আমরা লাইভে English রবিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০২১

জাপানি তহবিলপুষ্ট রেল প্রকল্প নির্দয়ভাবে বাতিল শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে

SAM SPECIAL-ENG-01-10-2020 (1)

বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে সীমিত ব্যবহারের যৌক্তিক যুক্তির ভিত্তিতে শ্রীলঙ্কা সরকারের কলম্বোর জাপানি তহবিলপুষ্ট লাইট রেলওয়ে ট্রান্সপোর্ট (এলআরটি) বাতিল করাটা যথাযথই মনে হতে পারে। কিন্তু আকস্মিক ও অমার্জিত যে পন্থায় কাজটি করা হয়েছে তার ফলে জাপানের সাথে সম্পর্কে তিক্ততার সৃষ্টি হতে পারে। উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে শ্রীলঙ্কার স্বাধীনতার পর থেকে জাপানের সাথে বন্ধুত্ব বজায় রেখেছে শ্রীলঙ্কা এবং চীন ২০১৬ সালে ছাপিয়ে যাওয়ার আগে টোকিওই ছিল কলম্বোর প্রধান ঋণদাতা।

জাপানকে আস্থায় না নিয়ে কিংবা জাপানকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানিয়েই প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে এক কূটনীতিক বলেন, এটি বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের অনুভূতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে অন্য দেশের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পদক্ষেপের সাথে সম্পর্কিত নয়, তা পুরোপুরি বাণিজ্যিক।

কোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারক থেকে শ্রীলঙ্কার বের হয়ে যাওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম ঘটল না। আগের ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) সরকার (২০১৫-২০১৯) দুর্নীতির অভিযোগে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের চীনা তহবিলপুষ্ট কলম্বো পোর্ট সিটি প্রকল্প এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলিয়ে রেখেছিল। পরে ক্ষতিপূরণ হিসেবে চীনাদেরকে আরো বেশি জমি দিয়ে সমস্যাটির সমাধান করা হয়েছিল। বর্তমান রাজাপাকসা সরকার কলম্বো পোর্টের ইস্টার্ন টার্মিনাল পরিচালনা করতে জাপান ও ভারতের সাথে করা সহযোগিতা চুক্তি বাস্তবায়ন স্থগিত করে রেখেছে। জাতীয়তাবাদী বন্দরকর্মীদের চাপ ও জাতীয় সম্পত্তি নিজের কাছে রাখার সরকারি নীতিকেই এই অচলাবস্থার পেছনে কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

শ্রীলঙ্কা ২০১৭ সালে ভারতের সাথে বিভিন্ন যৌথ প্রকল্পে ১৫টি সমঝোতা স্মারকে সই করে। কিন্তু নয়া দিল্লীর তাগাদা সত্ত্বেও স্থবির হয়ে আছে এগুলো। বর্তমান গোতাবায়া রাজাপাকসা সরকার বলছে, তারা এসব প্রকল্প পর্যালোচনা করছে, শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন হলেই কেবল এগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।

আগাম ইঙ্গিত

এলআরটি প্রকল্পে মালাবে থেকে নগরীর মধ্যভাগে ফোর্ট পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার ইলেভেটেড ট্রাক স্থাপন করতে হবে। প্রতিটি ট্রিপে ৮০০ যাত্রী নিয়ে প্রতি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে চললে এই পথ অতিক্রম করতে ৩২ মিনিট লাগবে। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালে। এটি হওয়ার কথা ছিল ৪০ বছরে পরিশোধযোগ্য ২.২ বিলিয়ন ডলারের জাপানি সফট ঋণে।

গোতাবায়া সরকার কয়েক মাস আগে ইঙ্গিত দিয়েছিল, তারা এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে না। শ্রীলঙ্কা-জাপান যৌথ সমীক্ষায় এটি কলম্বোর যানজট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে বলা হলেও ২০১৯ সালের নভেম্বরে ক্ষমতায় আসা গোতাবায়া সরকার তাতে সন্দেহ পোষণ করেছিল। তাছাড়া নগর উন্নয়নের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকা প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার এ ব্যাপারে নিজস্ব ধারণা রয়েছে।

