আমরা লাইভে English রবিবার, জুন ২৬, ২০২২

অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা উচিত কাবুলের, বাধা সৃষ্টি নয়

TOP PIC-1

আফগানিস্তানের ‘লয়া জিরগা’ যখন তালেবান যোদ্ধাদের ছেড়ে দিতে রাজি হয়, আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি তখন ৪০০ তালেবান যোদ্ধা ও কমান্ডারদের মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দেন। মনে হয়েছিল যে, ‘আন্ত:আফগান’ সংলাপের শেষ বাধাটা সরে গেছে এবং দেশ এখন দ্রুত একটা গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার দিকে যাবে। 

কিন্তু ঘানি প্রশাসন বন্দীদের মুক্তি আটকে দিতে বেশি সময় নেয়নি। তারা বলছেন যে, আফগানিস্তানের পরিস্থিতি যতটুকু দৃশ্যমান, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। যে কারো কল্পনার চেয়ে শান্তির পথে আরও অনেক বাধা রয়ে গেছে। 

ঘানি প্রশাসনের সিদ্ধান্তে বোঝা গেছে যে লয়া জিরগায় যে ঐক্যমত তৈরি হয়েছিল, সেটা নড়বড়ে এবং এর গভীর কোন রাজনৈতিক শিকড় নেই। তালেবানদের বন্দীদের ব্যাপারে কাবুলের সন্দেহ রয়েছে বলে মনে হয়। সে কারণেই বন্দি মুক্তির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং এ বিষয়ে আরও আলোচনার কথা বলা হচ্ছে। 

জিরগা কমিটির সদস্য মাওলোদা তাওয়ানা বলেন, “যে সব বন্দী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত, তাদের মুক্তি দেয়াটা আমার কাছে এবং সমাজের অন্যদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। তালেবান আমলের অন্ধকার সময়ের তিক্ত স্মৃতি আমাদের সবারই রয়েছে এবং কোন বন্দীকে মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে আমার পরিচিতের মধ্যে কেউই খুশি নন। আমরা এটাও বুঝতে পারছি যে, জিরগায় আমাদের ভূমিকাটা অনেকটাই প্রতীকী। মনে হচ্ছে আফগান সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্র আগেই মুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে এবং আমাদের সিদ্ধান্তে কিছু যায় আসে না সেখানে”।

কাবুলে তাওয়ানা এবং আরও অনেকের মধ্যেই যে উপলব্ধিটা ক্রমেই বাড়ছে, সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মানচিত্র যেভাবে বদলে যাচ্ছে, সেটা কাবুলের তাড়াহুড়ার উপর প্রভাব ফেলছে। 

সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জো বাইডেনের চেয়ে পিছিয়ে আছেন। ট্রাম্পের চেয়ে দুই অঙ্কের লিড নিয়ে এগিয়ে আছেন বাইডেন। 

চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের উল্টা ফল হয়েছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। আর কোভিড-১৯-এর হযবরল ব্যবস্থাপনার কারণে ট্রাম্প প্রেসিডেন্সির অর্জনগুলোও হারিয়ে গেছে। প্রশাসন এখন আফগান প্রশ্নের উপর নির্ভর করার চেষ্টা করছে এবং দ্রুত এর রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে। এমনকি এ জন্য যদি গত দুই দশকে অর্জিত প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের সমস্ত অর্জনকে বিসর্জন দিতে হয়, সেটাও দিতে চায় তারা। 

এরই প্রেক্ষাপটে কাবুল মনে হচ্ছে ‘দেরি করার কৌশল’ গ্রহণ করেছে। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে তারা। তাদের আশা বাইডেন প্রেসিডেন্সি হয়তো তালেবানদের ব্যাপারে এতটা ‘নমনীয়’ হবে না এবং ডেমোক্র্যাট সরকার হয়তো এমনকি খেলার নিয়মও বদলে দিতে পারেন, তালেবানদের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারে। এর মধ্যে আফগানিস্তানে নারীদের অধিকার ও মর্যাদা এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতি প্রকৃতি নির্ধারণের বিষয়টি রয়েছে। 

