আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

দায়মুক্তি, নাম তার উত্তর প্রদেশ

editors-choice-eng-12-10-2020

নয়াদিল্লীর সফদারজং হাসপাতালে গত ২৯ সেপ্টেম্বর একটি বালিকা মারা গেছে। ২২ সেপ্টেম্বর ম্যাজেস্ট্রেটের কাছে দেয়া এক বিবৃতিতে মেয়েটি জানায়, তাকে ১৪ সেপ্টেম্বর আক্রমণ ও ধর্ষণ করা হয়েছে। তিনি উত্তর প্রদেশের হাথরাস জেলায় তার গ্রামের চার ব্যক্তির নাম বলেন। তার মৃত্যু হলে পুলিশ তড়িঘড়ি করে তার লাশ ওই গ্রামে নিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর রাত আড়াইটায় পুড়িয়ে ফেলে।

মেয়েটি গরিব দলিত পরিবারের। আটক ওই চার ব্যক্তির স্বজনরা পরিবারটিকে নিচ্চি কওম (নিম্ন বর্ণ) হিসেবে অভিহিত করেন। ভারতে এ ধরনের হাথরাস গ্রাম আছে হাজার হাজারে। এসব গ্রামে কিছু দলিত পরিবার আছে। দলিতদের সাধারণত জমি থাকে না, থাকলেও তা সামান্য। তারা সাধারণত আলাদা এলাকায় থাকে, তাদের মর্যাদা নিম্ন, মজুরি কম, অন্যান্য প্রভাবশালী বর্ণগত গ্রুপের ওপর নির্ভর করে থাকে। এই মেয়ের বাবা দুটি ষাঁড় ও দুই বিঘা জমির মালিক। তিনি পাশের স্কুলে খণ্ডকালীন মেথরের কাজ করেন।

মহাত্মা ফুলে, পেরিয়ার ই ভি রামস্বামী, বাবাসাহিব আম্বেদকর প্রমখু মহান সমাজ সংস্কারকদের ভাবধারায় সাহসী হয়ে দলিতরা কয়েকটি রাজ্যে নিজেদের রাজনৈতিকভাব সংগঠিত করেছে। তবে তাদের মর্যাদা বেড়েছে সামান্যই।

অব্যাহত অপরাধ

ভারতে ব্যাপকভাবে বিরাজমান অপরাধ হলো ধর্ষণ। এনসিআরবির তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালে নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ (পিওসিওসও মামলা ছাড়াই) হয়েছে ৩২,০৩৩টি। এর মধ্যে ৩,০৬৫টি হয়েছে উত্তর প্রদেশে। ধর্ষণের অনেক মামলা অপরাধ হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে, তদন্তের চেষ্টা করা হয়েছে। দোষী সাব্যস্তের হার প্রায় ২৮ ভাগ। এদের কয়েকজন অভিযুক্ত হয়। তবে অপরাধের কিছু দিনের মধ্যেই গুঞ্জন থেমে যায়। অনেক ঘটনা ‌পরিণত হয় ‌‘ইভেন্টে’। হাথরাস তেমনটি হওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

সবাইকে আক্রান্ত করেছে মহামারি

হাথরাস ঘটনাটি এমন এক উদাহরণ যেখানে চান্দপা থানার এসএইচও থেকে শুরু করে পুলিশের জেলা সুপারিন্ডেন্ট, জওহেরলাল নেহরু মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রিন্সিপাল, জেলা মেজিস্ট্যাট (ডিএম), আইন-শৃঙ্খলায় নিয়োজিত পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সবাই মনে হয় দায়মুক্তি নামের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। মনে হচ্ছে উত্তর প্রদেশের সব কর্মকর্তাই মহামারির শিকার হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কথা ও তাদের নেয়া পদক্ষেপগুলোর কথা বিবেচনা করুন:

  • এসএইচও ভিক্টিমের অবস্থা দেখেছেন, তার মা ও ভাইয়ের কথা শুনেছেন, হামলা ও খুনের চেষ্টার মামলা করেছেন, ভিক্টিমকে আলিগড় হাসপাতালে রেফার্ড করেছেন। কিন্তু মেডিক্যাল পরীক্ষার কথা বলেননি। এমনকি যৌন হামলার কথা বিবেচনায় পর্যন্ত আনেননি।
  • এসপি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বাধ্যতামূলক মেডিক্যাল পরীক্ষা পরিচালনা করতে ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
  • জওহেরলাল নেহরু মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল স্বীকার করেছেন যে হাসপাতাল ফরেনসিক পরীক্ষা করেনি, কারণ মেয়েটি ও তার মা যৌন নির্যাতন নিয়ে কোনো কথা বলেননি।
  • জেলা মেজিস্ট্র্যাট (কালেক্টর) ও এসপি মেয়েটির পরিবারের সম্মতি ছাড়াই রাতের বেলায় লাশটি পুড়িয়ে ফেলা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এসপি এই কাজের ব্যাখ্যা হিসেবে বলেছেন, ওই এলাকায় রাতের বেলায় লাশ পোড়ানো অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এটা যে হিন্দু পন্থা নয়, সে সম্পর্কে কিছু বলা হলো না।
  • ডিএমকে একটি ভিডিওতে ওই পরিবারকে বলতে শোনা যায়, মিডিয়া দুই-এক দিনের মধ্যে চলে যাবে। কিন্তু আমরাই থাকব এখানে। ভিক্টিমের ভাই বলেন, ডিএম তাদেরকে বলেছেন যে মেয়েটি যদি করোনাভাইরাসে মারা যায়, তবে তারা ক্ষতিপূরণ পাবে। 
  • এডিজিপি (ল অ্যান্ড অর্ডার) জোর দিয়ে বলেছেন, ভিক্টিম ধর্ষণের শিকার হননি কারণ, ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বীর্যের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি, ভ্যাজিনায় কোনো আঘাত দেখা যায়নি। 
  • উত্তর প্রদেশের কর্মকর্তারা গ্রামটি লকডাউন করেন। তারা হাথরাসগামী রাস্তাগুলোতে ১৪৪ ধারা জারি করেন, মিডিয়া ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের সেখানে যাওয়া নিষিদ্ধ করেন।

অবিচার কেন হচ্ছে?

উত্তর প্রদেশের প্রশাসন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। ফলে ধরে নেয়া যায়, ওপরে বর্ণিত প্রতিটি কাজ তার গোচরের মধ্যেই ঘটেছে।

হামলাটি হয়েছে ১৪ সেপ্টেম্বর। আর মুখ্যমন্ত্রী প্রথম বিবৃতিটি দিয়েছেন ৩০ সেপ্টেম্বর। আর এর মধ্যে প্রধান খেলোয়াড়রা কিছুই ঘটেনি বলে সাফাই গাওয়া অব্যাহত রেখেছিলেন।

প্রতিটি অবিচারের কারণ হলো সিস্টেমের মধ্যে থাকা দায়মুক্তির অনুভূতি: আমার শক্তি আমার তরবারি; আমার আমার বুক পকেটে থাকা প্রতীকগুলো (আইএএস, আইপিএস, ড.) আমার ঢাল; আমার বর্ণগত গ্রুপ আমার পক্ষে দাঁড়াবে; আমার সরকার ও ক্ষমতাসীন দল আমার বিচ্যুতি বা দুষ্কর্মে সহযোগিতা স্বীকার করবে না, ইত্যাদি, ইত্যাদি। সরকারি যন্ত্র যতক্ষণ না সরকারের আদেশ প্রত্যাখ্যান না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সরকার দায়মুক্তির অনুভূতি লালন করবে।

এখন বুঝতে পারছেন কেন অবিচার বিরাজ করছে: ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে জয় ঘোষণা করছে দায়মুক্তি।