আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

চীনা-নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা কি অনিবার্য?

EDITORÆS CHOICE-ENG-29-05-2020

যেকোনো নিউজ ওয়েবসাইট বা পত্রিকা খুললেই কোভিড-১৯ অতিমারি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিবাদের খবর শুরুতেই দেখা যাবে। কিন্তু এসব শিরোনামের আড়ালে আরেকটি দ্বন্দ্ব চলছে এবং তা আরো ভয়াবহ হতে পারে। তা হলো বিশ্বব্যবস্থার বিরোধিতার জন্য যুদ্ধ।

গত সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক সম্মেলনে এই লড়াইটি পূর্ণ মাত্রায় প্রদর্শিত হয়। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় আগামী দুই বছরে দুই বিলিয়ন ডলার প্রদান করার চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতিশ্রুতি প্রদান করার দিনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিক বিপরীত কাজটি করার হুমকি দেন। টুইটারে পোস্ট করা এক চিঠিতে ট্রাম্প বলেন, বড় ধরনের সংস্কার না হলে আমেরিকান তহবিল, এমনকি সদস্যপদও থাকবে না।

এক দিক থেকে হু মঞ্চে যে বাগাড়ম্বড়তা ও অর্থ বন্ধের যেসব হুমকি দেয়া হচ্ছে, তার মূল নিহিত রয়েছে প্রতিটি দেশের ঘরোয়া রাজনীতিতে। কোভিড-১৯ মৃত্যু হার ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচন ক্যাম্পেইনে কালো ছায়া বিস্তার করে আছে। আর সঙ্কট মোকাবিলায় শি শুরুতে যথার্থ ছিলেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। উভয় নেতাই নিজ দেশে সমর্থন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

আরেক দিক থেকে হু-এ দুই নেতা যে দড়ি টানাটানি করছেন, তা আসলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে তাদের বিপরীতমুখি মনোভাবই ফুটিয়ে তুলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সাত দশকের বেশি সময় ধরে ন্যাটো থেকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ বিশ্ব নেতৃত্বের বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে নেতৃত্বে ছিল মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য। করোনাভাইরাস সঙ্কটে ব্যর্থ প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করেছে যে এই যুগের অবসান হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এর স্থলাভিষিক্ত হবে কে?

সবচেয়ে সৎ জবাব হলো, এই প্রশ্নের জবাব সত্যিই কেউ জানে না। তবে চীনের মতো করে অন্য কোনো দেশেরই বিশ্বব্যবস্থা নতুন করে গড়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কারো নেই।

বিদ্যমান ব্যবস্থা সম্পর্কে চীনা এলিটদের প্রধান অভিযোগ হলো এই যে মার্কিন নির্দেশনায় উদারবাদ ও মৌলিক মানবাধিকারের মতো নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধ তৈরী হয়েছে। কিন্তু এসব মূল্যবোধ এক দলীয় শাসনের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করায় বৈশ্বিক পরাশক্তির মৌলিক দায়দায়িত্ব প্রশ্নে চীন সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।

ইউএস ন্যাশনাল ব্যুরো অব এশিয়ান রিসার্চের সিনিয়র ফেলো নাদেগে রোল্যান্ড মার্চে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেন, পাশ্চাত্য বিশ্বাস করে যে উদার গণতন্ত্রের বিকাশের ফলে বৈশ্বিক শান্তি ও সমৃদ্ধি আসতে পারে। কিন্তু চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বিশ্বজুড়ে সঙ্ঘাত ও বিঘ্নতার জন্য তথাকথিত সার্বজনীন মূল্যবোধের বৈশ্বিক প্রচারণাকেই দায়ী করছে।

চীন একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে চাচ্ছে যা রোল্যান্ডের ভাষায় ‌আদর্শবিরোধী। এই ব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ তার নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মডেল গ্রহণ করে বিশ্বের সাথে একাত্ম হতে পারবে।

এই ভিশনের কেন্দ্রে রয়েছে আন্তঃকানেকটিভিটির চীন-কেন্দ্রীক বিশ্ব। আর এতে বেইজিংয়ের রীতিনীতিই হবে সম্পৃক্ততার ভিত্তি। ওয়াশিংটনের দর্শনে তার অংশীদারিত্বের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক শর্ত প্রযোজ্য। কিন্তু বেইজিং বলছে, চীনের কর্তৃত্বকে শ্রদ্ধা করো এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করো।

শি প্রথম চীনা নেতা হিসেবে এ ধরনের বিশ্বব্যবস্থার সুপারিশ করছেন, এমন নয়। আসলে কয়েক শ’ বছর ধরে এ ধরনের নীতির ভিত্তিতেই চীনা সাম্রাজ্যিক শক্তি গড়ে ওঠেছে। তবে শি যা করেছেন তা হলো এই যে তিনি ব্যবস্থাটিকে প্রয়োগ করতে চাচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) কথা বলা যায়। এর লক্ষ হলো বাণিজ্য, অবকাঠামো, জনগণ পর্যায়ের কানেকটিভিটিরর মাধ্যমে চীনকে আফ্রিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরের এলাকার সাথে যুক্ত করা।

বিআরআই ছাড়াও প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজও করছে চীন। এগুলো উদারব্যবস্থাকে হুমকিগ্রস্ত করতে পারে। চীন এই কাজটি করছে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে সংস্কার করে এবং সেইসাথে তার প্রভাব বিস্তার শুরু করার জন্য প্রতিযোগী কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে।

উদাহরণ হিসেবে ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের পুঁজি বাড়িয়ে চীনের ভোটের অধিকার জোরদারের কথা বলা যায়। এতে করে চীন পরিণত হয় তৃতীয় সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য রাষ্ট্র। সেইসাথে চীন তার প্রভাব বাড়ানোর জন্য নিজস্ব উন্নয়ন বাহন নির্মাণ করছে। এসবের মধ্যে রয়েছে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের জন্য ১৭+১ প্লাটফর্ম। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিটির জন্য চীন এজেন্ডা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

অনেকে মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশ্ব নেতৃত্ব ত্যাগ করছে, তখন এর ঠিক বিপরীত কাজটি করছে চীন ।

তবে উদার মূল্যবোধ ও রীতিনীতির সমর্থকরা মৌলিক মানবাধিকার দলনে চীনের অবস্থানের নিন্দা করে। তাদের দৃষ্টিতে বেইজিংয়ের ভিশন কঠোর এবং এমনকি ভীতিজাগানিয়া।

ওয়াশিংটনে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চীনা বিশেষজ্ঞ জুডে ভ্লানচেত্তে বলেন, বেইজিং ক্রমবর্ধমান হারে উচ্চাভিলাষী হয়ে ওঠছে। আর এটিই পাশ্চাত্যকে উদ্বিগ্ন করছে। তবে এর মানে এই নয় যে চীন বিশ্বের নেতৃত্ব হাতে নিতে চায়। তবে আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে তারা বিশ্বে তাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা চায়। আর এই চিত্রটি যখন দেখি, তখন আমি নার্ভাস হয়ে পড়ি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই পাণ্ডুলিপি নতুন করে লেখার বিকল্প খুবই সীমিত। কারণ চীনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য ট্রাম্পের স্পষ্ট কোনো কৌশল নেই। 

স্নায়ু যুদ্ধের মতো অবস্থা এখন নেই। ওই সময় বিশ্ব দুটি শিবিরে বিভক্ত ছিল। এখনকার বিশ্ব নানা আইন ও রীতিনীতিতে পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। ফলে উদারবাদ ও মানবাধিকারকে মৌলিক নীতিমালা হিসেবে গ্রহণকারী দেশগুলোকে অবশ্যই চীনা ভাষ্য মোকাবিলা করার জন্য তাদের নীতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দক্ষতার সাথে বিন্যস্ত করতে হবে।

তা করতে ব্যর্থ হয়ে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প কথার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তা হয়ে পড়ছে অর্থহীন। অথচ চীন মনে করছে, তারা যে আদর্শগত লড়াইয়ে নেমেছে, তাতে তারা জয়ী হবে।