আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

‘ইব্রাহিমি চুক্তি’: কী করবে পাকিস্তান

column-eng-20-08-2020y

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইল ১৩ আগস্ট মার্কিন মধ্যস্ততায় একটি চুক্তিতে সই করেছে। একে ‘ইব্রাহিমি চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যা দিয়ে ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিস্টান- এই তিন ধর্মের প্রতিনিধিত্বকারী তিন পক্ষকে বোঝানো হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, আমিরাতি ক্রাউন প্রিন্স ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায় চুক্তিটিকে কূটনৈতিক, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কৌশলগত এজেন্ডা প্রতিষ্ঠায় একটি পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

লিখিত ভাষ্য অনুযায়ী, এতে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ‘স্বাভাবিক’ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। সম্পর্কের মধ্যে থাকবে ব্যবসা, পর্যটন, সরাসরি বিমান চলাচল, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা।

এই প্রক্রিয়া কখন শুরু হবে, তা স্পষ্ট না হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আলোচনা শুরু হবে। ইব্রাহিমি চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খোলাসা করে বলা হয়নি। সেটি হলো আঞ্চলিক হুমকি, বিশেষ করে ইরান ও এর প্রক্সিগুলোর বিরুদ্ধে বর্ধিত নিরাপত্তা সহযোগিতা।

অনুমান করা যেতেই পারে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে চাইবেন আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার আবার জয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে।

ইসরাইলি সরকারের পশ্চিম তীরের বিশাল অংশ সম্প্রসারণ করার ঘোষণা নিয়ে কয়েক মাস ধরে যে বিতর্ক চলছিল, তার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির কথা ঘোষণা করা হলো। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অবশ্য বলেছেন, এই চুক্তির প্রেক্ষাপটে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত থাকবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, সম্প্রসারণ কেবল স্থগিত করা হয়েছে। এর মানে এই নয় যে ভবিষ্যতে তা আবার শুরু হবে না।

ইসরাইল ও আমিরাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিল। ২০১৫ সালে আবু ধাবিতে কূটনৈতিক অফিস খোলে ইসরাইল। তাছাড়া সিনিয়র ইসরাইলি কর্মকর্তারা আবু ধাবি সফর করেছেন, আমিরাতে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাগুলোতে ইসরাইলি ক্রীড়াবিদেরা অংশ নিয়েছেন। 

তিনটি আরব রাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছে। এরা হলো মিসর, আলজেরিয়া ও কাতার। এরদোগান এই চুক্তির প্রচণ্ড বিরোধিতা করলেও একমাত্র অনারব মুসলিম দেশ হিসেবে তুরস্কের সাথে ইসরাইলের কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক ছাড়াও সক্রিয় সামরিক সহযোগিতা কর্মসূচিও রয়েছে। ইসরাইলের সাথে অন্তত ১২টি আরব/মুসলিম দেশের বিভিন্ন পর্যায়েল যোগাযোগ রয়েছে। বাহরাইন বা ওমানের মতো আরব দেশগুলো শিগগিরই ইব্রাহিমি চুক্তিতে শরিক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফিলিস্তিনিদের জন্য এর কী অর্থ হবে? ইব্রাহিমি চুক্তিতে এখনো বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়নি। তবে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, তাদের জন্য চুক্তিটি ভালো হবে না।

সৌদি আরব এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। মিসর একে স্বাগত জানিয়েছে। ১৯৪৯ সাল থেকে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক থাকা তুরস্ক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছে। ভারত স্বাভাবিকভাবেই চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছে। পাকিস্তান এখন পর্যন্ত সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি বেশ ধোয়াশার মধ্যে আছে। 

তবে পাকিস্তানকে সত্যিকার অর্থে চুক্তিটির নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অংশটি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হতে হবে। কারণ চুক্তিতে ইরান শব্দটির উল্লেখ না থাকলেও এটি প্রবলভাবে ইরানবিরোধীই হবে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আগে থেকেই নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে। তবে এই চুক্তিটি আরো উন্মুক্ত ও আনুষ্ঠানিকভাবে সম্প্রসারিত হবে।

ইরানের সরাসারি প্রতিবেশী হলো পাকিস্তান। পাকিস্তানকে প্রথমে স্বীকৃতি দিয়েছে ইরান। তাছাড়া পাকিস্তানে শিয়া সম্প্রদায়ের সদস্য সংখ্যাও বেশ বড়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক বেশ উন্নত হয়েছে। সৌদি আরবের সাথেও পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো রয়েছে। তবে পাকিস্তান পররাষ্ট্র দফতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।

