আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২০

পাকিস্তানকে ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছে সেনাপরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়

COLUMN-ENG-05-09-2020

১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দি ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সেসস অ্যান্ড টেকনোলজি (এনইউএসটি) হলো পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর পরিচালনায় একটি সরকারি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়। ইসলামাবাদে এর প্রধান ক্যাম্পাস। শুরুতে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের জন্য সমন্বিত প্রকৌশল কলেজ ও স্কুলের প্রয়োজন পূরণের জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিকাশের জন্য ইসলামাবাদে প্রধান ক্যাম্পাস করে সরকারি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয় একে। বর্তমানে এনইউএসটি হলো ব্যাপকভিত্তিক একটি সিভিল-মিলিটারি সহযোগিতার প্লাটফর্ম। এর ১৯টি কনস্টিটিউয়েন্ট ইনস্টিটিউশন (৫টি সামরিক কলেজসহ) পাকিস্তানের ৫টি নগরী (ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, রিসালপুর, করাচি ও কোয়েটা) সাতটি ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি দেশের চারটি প্রদেশেই বিস্তৃত সত্যিকারের একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

এনইউএসটি একটি আমেরিকান ইউনিভার্সিটিকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করেছে, ফলিত বিজ্ঞান ও প্রকৌশলকে গুরুত্ব দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি ডক্টরাল ও পেশাগত ডিগ্রিসহ আন্ডারগ্রাজুয়েট ও গ্রাজুয়েট ডিগ্রি দিয়ে থাকে। সেক্টার এইচ-১২-এ অবস্থিত ইসলামাবাদ ক্যাম্পাসটি অত্যাধুনিক গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গবেষণা করার মতো পরিবেশও সেখানে সৃষ্টি করা হয়েছে।

সারা পাকিস্তান থেকে সবচেয়ে প্রতিভাধর ছাত্রদের এখানে গ্রহণ করা হয়। তবে ৬০ ভাগের বেশি ছাত্র আসে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো থেকে। আর্থিকভাবে সমস্যায় থাকা ছাত্রদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থাও করা হয়। আর এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক ব্যবধানও হ্রাস করে যাচ্ছে।

এখান থেকে কারিগরি ও বিজ্ঞান প্রোগ্রাম থেকে বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষার্থীও বের হয়ে আসছে। মনে রাখতে হবে, পাশ্চাত্যে এখনো প্রকৌশল পেশায় প্রাধান্য বিস্তার করে আছে পুরুষেরা। খুবই কঠিন হওয়ায় এই শাখায় মেয়েরা ভালো করতে পারে না বলে কথা প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু মেয়েরা এই মিথ ভেঙে দিচ্ছে। মেয়েরা এনইউএসটির বিভিন্ন শাখায় ক্রমবর্ধমান হারে ভর্তি হয়ে দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। 

সময়ের পরিক্রমায় এনইউএসটির পড়াশোনা ও গবেষণার মান বেড়েছে। সেইসাথে বেড়েছে আন্ডারগ্রাজুয়েট ও পোস্ট গ্রাজুয়েট প্রোগ্রামের সংখ্যা। আর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ১৯টি প্রোগ্রামের সবই ওয়াশিংটন অ্যাকর্ড অনুযায়ী হচ্ছে। 

এনইউএসটির শিক্ষা ও গবেষণা পাকিস্তানের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদার সাথে সম্পর্কিত। এনইউএসটি ৭১১টি প্যান্টেন্ট দাখিল করেছে, ১২৩টি পুরস্কার (গত দুই বছরে ৮০ ভাগের বেশি) জয় করেছে। আর এনইউএসটি হতে যাচ্ছে পাকিস্তানের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যে শিল্পে প্রযুক্তি হস্তান্তর করছে। গত তিন বছরেই হস্তান্তর করেছে ১৩টি প্রযুক্তি। মোট ৩৬টি মেধাস্বত্ব লাভ করে আমদানির বিকল্প উৎস হিসেবে এর আবির্ভাব ঘটেছে।

পাকিস্তানের অনেক প্রথমের সাথে এনইউএসটি যুক্ত হয়ে গেছে। তারাই প্রথম সায়েন্সস অ্যান্ড টেকনোলজি পার্ক স্থাপন করেছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নাস্টের ইসলামাবাদ ক্যাম্পাসে ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পার্ক নামে এটি উদ্বোধন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্ভাবন কার্যক্রমে অনেক বিদেশী প্রতিষ্ঠানও যুক্ত হয়েছে।

কোভিড-১৯-এর মহামারির সময়টি নাস্টের বিজ্ঞানীদের জন্য চ্যালেঞ্জিং কাল। রোগটি নিয়ে এনইউএসটির বিজ্ঞানীরা নানা উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্বল্প ব্যয়ে পরীক্ষা করা, পরীক্ষার সরঞ্জাম উদ্ভাবন নিয়ে তারা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।

এনইউএসটির বিজ্ঞানীরা মহাকাশ নিয়েও গবেষণা করছে। এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে এনইউএসটি কলেজ অব ইলেকট্রিক অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং।

আবার ন্যাশনাল সেন্টার অব রোবোটিকস অ্যান্ড অটোমেশনের রোবট ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ল্যাব দ্বিভাষী (উর্দু ও ইংরেজি) স্ক্রিনিং অ্যাপ উদ্ভাবন করেছে। অ্যান্ড্রয়েডে এটিই বিশ্বের প্রথম উর্দু অ্যাপ। এর নাম দেয়া হয়েছে কোভিডচেক পাকিস্তান। এই অ্যাপটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ বিশ্বের ৯টি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি দিয়ে মাত্র দুই দিনেই ফলাফল জানা যায়। এনইউএসটির বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলীরা অ্যালকোহলমুক্ত স্যানিটাইজারও উদ্ভাবন করেছে। মাইক্রোবিয়াল নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি উচ্চমানের স্যানিটাইজার হিসেবে স্বীকৃত। 

দেশের ভেতর ও বাইরের নানা উৎস থেকে শিক্ষা ও গবেষণা সহায়তা নিয়ে এনইউএসটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দুনিয়ায় গভীরতর প্রভাব ফেলেছে। এই লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একযোগে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি ৩৫টি দেশের ১৬৫টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এর রয়েছে বিনিময়যোগ্য চুক্তি। ফলে এনইউএসটির ছাত্ররা তাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার বাড়াতে পারছে, তারা আরো ব্যাপক পরিসরে জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণ করতে পারছে।

এসব অর্জনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির সুনামও বাড়ছে। এটি কেবল পাকিস্তানের ১ নম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, গত বছর সে বিশ্বে ৬১তম স্থান অধিকার করেছিল। সেরা ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়েল তালিকায় পাকিস্তানের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সে।

এ ধরনের সাফল্য নিয়ে এনইউএসটিকে অবশ্যই পাকিস্তানের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মডেল হিসেবে এগিয়ে আসতে হবে। 

 

লেখক: প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক