৬৭ টন চা আমদানি করেছে।

ইরানের সাথে শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যগত সুসম্পর্ক রয়েছে। ইরানি অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের জন্যই সাপুগাসকান্দায় শোধনাগার নির্মাণ করেছিল শ্রীলঙ্কা। মার্কিন অবরোধের ফলে এই শোধনাগার সমস্যায় পড়েছে। ভারতের মতো শ্রীলঙ্কাও বেশি দামে অ-ইরানি তেল কিনছে।

শ্রীলঙ্কায় নিত্যপণ্যের দাম হাতের নাগালে রাখার জন্য তেলের দাম কম রাখতে হচ্ছে। কিন্তু এতে করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আমদানিকারক ও বিতরণকারী সেপেটকো ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।