আর্থিক সীমাবদ্ধতা

শ্রীলঙ্কার আর্থিক বিষয়াদি বিবেচনা করলে বলতেই হবে, খরচের ব্যাপারে হাত সংযত করতেই হবে। ২০২০ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ১.৬ ভাগে সীমিত থাকবে। আর শ্রীলঙ্কার ঋণের বোঝা বেড়ে হবে ৫৫ বিলিয়ন ডলার। এই ঋণের মধ্যে ১৪ ভাগ চীনা, এডিবির ১৪ ভাগ, জাপানের ১২ ভাগ, বিশ্বব্যাংকের ১১ ভাগ, ভারতের ২ ভাগ।

চলতি মাসে রেটিং অ্যাজেন্সি মুডিস শ্রীলঙ্কার মান অবনমন ঘটিয়েছে। আগামী কয়েক বছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে সহায়তার প্রয়োজন হবে। মুডিসের মতে, আগামী মাসে শ্রীলঙ্কাকে ১.০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর ফলে দেশটির বৈদেশিক রিজার্ভ আরো সঙ্কুচিত হবে।

ঋণ পরিশোধ বিলম্বকরণ

তবে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসা ও প্রধানমন্ত্রী মহিন্দা রাজাপাকসা ঋণ পরিশোধের সময়সীমা পিছিয়ে দিতে ভারত, চীন ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কাছে অনুরোধ করেছেন। শ্রীলঙ্কার রিজার্ভ ব্যাংক সার্ক ফ্যাসিলিটির আওতায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার বিনিময় চেয়েছে। মে মাসে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া ভারতের সাথে ১.১ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময়ের অনুরোধ করেছেন। এসব অনুরোধ এখনো দিল্লীর বিবেচনাধীন।

এদিকে কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করতে শ্রীলঙ্কাকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে চীন। কিন্তু ঋণ পরিশোধ বিলম্ব করার অনুরোধে চীনা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, এটি শ্রীলঙ্কার জন্য শুভ হবে না।

প্রকল্প বাতিলের পরিণাম

এলআরটি প্রকল্প বাতিলের রাজনৈতিক/মনোস্তাত্ত্বিক মাত্রা রয়েছে। ২০১৭ সালের ওই চুক্তিটি ছিল দুই সরকারের মধ্যকার আন্তর্জাতিক চুক্তি। ফলে এটি একতরফাভাবে বাতিল করা যায় না। এখন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে জাপান কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে কিনা তা দেখার বিষয়। তবে সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, এ ধরনের কোনো চুক্তি বাতিল করা হলে তা শ্রীলঙ্কা সরকারের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার সৃষ্টি হতে পারে।

তাছাড়া শ্রীলঙ্কার দীর্ঘ দিনের বন্ধু জাপানকে আহত করাও শ্রীলঙ্কা সরকারের জন্য কল্যাণকর হবে না। শ্রীলঙ্কানরা জাপানকে কল্যাণকর বন্ধু হিসেবে দেখে। তারা ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় বিপুলভাবে বিনিয়োগ করেছিল।

এর বিনিময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের শোচনীয় পরাজয়ের পর দেশটির প্রতি মানবিক আচরণ প্রদর্শনের জন্য তারা শ্রীলঙ্কার প্রতি দেশটি কৃতজ্ঞও রয়েছে। বিজয়ী মিত্র বাহিনী যখন জাপানকে জার্মানির মতো ভাগাভাগি করে নিতে চেয়েছিল, তখন শ্রীলঙ্কা প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আর যুদ্ধপরবর্তী শ্রীলঙ্কা প্রতিনিধিদল বুদ্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিল যে ঘৃণা নয়, বরং ভালোবাসাই সত্যিকারের শান্তি আনতে পারে। জাপানের কাছ থেকে কোনো ধরনের যুদ্ধ ক্ষতিপূরণ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শ্রীলঙ্কা।

জানা গেছে, শ্রীলঙ্কা সরকার রাজি থাকলে জাপান এখনো নগর রেলওয়ে প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করতে প্রস্তুত।

সরকার এই প্রকল্পটি নিজেদের অর্থায়নে করবে কিনা তাও স্পষ্ট নয়। সরকার ইউএস মিলিনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশনের তহবিলও তার পরিবহন খাতকে চাঙ্গা করার জন্য ব্যয় করতে পারে। কিন্তু ৪৮০ মিলিয়ন ডলারের এমসিসি কমপ্যাক্ট খুবই বিতর্কিত। শ্রীলঙ্কার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় আইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্টের একটি কমিটি এ ব্যাপারে নতুন করে আলোচনা করতে বলেছে।