আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

চীন-ইরান চুক্তি: যুক্তরাষ্ট্র কোণঠাসা হওয়ার ইঙ্গিত

EDITOR’S CHOICE-ENG-13-07-2020-2
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি

ইরান ও চীন সাম্প্রতিককালে একটা গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তির বিস্তারিত তৈরির জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই চুক্তির মেয়াদ হবে প্রায় সিকি শতাব্দি পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্টতা থেকে ভবিষ্যতে বেরিয়ে আসার জন্য সেখানে পরিকল্পনা থাকছে। 

এশিয়া টাইমস এই চুক্তির একটি খসড়া হাতে পেয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, বেইজিংয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষী রোড অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভের অধীনে চীন ইরানে বহু বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। ২৫ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মধ্যে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, এবং সামরিক বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

এই র চুক্তি ইরানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের পুরনো তেল শিল্পকে সচল রাখার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার। তেল কূপগুলোর আধুনিকায়ন, শোধনাগার এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ইরানের ১৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন। 

চুক্তি নিয়ে দর কষাকষি চলছে। যদিও ডোনাল ট্রাম্প প্রশাসন একতরফা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে আরও চেপে ধরার আশা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও আরও বাড়ছে। 

ইরানের পার্লামেন্টে চুক্তির বিষয়টি অনুমোদিত হলে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের চেষ্টা সত্বেও আন্তর্জাতিক কমিউনিটিতে জায়গা তৈরি করে নিতে পারবে তেহরান। তবে, যেমনটা অনুমান করা যায়, সে অনুসারেই চীন-ইরান চুক্তিটি নিয়ে পশ্চিমারা নিন্দা করা শুরু করেছে। 

ইরানের সরকারের বিরোধী নির্বাসিত কিছু ব্যক্তি এই পরিকল্পনাকে চীনের কাছে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে বিক্রি করে দেয়ার সাথে তুলনা করেছেন। ইরানকে নিজস্ব একটা ‘স্যাটেলাইট স্টেটে’ পরিণত করার ব্যাপারে চীনের সক্ষমতা হিসেবেও এটাকে দেখছেন তারা। সমালোচকরা ভুলভাবে দাবি করেছে যে, এই চুক্তির ধারাগুলো একপক্ষীয় এবং এর মাধ্যমে ইরানের পারস্য উপসাগরীয় দ্বীপগুলোর উপর চীনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। 

চুক্তির ফাঁস হওয়া খসড়ার অংশটুকু প্রকাশ করা হয়েছে চুক্তিটাকে অবজ্ঞা করার জন্য। ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত এই অংশে এমন শর্ত অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করা হয়েছে, যেখানে চীনের সুবিধার বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইরান। 

চীন যদি ইরানে এ র বিশাল দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হাতে নেয়, তাহলে খুবই সম্ভাবনা রয়েছে যে, কৌশলগত চাবাহার বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেবে চীন। এই বন্দরটি ভারত মহাসাগরের মধ্যে ইরানের প্রবেশমুখ। 

ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্র যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, এই বন্দরটি সেই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে। এই বন্দরের সাথে ভারতের সংশ্লিষ্টতা থাকায় এই সুবিধা দেয়া হয়েছে বন্দরটিকে। তেহরানের মতে, নয়াদিল্লি তেল নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নিয়ে এই সুবিধাটাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বন্দরে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। 

ইরান-চীন নতুন চুক্তি বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দুই দেশের পরিবর্তনশীল কৌশলগত হিসাব-নিকাশের ইঙ্গিত দিয়েছে। কারণ তেহরান ও বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা ও আগ্রাসী নীতির কারণে আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি ও নিয়মগুলো ধ্বংস হতে শুরু করেছে। 

ধীরে হলেও নিশ্চিতভাবে চীন, ইরান আর প্রতিবেশী পাকিস্তানের মধ্যে একটা ত্রিমুখী সমন্বয় তৈরি হচ্ছে। এই জোটের মধ্যে আফগানিস্তানও পড়বে এবং সময়ের সাথে সাথে ইরাক ও সিরিয়াও এখানে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন আর নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রতিরোধ তৈরি করবে তারা। 

পাশাপাশি ইরান আর সিরিয়ার মধ্যে একটি সম্পুরক নতুন চুক্তির বিষয়ে প্রশংসা করেছেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশটিতে নিজেদের অবস্থান সংহত রাখার ব্যাপারে ইরানের আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে। আবার একইসাথে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য লেবাননে প্রবেশের দরজা হিসেবেও কাজ করবে সেটা। ইসরাইলি-উপসাগরীয় আরবদের চাপ এবং ইরানের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক হামলা সত্বেও এই চুক্তিটি হয়েছে। 

‘সর্বোচ্চ চাপের’ জবাব ‘সর্বোচ্চ প্রতিরোধ’ দিয়ে জবাব দেয়ার কৌশল হিসেবে ইরান যে কোন আঞ্চলিক ও এর বাইরের চাপের বিরুদ্ধে পাল্টা চাপের কৌশল ব্যবহার করে থাকে। 

তেহরান নিজেদেরকে পশ্চিম এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। নাতানজ পারমাণবিক ফ্যাসিলিটি ও পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সে সাম্প্রতিক হামলার জবাবে সময়মতো তারা প্রতিশোধ নেবে বলে আশা করা যায়। 

চীন-ইরান চুক্তি চূড়ান্ত হলে সেটা হবে দুই দেশেরই জাতীয় স্বার্থের জন্য লাভজনক। 

নিষেধাজ্ঞা এবং মহামারী-আক্রান্ত ইরানে এই চুক্তিটি কঠিন একটা সময়ে অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার একটা সুযোগ তৈরি করে দেবে, বিশেষ করে যে সময়টাতে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে ধ্বংসের জন্য টার্গেট করা হচ্ছে। ইসরাইল এবং কিছু উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রের এখানে সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। 

তেহরান-ভিত্তিক এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “ইরানে এই সব হামলার উদ্দেশ্য এটা হতে পারে যে, এমন একটা ধারণা রয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন নভেম্বরের নির্বাচনের আগে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইরানের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে চায়”।

অন্যদিকে, এই বিষয়টি ট্রাম্পের প্রকৃত ইরান কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘ সিকিউরিটি কাউন্সিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরান প্রশ্নে বিব্রত হয়েছে এবং ইরানের উপর অনির্দিষ্টকালের জন্য অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য তাদের প্রস্তাবটি সেখানে নাকচ হয়ে গেছে। 

তাছাড়া, জাতিসংঘের একজন বিশেষজ্ঞ জানুয়ারি মাসে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলায়মানি এবং অন্যান্য ইরানি ও ইরাকি কর্মকর্তাদের হত্যার বিষয়টিকে বেআইনি এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী ড্রোন হামলায় ইরাকের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের শত্রুতার এখন প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে। ফলে যে কোন ইরানি কর্মকর্তার পক্ষে এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে কূটনৈতিক লেনদেন করাটা কার্যত অসম্ভব হয়ে গেছে।