২০০৩ সালের মে মাসে ইসরাইল সফর করে আমি ‘ভিজিটিং দি ফরবিডেন ল্যান্ড’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন লিখেছিলাম। তাতে আমি বলেছিলাম, ওই ব্যাপারে পাকিস্তান বা মুসলিমদের প্রতি কোনো বৈরিতা বা বিরাগ দেখিনি। অবশ্য ফিলিস্তিনিদের অবিশ্বাস ছিল। অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন ছাড়া ইসরাইলিরা সাধারণভাবে স্বীকার করে যে ফিলিস্তিনিদের সাথে তাদের সহাবস্থান করা উচিত। ইসরাইলে ঘোরাফেরা করা যেকোনো ইউরোপিয়ান দেশে ঘোরাফেরার মতোই মনে হয়েছিল। সেখানকার দোকানপাট, খাবারের আউটলেট সবই একই রকম। তবে ভিন্নতা দেখা যাবে রাস্তার পাশে বা বাস স্টপগুলোতে। সেখানে প্রায়ই ইউনিফর্ম পরা সৈন্যদের দেখা যাবে। তাছাড়া তরুণ, তরুণীদের রাইফেল হাতে রাখতে দেখা যায়। তারা দায়িত্ব পালন করছে, তা নয়। তারা তাদের ব্যক্তিগত অস্ত্র বহন করছে। রিজার্ভদের সাথে ব্যক্তিগত অস্ত্র রাখতে হয়, যাতে ডাক আসলেই নির্ধারিত স্থানে যেতে পারে অস্ত্র নিয়ে।

নিরাপত্তা বেশ কঠোর, তবে ইসরাইলের মধ্যে উদ্বেগ তেমন দেখা যায়নি। এটা পশ্চিম তীরের সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে সামরিক যান ব্যাপক হারে দেখা যায়। জেরুসালেমে আমি খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুসলিম কোয়ার্টারে গিয়েছি কোনো বাধানিষেধ ছাড়াই। আমি ‘ওয়েলিং ওয়ালে’ বিশেষ সফর করেছিলাম। 

পুরনো জেরুসালেম সফরের সময় পবিত্র স্থানগুলোর ফটকে ফিলিস্তিনি প্রহরীরা আমার পাকিস্তানি পরিচয় জেনে পরিদর্শনের বিশেষ ব্যবস্থা করে দিলো। আমি বিশেষ সুবিধায় আল-আকসায় জোহরের নামাজ পড়লাম, আসর পড়লাম ডোম অব রকে।

আমি অধিকৃত ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি নৃশংসতাকে ক্ষমা করছি না। তবে উচ্ছেদ হওয়া লাখ লাখ ফিলিস্তিনির দুর্ভোগ প্রশমনে দখলদারিত্ব অবসানের জন্য বিচক্ষণ পন্থাই অবলম্বন করা উচিত। আত্মঘাতী বোমা হামলায় বিশ্বজুড়ে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়। এতে করে ইসরাইলেরই সুবিধা হয় অধিকৃত এলাকায় তাদের অবস্থান জোরদার করার অজুহাত দিতে। পাকিস্তানে কেন ইসরাইলিদের খারাপ দেখা হয়, তা রহস্যজনক। আমার মা-বাবা অন্তত এই অপবাদ দেয়নি। ইহুদিদের সংস্পর্শে এসে বুঝতে পেরেছি, অন্য মানুষদের মতোই ভালো ও খারাপ আছে তাদের মধ্যে। আমরা কেন ধর্মের নামে পুরো জাতিকে ভয়াল হিসেবে তুলে ধরছি? ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি নৃশংসতার নিন্দা আমি অবশ্যই করছি। ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার প্রতিও আমরা পূর্ণ সহানুভূতি আছে। আমি আত্মঘাতী বোমা হামলার নিন্দাও করি, নির্দোষ ইসরাইলি জীবনের ক্ষতিকেও নিন্দা করি। এই চক্র অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। আমি প্রবলভাবে মনে করি, ঠাণ্ডা মাথায় ইসরাইলের সাথে সংলাপে বসা উচিত এবং ফিলিস্তিনিদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতেই স্থায়ী নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। ইসরাইলকে স্বীকৃতি যোগ-বিয়োগের হিসাবে দেয়া ঠিক নয়। বরং জাতি, ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষকে এক কাতারে আনার প্রয়োজন রয়েছে। জাতি হিসেবে ইসরাইলের টিকে থাকার অধিকারকে অবশ্যই আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে। স্থায়ী শান্তির মূলে যদি ইসরাইলি সূর্যের নিচে সম্মানজনক স্থান পাওয়া যায়, তবে তা হবে খুবই কম মূল্য।

ইসরাইলি জাতীয় সঙ্গীতে অবশ্যই কিছু আক্রমণাত্মক শব্দ আছে। ইসরাইল যদি মুসলিম প্রতিবেশীদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই তাদের জাতীয় সঙ্গীত সংশোধনের বিষয়টি চিন্তা করতে হবে।

কোনো রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়া আর কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মধ্যে পার্থক্য আছে। ২০০৩ ও ২০২০ সালের মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। আমি মনে ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার সময় ফিলিস্তিনিদের সাথে তাদের আচরণ এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রগতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

 

লেখক: প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক