আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

বিশ্ব ব্যবস্থা পাল্টে দেয়ার স্বপ্ন দেখেন পুতিন

EDITOR’S CHOICE-ENG-15-07-2020

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য জটিল ইস্যুগুলোতে মাঝে মাঝে প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে হোয়াইট হাউজকে বার্তা দেয়ার একটা চর্চা আছে মস্কোর। সাধারণত রোববারে এ ধরনের বার্তা দেয়া হয়, যেমনটা দেয়া হলো ১১ জুলাই। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ একটা জটিল বার্তায় সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রাশিয়ান-আমেরিকার সম্পর্ক নিয়ে মস্কোতে অসন্তোষের মাত্রা বাড়ছে। 

এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভকে সোমবার যে ফোন করেন, সেটা মোটেও অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না। ওই ফোনালাপে তিনি একটা ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি জেরুসালেমে অনুষ্ঠিত পঞ্চম হলোকাস্ট ফোরামের বৈঠকে যেটা নিয়ে  প্রথম কথা বলেছিলেন। একটা নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গঠনের প্রয়োজনীয়তা ও পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন তিনি। একই সাথে জাতিসঙ্ঘ কাউন্সিলের স্থায়ী সদস্যদের উচ্চ দায়বদ্ধতার বিষয়টি নিয়ে সেপ্টেম্বরে সম্মেলন আয়োজনের কথাও বলেন তিনি। 

বিশ্ব রাজনীতির ব্যাপারে মস্কোর প্রধান উদ্বেগের বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিনের ক্ষোভের বিষয়টি তুলে ধরেন পেসকভ, বৈশ্বিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতার উপর যেটার বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন স্টার্ট (স্ট্র্যাটেজিক আর্মস রিডাকশান ট্রিটি) চু্ক্তি নবায়নের বিষয়, ফেব্রুয়ারিতে যেটার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। 

আবার, সপ্তাহ শেষে, সাবেক রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ – যিনি এখন ক্রেমলিনের শীর্ষ কর্মকর্তা, তিনি বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সকে বলেন যে, নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্পের জেতার সম্ভাবনাটা ‘খুব একটা উজ্জ্বল দেখাচ্ছে না’। এটা বলার সময় মেদভেদেভ আরেকটি জটিল বার্তাও দিয়েছেন যে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার উদ্ধার করার সুযোগ এখনও হয়তো পুরোপুরি হাতছাড়া হয়নি। 

তিনি বলেন, “আমেরিকান জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। ট্রাম্পের অনেক সমস্যা রয়েছে, যেটা তার রেটিংয়ের উপর প্রভাব ফেলেছে। তার প্রধান প্রতিপক্ষের বিপরীতে অনেকটাই পিছিয়ে আছেন তিনি। তার পরও, তিনি একজন সৃজনশীল ব্যক্তি এবং যে কোন অলৌকিক ঘটনা ঘটা সম্ভব, যেটা চার বছর আগে ঘটেছিল, সেটা হয়তো আবারও পুনরাবৃত্তি হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে অন্তত তার সম্ভাবনাটা ততটা উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছে না। করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্টি অর্থনৈতিক দুর্দশা আর বর্ণবাদী অস্থিতিশীলতার কারণে তার সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে”।

মজার ব্যাপার হলো, মার্কিন রাজনীতির ব্যাপারে চীনাদের পর্যালোচনাও কমবেশি এ রকমই। মস্কো বিশ্বাস করছে যে, ‘অলৌকিক’ কিছু ঘটতে পারে এবং ‘সৃজনশীল ব্যক্তি’ ট্রাম্প এখনও ২০১৬ সালের পুনরাবৃত্তি করতে পারে, যখন হিলারি ক্লিন্টনকে হারিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে, বেইজিংও ট্রাম্পের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বাতিল করে দেয়নি। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত চীন-যুক্তরাষ্ট্র কলোকুয়াম - যেখানে হেনরি কিসিঞ্জারও উপস্থিত ছিলেন, সেখানে চীনের স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়াং ইয়ি যে নীতি বক্তৃতা করেন, সেখানেও ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক মেরামতের ইঙ্গিত রয়েছে। 

চীনাদের বিভিন্ন মন্তব্যে কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় ট্রাম্পের ব্যর্থতার বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। তাদের যুক্তিটা এ রকম: মহামারী মোকাবেলায় জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টিকে বিবেচনায় নেননি ট্রাম্প, কারণ এতে মার্কিন অর্থনীতির গতি রুদ্ধ হতে পারে। সে কারণে, ভাইরাসের বিষয়টিকে তিনি খাটো করে দেখেছেন। কিন্তু হতাশ হয়ে তিনি দেখেছেন, ভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং অর্থনীতিকে সেটা বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। 