আফগানিস্তানের অ-পশতুন এবং অ-তালেবান গ্রুপগুলোর হিসেবে একমাত্র বিকেন্দ্রীকৃত সিস্টেম দিয়েই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে জাগিয়ে তোলা যাবে, যারা তালেবান-প্রধান কাবুলের উপর নির্ভরশীল থাকবে না। 

এই লক্ষ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে পারে, কিন্তু কাবুলের কৌশলের মধ্যে অবশ্য পুরো শান্তি প্রক্রিয়াটাকেই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আবর্জনায় ছুড়ে ফেলে দেয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে। 

একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অধৈর্য কৌশলের মধ্যে যদি তালেবানদের তুষ্ট করার বিষয় থাকে এবং পুরো দেশে তাদেরকে একমাত্র আধিপত্যবাদী শক্তি করে তোলার ঝুঁকি থাকে, সেখানে কাবুলের ‘বিলম্বের কৌশল’ হয়তো পুরো প্রক্রিয়াটাকেই ধসিয়ে দেবে এবং আফগানিস্তানকে আবার শুরুর জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। 

কাবুলকে এরই মধ্যে একটা চুক্তি মেনে চলতে হচ্ছে, যেটার অংশ তারা ছিল না। তার সাথে আরেকটি উদ্বেগ যুক্ত হয়েছে যে, এই পুরো প্রক্রিয়াটাই পরিচালিত হয়েছে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেয়ার মার্কিন আকাঙ্ক্ষা থেকে। 

দেখা যাচ্ছে, জো বাইডেনেরও একটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা কাঠামোও এই পথেই হাঁটছে। সেই হিসেবে তারা তাদের পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি এরই মধ্যে গুটিয়ে ফেলেছে এবং সেনা সংখ্যা ১৩,০০০ থেকে ৮৬০০-তে নামিয়ে এনেছে। বাইডেন জিতলেও এই প্রক্রিয়ার বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম, যদিও তালেবানদের চাপ দেয়ার জন্য এবং তাদেরকে পুরোপুরি ছাড় না দিতে সেনা প্রত্যাহারের গতি হয়তো তিনি কমিয়ে আনতে পারেন। যদিও সেটাও হবে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে পুরোপুরি সামরিক পরাজয়। 

অবশ্য কাবুল যেটা করতে পারে এবং অবশ্যই তাদেরকে যেটা করতে হবে, সেটা হলো আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ব্যাপারে কিছু মৌলিক প্রশ্নে ঐক্যমত গড়ে তোলা। শুধু কাবুল আর তালেবানদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রশ্নে নয়, বরং আফগানিস্তানের রাজনৈতিক মানচিত্রের সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলোর মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য একটা সাংবিধানিক সুরক্ষা তৈরি করা। 

এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রক্রিয়া বিলম্বিত না করে কাবুলকে বরং সকল রাজনৈতিক শক্তিকে তার চারপাশে জড়ো করতে হবে এবং একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক ফ্রন্ট গড়ে তুলতে হবে যারা একটা বহুত্ববাদী সিস্টেম বজায় রাখার জন্য তাদের মনোযোগ আর শক্তি প্রয়োগ করবে, যে সিস্টেমটা একই সাথে তালেবান এবং অ-তালেবান শক্তিগুলোকে গ্রহণ করতে পারবে। 

আফগানিস্তানের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সাথে নিয়ে এ ধরনের পদক্ষেপ একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক ফ্রন্ট গড়তে সহায়তা করবে, যেখানে তালেবানরা তাদের উগ্র-রক্ষণশীল রাজনীতি এবং ধর্মীয় অবস্থানে ফিরে যেতে পারবে না এবং আফগানিস্তানকে আবার নব্বইয়ের দশকে ফিরিয়ে নিতে পারবে না।