আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

মিয়ানমারে নির্বাচন: ‘লাল ঢেউয়ে’ ভেসে বিজয়ের দিকে চলেছে এনএলডি

SAM SUNDAY FEATURE-ENG-07-11-2020-1

অং সান সু কি 

আগামী পাঁচ বছর কোন দল দেশ শাসন করবে, সেটি নির্ধারণের জন্য রোববার (৮ নভেম্বর) ভোট দিতে যাচ্ছে মিয়ানমারের বহু মিলিয়ন ভোটার। অধিকাংশ বিশ্লেষক ও ভাষ্যকার ভোটের আগেই নির্বাচনের ফলের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন। ক্যারিশম্যাটিক নেতা অং সান সু কির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) – যারা ২০১৫ সালে ভূমিধস বিজয় পেয়েছিলো – তারাই আবার ক্ষমতায় ফিরবে, যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠতা আগের চেয়ে কমে যেতে পারে। 

যদিও নির্বাচনে ৯০টির বেশি দল অংশ নিচ্ছে – যাদের প্রায় অর্ধেকই জাতিগত দল – তবে এনএলডির জেতার সম্ভাবনাই বেশি। সারা দেশে এনএলডির সমর্থকদের যে লাল ঢেউ দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে মধ্য ও উত্তর মিয়ানমারে, ইরাবতী ব-দ্বীপের চারপাশে, মান্দালে, পেগু ও ইয়াঙ্গুনের বামারদের (মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় জাতিগত গ্রুপ) যে বিপুল সমর্থন, সেটা এই দল আর তার নেতাকে আবার ক্ষমতায় পাঠাবে। 

আন্তর্জাতিক অনুগ্রহ হারানো 

মিয়ানমারের নেতা নিশ্চিতভাবে আন্তর্জাতিক অনুগ্রহ হারিয়েছেন: সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উপর নিপীড়ন চালানো জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছেন। তিনি সেনাবাহিনীকে রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে শুদ্ধি অভিযান চালাতে দেন। যার ফলে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে প্রতিবেশি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সেখানে শরণার্থী শিবিরগুলোতে তারা দুই বছরের বেশি সময় ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তবে এটা তার পুননির্বাচিত হওয়ার পথে বাধা হবে না।

আসলে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালানোর দায়ে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিজে) দায়ের কারা মামলায় গতবছর ডিসেম্বরে তিনি যখন দেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন তখন দেশে তার জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে যায় এবং ‘দেশ মাতা’ হিসেবে ভাবমূর্তি গড়ে উঠে।

তবে সরকারের বিরুদ্ধে রাখাইনের সমস্যা ও আন্তর্জাতিক হৈচৈ নির্বাচনের ফলাফলে তেমন বড় কোন প্রভাব ফেলবে না। ওই এলাকায় অব্যাহত সংঘাতের কারণে রাজ্যের বেশিরভাগ এলাকায় ভোটগ্রহণ বাতিল করায় তা আরো কার্যকরভাবে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছে। ফলে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারবে না বলে নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারীরা মনে করেন। যদিও এর ফলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে এবং এটা আসলেই অবাধ ও নিরপেক্ষ হচ্ছে কিনা সেই প্রশ্নও উঠেছে। তবে এতে নির্বাচনী প্রচারণা বা সু কির জাতীয় অবস্থানের কোন ক্ষতি হয়নি।

“এই নির্বাচনের ফল নিয়ে কোন সন্দেহ নেই,” সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বললেন আমেরিকায় প্রশিক্ষিত ব্যবস্থাপনা কনসালটেন্ট থেকে এখন স্থানীয় এওয়াইএ ব্যাঙ্কের নির্বাহী বনে যাওয়া ক্রিস টুন। তিনি বলেন, “জনগণের মিশ্র আবেগের চূড়ায় অবস্থান করছে এখন এনএলডি: দাউ সু’র জন্য প্রশংসা ও ভালোবাসা এবং অতীতের সামরিক শাসনের জন্য ঘৃণা। এখানে অঙ্কের কোন প্রয়োজন নেই”।

সারা দেশে ৩০ জনের বেশি মানুষের সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে – যদিও এদের বেশির ভাগই শহর কেন্দ্রিক – সাউথ এশিয়ান মনিটর দেখেছে যে, ৬০% ব্যক্তি রোববার এনএলডিকে ভোট দিতে চায়। বেশ কয়েকজন বলেছেন তারা অং সান সু কি আর তার নেতৃত্বের জন্যই ভোট দিবেন। মান্দালের প্রাইভেট সেক্টরের ৬০ বছর বয়সী দাপ্তরিক কর্মী কিয়াও বলেন, আমায় সু’র (মা সু) কারণেই এনএনডিকে ভোট দেবো। আরেক সমর্থক ৪০ বছর বয়সী ট্যাক্সি ড্রাইভার মাইও মিন খাইং বলেন, ‘আমায় সু’র প্রতি ভালোবাসার কারণেই এনএলডিকে ভোট দিবেন তিনি। 

২০১৫ ও ২০২০ সালের নির্বাচনী প্রচারণা ভালোভাবে দেখলে বোঝা যায়, এনএলডির সমর্থকরা অনেকটা ফুটবল সমর্থকদের মতো। চরম আবেগ নিয়ে দল বেঁধে তারা সমর্থন করে। দলের ব্যাপারে তারা চরম সমালোচনা করে না, যদিও দলের দুর্বলতা, ভুল-ভ্রান্তির ব্যাপারেও তারা পুরো অন্ধ নয়। 

“এনএলডিকে সমর্থন দিয়েই বড় হয়েছি আমি। তারা আমার পরিবারের মতো আর মা সু আমার মায়ের মতো,” স্যামকে বললেন উত্তর ইয়াঙ্গুনের ৪০ বছর বয়সী ট্যাক্সি ড্রাইভার উইন লুইন। তিনি আরও বলেন, “তিনি যতদিন জীবিত থাকবেন আর দলের নেতৃত্ব দিবেন, আমি এনএলডিকে সমর্থন দিয়ে যাবো। কিন্তু আমি জানি যে, দল ত্রুটিমুক্ত নয় এবং তাদের ভুলভ্রান্তি আছে। অন্তত পাঁচ বছর আগে তারা ক্ষমতায় আসার পর থেকে পুলিশকে আমার ‘চা খাবার অর্থ দিতে হয়নি”।

কিন্তু সু কির প্রতি ব্যক্তিগত সমর্থনের চেয়েও ভোটের বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এনএলডি বহু দশক ধরে দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম করেছে, এনএলডি বিজয়ী হলে অন্তত তার একটা স্বীকৃতি দেয়া হবে। মান্দালের ৩০ বছর বয়সী গায়ক সিন লিন স্যামকে বলেন এনএলডির ইতিহাসের কারণেই তাদেরকে ভোট দিবো। সু কি না থাকলে মিয়ানমারে এখনও সামরিক শাসনই জারি থাকতো। 

“এটাকে গত পাঁচ বছরে সরকারের কর্মকাণ্ডের উপর গণভোট হিসেবেও দেখা হয়,” বললেন ইয়াঙ্গুন ভিত্তিক স্বাধীন ব্যবসায়ী ও ফিনান্সিয়াল কনসালটেন্ট উইলিয়াম মাউং। তিনি বলেন, “এনএলডি সরকার যদিও দেশের ও নাগরিকদের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে, তার পরও অং সান সু কি এখনও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা”।

তিনি বলেন, “ব্যবসায়ী সম্প্রদায় যদিও এখনও তাকে এবং এনএলডিকে সমর্থন দিচ্ছে, কিন্তু গত পাঁচ বছরে অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়ী খাতে তাদের ব্যর্থতার কারণে ব্যবসায়ীরা হতাশ। আগামী পাঁচ বছরে দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য তাদেরকে আরও চেষ্টা করতে হবে, পুরনো আইন সংশোধন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায় আকর্ষণের জন্য সরকারের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেটা না হলে ২০২৫ সালের নির্বাচনে তাদের মূল্য দিতে হতে পারে”।

প্রত্যাশিত ক্ষতি

যদিও নির্বাচন মনে হচ্ছে একটি ঘোড়ার দৌড়ের মতো হবে, তবে পাঁচ বছর আগের বিশাল জয় এনএলডি এবার পাবে না। বিশেষ করে জাতিগত এলাকাগুলোতে এনএলডির ব্যাপারে যে পুঞ্জিভূত হতাশা জমেছে, সেটার কারণে জাতিগত রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতা এবার বাড়তে পারে। 

জাতিগত এলাকাগুলোতে অসন্তোষ তীব্র ও ব্যাপক। আগেরবার যে সব প্রতিশ্রুতির কারণে তারা এনএলডিকে সমর্থন দিয়েছিল – তার মধ্যে ছিল জাতিগত ও স্থানীয় ইস্যুতে সমর্থন, শান্তি প্রক্রিয়া, জাতীয় সমঝোতা, ফেডারেল ব্যবস্থা চালু, গণতান্ত্রিক সংবিধান ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, বিশেষ করে স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ইস্যু। এই প্রতিশ্রুতিগুলোর ব্যাপারে এনএলডি সরকারের ব্যর্থতার কারণে তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে বলে মনে করেন জাতিগত নাগরিক সমাজের অনেক প্রতিনিধি।

পরিচয় প্রকাশ না করে একজন কাচিন রাজনৈতিক কর্মী বলেন, “আমরা প্রতারিত হয়েছি। আমি তাকে ঘৃণা করি… ঘৃণা করি, ঘৃণা করি”। 

সাবেক শান ন্যাশনালিটিজ লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এসএনএলডি) দলের নেতা ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ খুন তুন ও এক বছর আগে আমাকে বলেছিলেন যে, তিনি সু কি কে ঘৃণা করেন, এবং এনএলডিকে বিশ্বাস করেন না। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, সামরিক বাহিনীর প্রতি বিশ্বাস তার আরও কম। তিনি বলেন, “সে জন্যেই শান, এবং অন্যান্য জাতিগত সম্প্রদায়কে অবশ্যই আসন্ন নির্বাচনে জাতিগত রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন দিতে হবে”।

জাতিগত এলাকা – চিন, কাচিন, কারেন, কারেন্নি এবং মোন এলাকাতে স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সমর্থন বাড়ছে। চিন এলাকার রাজনৈতিক কর্মী এবং চিন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (সিএনএলডি) মুখপাত্র চেরি জাহাউ স্যামকে বলেন, “জাতিগত এলাকাগুলোতে মানুষের মধ্যে নতুন একটা আত্মপরিচয়ের চেতনা জেগে উঠেছে এবং সেটাই জাতিগত দলগুলোর জন্য সমর্থনে রূপ নিয়েছে – বিশেষ করে মোন, কাচিন, কারেন ও চিন রাজ্যে এটা হয়েছে”।

বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে এটা বেশি সত্য বলে জানালেন তিনি। তিনি বললেন, “নিজেদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বহিপ্রকাশের অংশ হিসেবেই জাতিগত রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে তারা… এটা অসাধারণ”। এদের অনেকেই ২০১৫ সালে এনএলডিকে ভোট দিয়েছে, কিন্তু গত পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ডে তারা হতাশ। তিনি বলেন, “বিশেষ করে চিন রাজ্যে কোন সত্যিকারের সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন বা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। দুর্নীতি হয়েছে ব্যাপক”।

চিন রাজ্যের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজের কর্মী ড. সাসা এখন এনএলডি’র চিন নির্বাচনী কমিটির নেতৃস্থানীয় সদস্য। তিনি এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি স্বীকার করেন যে চিন রাজ্যে এনএলডির ব্যাপারে কিছু অসন্তোষ রয়েছে, কিন্তু জোর দিয়ে বলেন যে, অব্যাহত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, শান্তি ও ফেডারেল সংবিধান অর্জনের জন্য এনএলডিই যে দেশের প্রধান আশা, এই স্বীকৃতি মানুষের মধ্যে রয়েছে। 

সাউথ এশিয়ান মনিটরকে তিনি বলেন, “একটা সঙ্ঘবদ্ধ দল – সবার জন্য এক, এবং একের জন্য সবাই – এ রকম দলই কেবল দেশের সবগুলো জাতিগত গ্রুপ ও উপজাতির প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। রাখাইন, কাচিন, চিনের জাতিগত দলগুলো কেবল তাদের সংকীর্ণ জাতিগত স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করছে, তাদের মধ্যে অন্য জাতিগত গ্রুপগুলো নেই। কিন্তু এনএলডি’তে সব জাতিগত গ্রুপ ও উপজাতির প্রতিনিধিত্ব রয়েছে – এটাই একমাত্র সত্যিকারের জাতীয় দল”।

জাতিগত রাজনৈতিক দলগুলো যদিও তাদের নিজস্ব এলাকায় ভালো করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, রাখাইনের মতো এলাকাতে যদিও এরই মধ্যে ভোটগ্রহণ বাতিল হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে জাতিগত ভোট এনএলডির জন্য পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নিয়োগ ও সরকার গঠনে বাধা হবে না বলেই মনে হচ্ছে।

জাতিগত দলগুলো সম্মিলিতভাবে একটি যুতসই তৃতীয় শক্তি গঠনের আশা করছে। এবার তারা আগামী পাঁচ বছরের জন্য পার্লামেন্টে এনএলডি’র রাজনীতি ও আচরণকে প্রভাবিত করার জন্য যথেষ্ঠ শক্তিশালী ব্লক গঠন করতে পারে। একই সঙ্গে পরিণত হতে পারে কিংমেকারে।