আমরা লাইভে English শনিবার, ডিসেম্বর ০৪, ২০২১

ভারত মহাসাগরকে শান্তির অঞ্চলে পরিণত করার ডাক শ্রীলঙ্কার

us-navy-indian-ocean (1)
ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী

স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো শ্রীলঙ্কা গত বুধবার ভারত মহাসাগরকে শান্তির এলাকায় পরিণত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পাঁচ দশক আগে ১৯৭১ সালে ওই সময়ের শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক ভারত মহাসাগরকে শান্তির এলাকায় পরিণত করার জন্য জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। চীন ছাড়া নিরাপত্তা পরিষদের অন্যান্য শক্তিগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও বিশ্ব সংস্থাটি প্রস্তুবটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছিল। 

ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের (আইওআর) নিরাপত্তা পরিস্থিতি ১৯৭১ সালের মতোই ভয়াবহ হওয়ার প্রেক্ষাপটে শ্রীলঙ্কার বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসা এই অঞ্চলে শান্তির জন্য মিসেস বন্দরনায়েকের আহ্বানেরই পুনরাবৃত্তি করেন চারটি দেশের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের সামনে বক্তৃতাকালে। 

গোতাবায়া বলেন, শ্রীলঙ্কা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করায়, দেশটি অনেক শক্তির মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তবে শ্রীলঙ্কা নিরপেক্ষতা অবলম্বনের নীতি গ্রহণ করেছে, এই দেশের পররাষ্ট্রনীতি আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে দূরে থাকার নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ভারত মহাসাগর সব দেশের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। 

ভারত মহাসাগরে একদিকে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ ও ভারত এবং অন্য দিকে চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে গোতাবায়া এই আহ্বান জানালেন। শ্রীলঙ্কার কাছ থেকে হাম্বানতোতা বন্দর ইজারা নেয়া, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের বন্দর নির্মাণে তার ভূমিকা, মালদ্বীপ নিয়ে তার কথিত পরিকল্পনার কারণে পাশ্চাত্য আশঙ্কা করছে যে চীন এসব স্থাপনাকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে। 

এসব ভীতি প্রশমন করে গোতাবায়া রাষ্ট্রদূতদের বলেন, হাম্বানতোতা বন্দরটি বিপুল সম্ভাবনাময়। আগের সরকার এই বন্দরটি চীনের কাছে ইজারা দিয়েছে। তবে বন্দরটি পুরোপুরি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হবে। 

ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে শান্তির এলাকা বানানোর দাবির কথা স্মরণ করে দি আইল্যান্ডে এক নিবন্ধে শ্রীলঙ্কার সাবেক কূটনীতিক ড. জয়ন্থ ধনপালা বলেন, মিসেস বন্দরনায়েক ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে লুসাকায় জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে বক্তৃতাকালে এই ধারণাটি প্রথম দিয়েছিলেন। লুসাকা শীর্ষ সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণায় তা প্রতিফলিত হয়েছিল। 

ধনপালার মতে, মিসেস বন্দরনায়েকের প্রস্তাবের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল ব্রিটিশ-মালিকানাধীন দিয়াগো গার্সিয়া আইল্যান্ডে বসবাসরত লোকজন ও এটিকে একটি মার্কিন নৌঘাঁটিতে রূপান্তর বাতিল করা। কিন্তু ভারতীয় শিক্ষাবিদ অধ্যাপক কে পি মিশ্র মনে করেন, এই উদ্যোগের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল আধিপত্যকামী শক্তি ও প্রধান প্রধান শক্তির লড়াই থেকে ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব জোরদার করা। 

তিনি তার প্রবন্ধে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান সঙ্ঘাতের সময় ভারত মহাসাগরে পরমাণু শক্তি-চালিত রণতরীর নেতৃত্বে একটি নেভাল টাস্ক ফোর্স পাঠালে বাইরের শক্তির উপস্থিতি প্রকট হয়ে ওঠে। 

মিসেস বন্দরনায়েক ১৯৭১ সালের ১২ অক্টোবর ইস্যুটি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উত্থাপন করে নিম্নোক্ত পরামর্শগুলো দেন: ‌১. রণতরী ও সামরিক সম্ভারবাহী জাহাজের এখান দিয়ে চলাচলের অধিকার থাকবে, তবে এগুলো জরুরি কারণ ছাড়া যাত্রাবিরতি করতে পারবে না। ২. নৌমহড়া, গুপ্তচরবৃত্তি ও অস্ত্রপরীক্ষা হতে পারবে না। ৩. সব বিদেশী সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেয়া। 