বেইজিং এখনও মনে করে যে, তাদের যে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, সেটা দিয়ে তারা মহামারীর গতি পাল্টে দেয়ার ব্যাপারে ট্রাম্পকে সাহায্য করতে পারে। একই সাথে ভ্যাকসিন গবেষণার বিষয়টিকেও তারা সামনে নিয়ে আসতে পারে। ট্রাম্প নিজেও এখন হয়তো বুঝে গেছেন যে, তার উহান ভাইরাসের প্রপাগান্ডা খুব একটা কাজ দেবে না। 

এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, পম্পেও সোমবার একটা স্পর্শকাতর মুহূর্তে ল্যাভরভকে ফোন করে সময় নষ্ট করেছেন। সন্দেহ নেই যে, ট্রাম্পের নির্দেশেই তিনি এটা করেছেন। রাশিয়া যে বিবৃতি দিয়েছে, সেখানে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে বলা হয়েছে যে, রাশিয়া যে প্রস্তাব দিয়েছিল, সেই প্রস্তাব অনুসারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রস্তুতি নিয়ে দুই শীর্ষ কূটনীতিক বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সামরিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র ওয়ার্কিং গ্রুপের আসন্ন বৈঠকে কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিয়ে আসার জন্য মতবিনিময় করেন তারা”।

ছয় মাস আগে প্যারিসে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল মস্কো, যেটার সম্ভাবনা নিয়ে এখন খতিয়ে দেখছেন ট্রাম্প, যেটার ব্যাপারে বেইজিংয়ের অত্যুৎসাহী সমর্থন রয়েছে। প্রস্তাবটা হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর প্রধানদের নিয়ে একটা সম্মেলন হওয়া দরকার। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর ৭৫ বছর চলে গেছে এবং একন নতুন একটা শান্তি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা দরকার যাতে এই ধরনের ভয়াবহ বিপর্যয় মানুষের উপর আবারও আপতিত না হয়। 

পুতিনের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ, যেটা তিনি জেরুসালেমে দেয়া শক্তিশালী বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, সেখানে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মধ্যে ধাপে ধাপে উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা জানিয়েছেন তিনি। এই আশঙ্কার কারণ হলো কোভিড-১৯ মহামারী, বাহ্যিক অর্থনীতির বিশাল অবনতি, আর্থিক ব্যবস্থার সিস্টেমেটিক ধস, এবং প্রধান পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সঙ্ঘাতের মাত্রা বৃদ্ধি। এই সবকিছু একটা চরম পর্যায়ে চলে গেছে যেটার ফলস্বরূপ সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও ব্যাপকভিত্তিক যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। 

পুতিনের পদক্ষেপের মধ্যে এই বক্তব্যটা বোঝা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন সঙ্কটের ব্যাপারে আলাদাভাবে ছোট ছোট পদক্ষেপ নিলে সেগুলো এখন আর যথেষ্ট হবে না। সমন্বিত সমাধানের জন্য এখন একটা মহা পরিকল্পনা লাগবে। এই মহাপরিকল্পনার বেশ কিছু দিক রয়েছে। শুরুতেই যেটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো নতুন একটি ব্রেটন উডস সিস্টেমের ভিত্তিতে নতুন একটি অর্থনৈতিক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের নিউ ডিলের মধ্যে যে বিনিয়োগ কর্মসূচির কথা বলা হয়েছিল, সেটা পি৫ রাষ্ট্রগুলোর জন্য কার্যকর একটা উপায় হতে পারে। 

একইভাবে, এই এজেন্ডায় গ্লাস-স্টিগাল ব্যাঙ্কের আলাদা করার বিষয়টিও থাকতে হবে; বৈশ্বিক মাত্রার শিল্প উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে – যেটা হবে পুরো বিশ্বের জন্য একটা ‘নিউ ডিল’ – একটা নতুন ব্রেটন উড; আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চীন যেভাবে মহামারী মোকাবেলা করেছে, সেই মাত্রার সক্ষমতা যেন বিশ্বের সব জায়গায় বিদ্যমান থাকে। 

গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিশ্বের প্রধান পাঁচটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ যাতে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারী, ক্ষুধা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, আর্থিক সঙ্কটের বিষয়গুলো সমাধানের জন্য সম্ভাব্য বিভিন্ন উপায়গুলো নিয়ে অন্তত চেষ্টা চালায় এবং চেষ্টা না করেই কেউ যেন হাল ছেড়ে না দেয়।