আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২০

কাশ্মীরে নির্দয় পদক্ষেপে মোদির কৌশল ও ভ্রান্তি ফাঁস

editors-choice-eng-06-08-2020-2

২০১৯ সালের ৪ আগস্ট, মধ্যরাত। কাশ্মীরে বন্ধ করে দেয়া হয় ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ। পরের দিন ৫ আগস্ট কঠোর সামরিক কারফিউ জারি করে ৭০ লাখ মানুষকে গৃহবন্দী এবং অন্তত ১০ হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়। আগস্টের ৬ তারিখে জম্মু ও কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন এবং ভারতের সংবিধানে প্রদত্ত বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়ে সংসদে একটি বিল পাস করা হয়। লাদাখ এবং জম্মু ও কাশ্মীরকে দুইটি কেন্দ্রশাসিত ভূখণ্ডে রূপ দেয়া হয়। এতে লাদাখের আইনসভা থাকবে না এবং সরাসরি নয়াদিল্লীর মাধ্যমে শাসিত হবে।

আমাদের বলা হয়, অবশেষে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হলো। অন্য কথায়, আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য কাশ্মীরের কয়েক দশকের সংগ্রামের অবসান হলো, যে সংগ্রামে প্রাণ হারিয়েছেন হাজার হাজার সৈন্য, যোদ্ধা এবং বেসামরিক নাগরিক।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে বলেছিলেন, জীবন বাজি রেখে হলেও তিনি পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর, যেটাকে জনগণ আজাদ কাশ্মীর বলে থাকে, সেই ভূখণ্ড আবারও নিজেদের করে নিতে প্রস্তুত আছেন। এদিকে ভারতের আবহাওয়া অফিস তো তাদের আবহাওয়া রিপোর্টে গিলগিট-বালতিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেছে। চীন সরকার যখন সীমান্ত বিষয়ে কথাবার্তা ও কাজে সাবধানী হওয়ার আহ্বান জানায় ভারতকে, তখন আমাদের খুব কম লোকই এ ব্যাপারটিতে মনোযোগ দিয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষে গত এক বছরে কাশ্মীরের সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। মিডিয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক মাসেই ৩৪ সৈন্য, ১৫৪ যোদ্ধা এবং ১৭ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে ভারত সরকার কী করেছে, সেদিকে করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত বিশ্বের নজর পড়েনি। মাসের পর মাস ধরে সেখানে কারফিউ ছিল, বন্ধ ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থা। মানুষ চিকিৎসকের কাছে, হাসপাতালে, কাজে যেতে পারেনি। বন্ধ ছিল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্কুল। যোগাযোগ করতে পারেনি প্রিয়জনের সঙ্গে। কাশ্মীরীদের সঙ্গে ভারত যা করেছে, ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও তা করেনি।
সামরিক কারফিউ ছাড়া অথবা যোগাযোগ ব্যবস্থা ঠিক রেখে মাত্র কয়েক মাসের লকডাউন সারাবিশ্বকে অসহায় করে দিয়েছে এবং অধৈর্য-অস্থির করে তুলেছে কোটি কোটি মানুষকে। তাহলে একবার ভাবুন কাশ্মীরের কথা, যেখানে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সেনা সদস্যের উপস্থিতি রয়েছে। ভাবুন, করোনাভাইরাস ভোগান্তির মধ্যেই আপনার রাস্তায় কাঁটাতারের বেড়া, সৈন্যরা আপনার বাড়িতে জোর করে ঢুকছে, পুরুষদের মারধর করছে আর নারীদের শ্লীলতাহানি করছে, ঘরের খাবার ধ্বংস করছে।

এর সঙ্গে যোগ হলো বিচারিক ব্যবস্থা। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সারাবছরই কাশ্মীরে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার আদেশ দেন। পরিবারের সদস্যদের হদিস চাওয়া মানুষগুলোর ৬০০ আবেদন বরাবরই উপেক্ষা করা হয়েছে। তারপর প্রণয়ন করা হলো নতুন বাসস্থান আইন, তাতে ভারতীয়দের কাশ্মীরে আবাস গড়ার ব্যাপক অধিকার দেয়া হয়। অথচ জন্মভূমিতে বাসস্থান মর্যাদার জন্য কাশ্মীরীদের নাগরিক সনদে ভারত সরকারের অনুমতি থাকতে হবে। কারও আবেদন বাতিল হলে বাতিল হয়ে যেতে পারে তার রেসিডেন্সি বা বসবাসের অধিকারও। কাশ্মীর যেগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে, তা সাংস্কৃতিক নিশ্চিহ্নকরণের চেয়ে কম কিছু নয়।

কাশ্মীরের নতুন বাসস্থান আইনটি মুসলিমবিরোধী নাগরিক সংশোধন আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) মতোই। আসামে লাখ লাখ মানুষকে নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। অন্য অনেক দেশ যখন শরণার্থী সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে, তখন ভারত নিজেদের নাগরিককেই শরণার্থীতে পরিণত করছে।

এই তিনটি আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে বেশ কিছু কাগজপত্র সরকারের কাছে জমা দিয়ে অনুমোদন নিতে হবে। (১৯৩৫ সালে নাজি পার্টি নুরেমবার্গ আইন জারি করে। যেখানে বলা হয়, উত্তরাধিকার সম্পর্কিত কাগজপত্র দিতে পারা লোকজনই কেবল জার্মান নাগরিকত্বের জন্য যোগ্য হবে।)

এসবকে কী বলা উচিত? যুদ্ধাপরাধ? নাকি মানবতাবিরোধী অপরাধ? প্রতিষ্ঠানগুলোর আঁতাত এবং ভারতের রাস্তায় উদযাপনকে কী বলা উচিত? গণতন্ত্র?

২০২০ সনের ১৭ জুন চীনা সেনাদের হাতে ভারতের ২০ সৈন্য নিহত হওয়ার খবর জানা যায়। ঘটনাটি ঘটে লাদাখ সীমান্তের গালওয়ান উপত্যকায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, চীনা সৈন্যরা সেখানে অনেকবার প্রবেশের চেষ্টা করে। ভারতের সেনাবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলেছিলেন, চীনা সেনাবাহিনী নাকি ভারত ভূখণ্ডের শত শত বর্গ কিলোমিটার দখল করে নিয়েছে। ভারতের সংবাদমাধ্যম যেভাবে উপস্থাপন করেছে, এটা কি আসলেই তেমন নগ্ন আগ্রাসন ছিল? নাকি চীন সেসব কিছু রক্ষা করতে গিয়েছিল যাতে তাদের স্বার্থ আছে- আকসাই চীনের উঁচু পর্বতের মধ্য দিয়ে রাস্তা এবং পাকিস্তান দখলকৃত আজাদ কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য রুট উভয়ই হুমকিতে রয়েছে, যদি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যুদ্ধভাবাপন্ন বক্তব্য আমলে নেয়া হয়।

পশ্চিমে ও পূর্বে দুই প্রতিপক্ষ পাকিস্তান ও চীনকে মোকাবিলায় ভারতের এখন দরকার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত সেনাবাহিনী। তাছাড়া ঔদ্ধত্য প্রতিবেশী নেপালও ভারতকের বিরোধিতা করছে। আমেরিকা কি ভারতকে উদ্ধার করতে আসবে আসলেই? যেমনটা সিরিয়া ও ইরাক থেকে কুর্দিদের উদ্ধার করেছে? সোভিয়েত থেকে আফগানদের? অথবা উত্তর ভিয়েতনাম থেকে দক্ষিণ ভিয়েতনামকে?

গতরাতে একজন কাশ্মীরী বন্ধু আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছে: ‘আমাদের না দেখেই কি ভারত, পাকিস্তান ও চীন আমাদের আকাশে যুদ্ধ করবে?’ এটা অসম্ভব ব্যাপার নয়। এই দেশগুলোর কোনোটাই অন্যদের থেকে না নৈতিকভাবে উচ্চতর, আর না মানবিকভাবে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ছাড়াই লাদাখ সীমান্তে সেনা মোতায়েন, যুদ্ধক্ষেত্রে সরঞ্জাম মজুত এবং দূর থেকে চীনের অস্ত্র সম্পর্কে জানতে ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট সম্ভবত দ্বিগুণ অথবা তিনগুণ হতে হবে। সেটাও হয়তো যথেষ্ট হবে না। চীনের এই খেলার প্রথম রাউন্ডে মোদি খুব একটা ভালো করছেন না।

কাশ্মীর সমস্যার আসলে সমাধান হয়নি, বরং এটিকে অবরুদ্ধ করা হয়েছে এবং লাদাখ তো এখন প্রায় যুদ্ধক্ষেত্র। তাই মোদি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিরোধপূর্ণ সীমান্ত থেকে সরে নিরাপদস্থানে চলে যাওয়ার। উদ্দেশ্য, আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয়া। আপনি যখন এই লেখা পড়ছেন, মোদি তখন রাম মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছেন, যে মন্দিরটি জেগে উঠবে বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর।

১৯৯২ সালে মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্যদের নেতৃত্বে একদল হিন্দু মসজিদটি ভেঙে দেয়। চলুন, এটাকে বলি ইচ্ছার জয়জয়কার।

দেখা যাক, গত আগস্ট থেকে এখন, এর মধ্যে ৩৬৫ দিন- ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরকে একত্রীকরণ, সিএএ-এনআরসি পাস এবং রাম মন্দিরের উদ্বোধন। এই সময়ের মধ্যে মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা করেছেন। কিন্তু, তার ঘোষণাতে অস্বীকৃত পরাজয় থাকতে পারে। চটকদার শুরুতে অপরিণামদর্শী যবনিকা থাকতে পারে। স্মরণ করতে চাই, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ মোদির বিজেপি, অথচ ভারতের ১৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ তাদের ভোট দিয়েছে।

একটু ভাবুন, মোদি কেন এখন রাম মন্দির উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? এটা তো দীপাবলি উৎসব নয় এবং রামায়ণ অথবা হিন্দু দিনপঞ্জিকায় ওই তারিখের প্রাসঙ্গিকতাও নেই। ভারতের অধিকাংশ অংশে চলছে আংশিক লকডাউন, নির্মিতব্য রাম মন্দিদের অনেক পুরোহিত ও পাহারায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেস। তাহলে এখন কেন? কাশ্মীরের কাটা ঘায়ে নুন দেয়ার জন্য, নাকি ভারতের ঘায়ে মলম দেয়ার জন্য?

টেলিভিশনে যা-ই বলা হোক না কেন, এর কারণ সীমান্তে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তন হচ্ছে বিশ্ব ব্যবস্থার। আপনি প্রভূ না হলে প্রতিবেশীকে পীড়ন করতে পারবেন না, পারবেন না সেখানকার প্রভূর মতো কাজ করতে। এটি চীনা উক্তি নয়, সাধারণ বোধ। যদি ভারত, চীন ও পাকিস্তান কাশ্মীরের আকাশে যুদ্ধ করে, আমরা বাকিরা অন্তত যেটা করতে পারব তা হলো- সেখানকার মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকা।

 

(অরুন্ধতী রায়, ঔপন্যাসিক, লেখক এবং রাজনৈতিককর্মী)