কিন্তু বিশ্বের শক্তিগুলোর কাছে তা গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। 

তারা প্রধানত চারটি কারণে শান্তির এলাকার ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়: ১‌. এ ধরনের প্রস্তাব সাগরে সব জাহাজ চলাচলের অবাধ সুযোগ লাভের ১৯৫৮ সালের আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। ২. গভীর সাগরে কয়েকটি দেশ বা অঞ্চল আলাদা আইনগত অবস্থান সৃষ্টি করতে পারে না। ৩. ভারত মহাসাগর কেবল আশপাশের এলাকার নয়, বরং পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। ৪. কোনো যুদ্ধজাহাজের উদ্দেশ্য যাচাই করা কঠিন কাজ। 

শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধি শিরলে অমরসিঙ্ঘের নেতৃত্বাধীন প্রস্তাব উপস্থাপন করা দল যুক্তি দেয় যে গভীর সাগরের স্বাধীনতা সব জাতির জন্য সমানভাবে কাজ করে না। 

শ্রীলঙ্কা নিরস্ত্রীকরণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ইস্যুবিষয়ক জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের প্রথম কমিটিতে তার শান্তির এলাকা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি দেয়। কিন্তু বেশির ভাগ পাশ্চাত্য দেশ একে সমর্থন করা থেকে বিরত থাকে, এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স কঠোরভাবে এর বিরোধিতা করে। ধনপালার মতে, এই প্রস্তাবের ব্যাপারে শ্রীলঙ্কার মধ্যেও বিরোধিতা ছিল। অনেক জাতীয়তাবাদী মনে করে, এর ফলে ভারত মহাসাগরে ভারতের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। 

অবশ্য জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদ প্রস্তাব ২৮৩২ (১৯৭১)-এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরকে শান্তির এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি আরো না বাড়ানোর ব্যাপারে তীরবর্তী দেশগুলোর সাথে অবিলম্বে আলোচনা শুরু করার জন্য পরাশক্তিগুলোর প্রতিও এতে আহ্বান জানানো হয়। 

ধনপালা উল্লেখ করেন, ঘোষণায় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া শান্তি ও নিরাপত্তার আওতায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুগুলো নিরসনের কথাও বলা হয়। 

জাতিসঙ্ঘ প্রস্তাব ২৯৯২ (XXVII) গ্রহণ করা হয় ১৯৭২ সালের ৫ ডিসেম্বর। একটি অ্যাডহক কমিটিও গঠন করা হয়। 

তবে মিশ্র উল্লেখ করেন, ভারত মহাসাগরীয় শান্তি এলাকা প্রতিষ্ঠার প্রভাব সমীক্ষার জন্য ওই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটি কোনো সুপারিশ পেশ করতে পারেনি। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরে পরাশক্তিগুলোর সামরিক শক্তি বাড়ানো এবং তাদের সামরিক স্থাপনা, পরমাণু অস্ত্র, সামরিক উপস্থিতি বিলীন করার জন্য কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে, সে ব্যাপারে কিছু বলেনি। 

অবশ্য ১৯৭৬ সালে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হলে ১০৬টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। বিপক্ষে কেউ ভোট দেয়নি, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ২৬টি দেশ ভোট দানে বিরত থাকে। 

যুক্তরাষ্ট্র দলের প্রতিনিধি জানান, এই প্রস্তাবটি তাদের দেশের নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। 

অবশ্য পরাশক্তির ভারসাম্য বদলাতে থাকে ১৯৭৭ সাল থেকে। এই ইস্যুতে সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটিতে প্রস্তাবের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ১২৩টি দেশ ভোট দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বিপক্ষে ভোট দেয়। ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পেতেই সোভিয়েত ইউনিয়ন এর পক্ষে ভোট দিয়েছিল। দিয়াগো গার্সিয়ার সম্প্রসারণ, পোলারিস ও পোসিডেনের মতো এলাকায় মার্কিন সাবমেরিন মোতায়েনসহ মার্কিন তৎপরতার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ওই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল।