আমরা লাইভে English শনিবার, মার্চ ০৬, ২০২১

ভারত-চীন পারমাণবিক যুদ্ধ হলে ধ্বংস হবে পৃথিবী

259021_Abul-5

পারমাণবিক যুদ্ধ। তা সে যত ছোট আকারেই হোক না কেন, এর ক্ষতিকর প্রভাব কিন্তু ততটা ছোট নয়। ভারত ও চীনের মধ্যে অনুমেয় এমন একটি যুদ্ধ হতে পারে সবচেয়ে বড় আকারে এবং তা হতে পারে এশিয়ার জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক। এই দুই দেশের মধ্যে যদি যুদ্ধ হয় তাহলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল আন্দোলিত হবে। এর ফলে উভয় পক্ষে হাজার হাজার মানুষ মারা যাবে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতি হবে। এক্ষেত্রে ভৌগোলিক এবং জনসংখ্যাতত্ত্বের দিক দিয়েও একটি ব্যতিক্রমী ভূমিকা থাকবে। এসব কারণে যুদ্ধ হলেও তা হতে পারে সীমিত পরিসরে।

ভারত ও চীনের মধ্যে অন্তত দুুটি স্থানে অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে। তার একটি উত্তর ভারত/পশ্চিম চীন এবং পূর্ব ভারত/দক্ষিণ চীন। এসব অঞ্চলে উভয় দেশের মধ্যে ভূখন্ডগত বিরোধ অনেক পুরনো। ১৯৬২ সালের অক্টোবরে উভয় ফ্রন্টে আক্রমণ করেছিল চীন। এতে মাসব্যাপী একটি যুদ্ধ শুরু হয়। ফলে মাঠপর্যায়ে অল্প অর্জন হয় চীনের। অনলাইন ন্যাশনাল ইন্টারেস্টে এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন কিলি মিজোকামি।

‘এ চাইনিজ-ইন্ডিয়ান নিউক্লিয়ার ওয়ার উড রুইন দ্য হোল প্লানেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তিনি আরো লিখেছেন, উভয় দেশই ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা আগে হামলা চালানোর নীতি গ্রহণ করে না। ফলে এক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা কম। উভয় দেশেরই জনসংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিটি দেশেরই রয়েছে কমপক্ষে ১৩০ কোটির বেশি মানুষ। আধুনিক সব যুদ্ধের মতো, ভারত ও চীনের মধ্যে যদি যুদ্ধ শুরু হয় তাহলে সেই যুদ্ধ সর্বোত উপায়ে হবে। এক্ষেত্রে স্থল, সমুদ্র এবং আকাশপথে লড়াই হবে। তবে ভৌগোলিক অর্থাৎ ভূপ্রকৃতির গঠনের কারণে স্থলপথের যুদ্ধ হবে সীমিত। মূল যুদ্ধ হবে আকাশপথে। এক্ষেত্রে দুই দেশই যুদ্ধবিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। এমনটা হলে তা দু’দেশের জন্যই হবে ভয়াবহ ক্ষতিকর। এক্ষেত্রে ভারতের জন্য সমুদ্রপথে লড়াই হতে পারে একটি ট্রাম্পকার্ড। কারণ, সমুদ্র অঞ্চলে ভারতের রয়েছে একক আধিপত্য বিস্তারকারী অবস্থান। এ পথে যুদ্ধ করতে গেলে চীনের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

যদি ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ হয়, তাহলে তা ১৯৬২ সালের মতো হবে না। এবার যুদ্ধ হলে উভয় পক্ষই আকাশ পথে বড় অপারেশনে যেতে পারে। দুই দেশের কাছেই কৌশলগত এমন শক্তি রয়েছে বিমানবাহিনীতে, যা এ এলাকায় উড়ে গিয়ে মিশন সম্পন্ন করে নিজের দেশে ফেরত আসার সক্ষমতা রাখে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্সের যেসব ইউনিট অবস্থান করছে ল্যানঝৌ মিলিটারি রিজিয়নে, তা উড়ে যেতে পারে পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখন্ডে। সম্প্রসারিত চেংদু মিলিটারি অঞ্চল থেকে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে হামলা চালাতে পারে। ল্যানঝৌতে আছে চীনের জে-১১ এবং জে-১১বি যুদ্ধবিমান। আছে কৌশলগত এইট-৬ বোমারুর দুটি রেজিমেন্ট। এ ছাড়া আছে জে-৭ এবং জে-৮ যুদ্ধবিমান। সামনের দিকে সিনজিয়াংয়ে কোনো বেজ বা ঘাঁটি না থাকার ফলে ল্যানঝৌ মিলিটারি রিজিয়ন থেকে শুধু ভারতের উত্তরাঞ্চলে সীমিত বিমান হামলায় সহায়তা করতে পারে। চেংদু মিলিটারি রিজিয়ন হলো আরো আধুনিকায়িত জে-১১ এবং জে-১০ যুদ্ধবিমানের ঘাঁটি। কিন্তু ভারতের কাছে তিব্বতে তেমন কোনো সামরিক ও আকাশপথে যুদ্ধ করার মতো বেজ বা ঘাঁটি নেই। তা সত্ত্বেও ভারতে বড় মাত্রায় ক্ষতি করতে কৌশলগত যুদ্ধবিমান থাকার প্রয়োজনীয়তা নেই চীনের। এক্ষেত্রে পিপলস লিবারেশন আর্মি রকেট ফোর্সেস (পিএলএআরএফ) থেকে ব্যাপক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে চীনের আকাশপথের হামলায় সহায়ক হতে পারে। দেশের বাইরে পারমাণবিক, প্রচলিত এবং ব্যাপক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের তদারকি করে পিএলএআরএফ। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ লাগলে তারা ডিএফ-১১, ডিএফ-১৫ এবং ডিএফ-২১ এর মতো স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার কমপক্ষে দুই হাজার ব্যাপক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করতে পারে ভারত সীমান্তের কাছে। ভূমিতে ভারতের কৌশলগত টার্গেটকে জ্বালিয়ে দিতে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে চীন। এসব ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণে কি পরিমাণ খরচ হয়েছে তা জানা যায়নি।

