আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

বাংলাদেশ: জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের শক্তিশালী সমর্থক

EDITOR’S CHOICE-ENG-19-10-2020-2

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শুরু থেকেই এটার জোরালো সমর্থক ছিল বাংলাদেশ। স্বাধীনতার সময় থেকে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সবার সাথে বন্ধুত্বের নীতির ভিত্তিতে জোটনিরপেক্ষতার নীতিকে গ্রহণ করে নিয়েছে। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ন্যামের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন এবং সেই ১৯৭৩ সালেই আলজেরিয়ার সম্মেলনে বাংলাদেশ ন্যামের সদস্য হয়েছিল। চলতি বছর আমরা যখন এই মহান নেতার জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন করছিলাম তখন বানদুংয়ের নীতিমালার প্রতি বাংলাদেশ আবারও তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে এবং ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের জাতির পিতা তার প্রথম বক্তৃতায় যে কথাটি বলেছিলেন, সেটার পুনরাবৃত্তি করছে: “মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য শান্তি একটি অত্যাবশ্যক বিষয়। সারা বিশ্বেই পুরুষ ও নারীদের গভীর আকাঙ্ক্ষার বহিপ্রকাশ এটা”।

২০২০ সালে, বানদুং প্রিন্সিপ্যালসের ৬৫তম বার্ষিকী উদযাপন করছে ন্যাম। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতে, ন্যামের সদস্যদেরকে অবশ্যই এই আন্দোলনের এ যাবতকালের অর্জনের উপর পর্যালোচনা করতে হবে এবং আসন্ন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির প্রেক্ষিতে কিভাবে এই আন্দোলনকে আরও কার্যকর ও প্রাসঙ্গিক করে তোলা যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে। 

কোভিড-১৯ মহামারি এ শতাব্দির সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সঙ্কট এবং ন্যামের সকল সদস্য দেশের উপর এটা দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়কর আর্থ-সামাজিক প্রভাব ফেলেছে। ন্যামের যেই মৌলিক নীতি, সেটা মূলত বিশ্বের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষারই বহিপ্রকাশ – সেটা হলো ক্ষুধা আর রোগ থেকে মুক্ত থাকা, সম্মানজনক কর্মসংস্থান এবং গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা। তবে, কোভিড-১৯ মহামারি এই আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণের পথে বিশাল বাধা তৈরি করেছে। যেহেতু ন্যামের সদস্য দেশগুলোর সবার অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতির মাত্রা এক রকম নয়, সে কারণে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সবার জন্য একই কৌশল কার্যকর হবে না। 

অন্যদিকে, কোভিড-১৯ মহামারির ব্যাপ্তি একইসাথে বহুপাক্ষিক সহযোগিতার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ন্যামের সদস্য দেশগুলো তাই তাদের সবচেয়ে ভালো চর্চা, অভিজ্ঞতা, সঙ্কট-ব্যবস্থাপনা প্রটোকল, গবেষণা, এবং সম্পদকে একত্র করে সেগুলো সদস্য দেশগুলোর সাথে বিনিময় করতে পারে। আমরা যখন সমতার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য খরচে কোভিড-১৯ এর ওষুধ এবং ভ্যাকসিন পাওয়ার চেষ্টা করছি, সেই পরিস্থিতিতে আমাদের মধ্যে সংহতি আর সহযোগিতার বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ন্যামের অভিন্ন মূল্যবোধ এবং নীতি এবং সংহতির মনোভাবকে এখানে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগানো উচিত। 

কোভিড-১৯ আমাদের অন্যান্য কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রতিশ্রুতির উপরও হুমকি তৈরি করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র বিমোচন, জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবেলা, খরা, মরুকরণ মোকাবেলা, সহিংসতা ও সঙ্ঘাত দমন। তাছাড়া, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১.১ মিলিয়ন ঘরবাড়িহীন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়েও আমরা সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আছি। এই সমস্যাগুলো মোকাবেলার জন্য ন্যামের সব সদস্য দেশের সমর্থন প্রয়োজন। 

এটা উল্লেখ্য যে মহামারির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সদস্য দেশগুলোতে সহায়তার জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে ন্যাম। চলতি বছরের ৪ মে অনুষ্ঠিত ন্যাম সম্মেলনের পর, একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়। টাস্ক ফোর্স অন্যান্য কাজের সাথে সাথে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় ন্যামের সদস্য দেশগুলোর চাহিদাগুলো নিয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরি করছে। টাস্ক ফোর্সের একজন সদস্য হিসেবে, বাংলাদেশ এখানে অবদান রাখছে, এবং নিজেদের দায়িত্ব পালন করছে। 

বানদুংয়ের পর সাড়ে ছয় দশকের মধ্যে পৃথিবী অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। আজ আমরা যখন মহামারির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছি, এবং আমাদের উন্নয়নের অর্জনকে ঠিক রাখার চেষ্টা করছি, তখন আমাদেরকে অবশ্যই এটা বুঝতে হবে যে, আমাদের সম্মিলিত পরিণতি এখন আগের চেয়েও বেশি এক হয়ে গেছে। সংস্থার নীতি, আদর্শ, উদ্দেশ্য, বিশেষ করে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ, ন্যায়সঙ্গত ও সমতাভিত্তিক বিশ্ব গড়ার ব্যাপারে সংস্থার প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি আরও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করার এখনই সময়। নজিরবিহীন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সময়ে ন্যামের মূল্যবোধের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে বাংলাদেশ। 

 

(ড. এ কে আব্দুল মোমেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ন্যাম কোঅর্ডিনেটিং ব্যুরোর মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে দেয়া তার বক্তৃতার উপর ভিত্তি করে এই নিবন্ধটি তৈরি করা হয়েছে। চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ চলাকালে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।)