অন্যদিকে চীনকে মোকাবিলায় আকাশপথের যুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার জন্য চীনের চেয়ে ভাল অবস্থানে আছে ভারতের বিমান বাহিনী। চীন তার ফ্রন্টিয়ার সেনাদের দূরত্ব বজায় রেখে মোতায়েন করে। তিব্বত থেকে মাত্র ২১৩ মাইল দূরে অবস্থান নয়া দিল্লির। ভারতের বিমান বাহিনীর হাতে আছে ২৩০টি সু-৩০এমকে১ ফ্লাঙ্কারস, ৬৯টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান। এ ছাড়া তাদের হাতে আছে আরো অত্যাধুনিক অস্ত্র। ফলে চীনের চেয়ে ভাল অবস্থানে আছে ভারত। দুই ফ্রন্টের যুদ্ধ মোকাবিলার জন্য সক্ষমতা রয়েছে ভারতের। একটি ফ্রন্টে রয়েছে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী। অন্যদিকে চীন। এ ছাড়া বিমানবাহিনীর ঘাঁটি ও উচ্চ মূল্যবান বিভিন্ন টার্গেট সুরক্ষিত রাখতে ভারত এসব স্থানে মোতায়েন করছে আকাশ-মধ্যম পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। তবে চীনের ব্যাপক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের যে বাড়বাড়ন্ত আছে, ভারত তা থামিয়ে দিতে পারবে না। সিনজিয়াং এবং তিব্বতের ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট থেকে ভারতের উত্তরাঞ্চলের অর্ধেক এলাকায় টার্গেট করতে পারে চীন। কারণ, ভারতের হাতে ব্যাপক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস করে দিতে আকাশ ও স্থলভাগের সম্পদের ক্ষতি থামানোর মতো কোনো ব্যবস্থা নেই ভারতের হাতে। ভারতের যেসব ব্যাপক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র আছে তা পারমাণবিক মিশনের প্রতি উৎসর্গিত। প্রচলিত কোনো যুদ্ধে এটি ব্যবহার করা হবে না।

দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে স্থলভাগে যদি যুদ্ধ হয় তাহলে তা হবে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেয়ার পর্যায়ের। সমরাস্ত্র এবং সেনাদের পাহাড়ি পথ ও উপত্যকার মধ্য দিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়া খুব সহজ হবে না। ভারতে সেনা সদস্যের সংখ্যা ১২ লাখ। চীনের ২২ লাখ। যদি দুই দেশের বিশাল আকারের এই সেনাবাহিনীর মধ্যেই যুদ্ধ সীমিত থাকে তাহলে লাভ-ক্ষতি খুব একটা হবে না। তবে জলপথে যুদ্ধ হলে দু’দেশই অবস্থান কোনদিকে নিয়ে যাবে তা বলা কঠিন। কারণ, ভারত মহাসাগরের পাড়ে চমৎকার এক অবস্থানে ভারত। এক্ষেত্রে চীনের কাঁধে ধমনীর ওপর বসে আছে ভারত। ভারতীয় নৌবাহিনীতে আছে সাবমেরিন, যুদ্ধজাহাজ বহনকারী আইএনএস বিক্রমাদিত্য। এই পথে উত্তেজনা দেখা দিলে চীন, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন অবরোধ কাটিয়ে উঠার জন্য প্রস্তুতি নেয়া অথবা অভিযান পরিচালনা করতে চীনের নৌবাহিনীর জন্য বেশ কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যাবে। তা সত্ত্বেও ভারত মহাসাগরে দেয়া অবরোধ বা প্রতিবন্ধকতা কাটানো খুব কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ, ভারত মহাসাগর চীন থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে। এজন্য চীন থেকে যে বাণিজ্য হয় তা ঠিক রাখতে তাদের জাহাজগুলোকে পশ্চিম প্যাসিফিক সাগরের দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য হবে চীন। কিন্তু প্যাসিফিক মহাসাগরের দিকে চীন যদি তার জাহাজকে ঠেলে দিতে বাধ্য হয় তাতে অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং আমেরিকার বাণিজ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এক্ষেত্রে তারাও একশনে যেতে পারে। চীনে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল প্রয়োজন তার শতকরা ৮৭ ভাগই আমদানি করা হয় বিদেশ থেকে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে। এ কারণে চীনের জ্বালানি মজুদ বা সংগ্রহে টান ধরতে পারে। অনেক দিন ধরে তাদের জ্বালানি স্কংট দেখা দিতে পারে। ফলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যুদ্ধের ইতি টানতে চাইতে পারে চীন।

তারপরও ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ হতে পারে সবচেয়ে খারাপ, নৃশংস এবং স্বল্পমেয়াদী। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতির ভয়াবহ এক ক্ষতি হতে পারে। ক্ষমতার ভারসাম্য এবং ভৌগোলিক বিষয়াদির প্রেক্ষিতে এ কথা বলা যায়, দুই দেশ ঠুনকো কারণে যুদ্ধে জড়াবে না। তারা এটা বুঝতে পেরেছে। এ জন্যই ৫০ বছরের বেশি সময় তারা যুদ্ধে জড়ায় নি।