আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২০

হিন্দু ভারত গড়ে তোলার চেষ্টা

EDITOR'S CHOICE-ENG-26-08-2020-2

৫ আগস্ট অযোধ্যায় একটি হিন্দু মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ পূর্ণ করা হলো। মুঘল আমলের মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে যারা প্রচারণা চালিয়ে আসছিলো, নভেম্বরে আদালত তাদের পক্ষে রায় দেয়। ১৯৯২ সালে কট্টর হিন্দুরা মসজিদটি গুড়িয়ে দেয়। হিন্দু দেবতা রামের পুরানিক জন্মস্থানে নির্মিত মন্দিরের ধ্বংসস্তুপের উপরে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে যে রটনা রয়েছে, সেটা এখনও প্রমাণিত হয়নি। 

মন্দিরের অনুষ্ঠানের জন্য এমন একটা দিনকে বেছে নেয়া হয়, যে দিনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জম্মু ও কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের এক বছর পূর্ণ হলো। এক বছর আগের এই দিনে সংবিধান পরিবর্তন করে জম্মু ও কাশ্মীরকে পরোক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিকতায় নিয়ে যায় ভারত। 

অযোধ্যার মন্দির নির্মাণের বিষয়টি কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের মতোই মোদি সরকারের একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতিকে পোক্ত করতে চান তারা। 

আজ ভারতকে হিন্দু জাতিতে রূপ দেয়ার চূড়ান্ত ধাপটা দেখতে পাচ্ছি আমরা। কিন্তু এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পটা যে চরম মিথ্যা আর ধূর্ততার উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেটা নিয়ে সামান্যই কথা বলা হচ্ছে। 

ঔপনিবেশিক উৎস

ইন্দুজ নদীকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় সিন্ধু। আর সেখান থেকেই এসেছে হিন্দু শব্দটি। ১৯ শতকে ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রথম হিন্দু হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় আচার ও ধারণাকে চিহ্নিত করা হয়, যেগুলোর সাথে অন্য বৈশ্বিক ধর্ম ইসলাম, খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ ধর্মের কোন মিল ছিল না। কিন্তু হিন্দু হিসেবে যারা চিহ্নিত হলো, তাদের জন্য এটার আলাদা কোন তাৎপর্য ছিল না, কারণ তাদের ঐশী বক্তব্যের কোন পবিত্র গ্রন্থ ছিল না। 

স্কলারদের মতে হিন্দুত্ববাদের গড়ে ওঠা মানুষেরই হাতে, যারা উপরের জাতগুলোর প্রথার ভিত্তিতে ঔপনিবেশ সমাজ থেকে ঔপনিবেশিক মিশনারী তৈরির জন্য এটা করেছে। ১৯ শতকের এই সংস্কারকরা বেদ ও উপনিষদ ঘেঁটে আধুনিক ভারতের জন্য স্বল্প প্রথা এবং আধা-একেশ্বরবাদের সমন্বয়ে এই ধর্মের কাঠামোটা দাঁড় করিয়েছে। প্রটেস্টান্ট সংস্কারের কৌশল অনুকরণে এটা করা হয়। পরে একটা ‘আর্য’ জাতি পরিচয় তৈরির জন্য ইউরোপিয়রা প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় গ্রন্থ প্রণয়ন করে। 

ব্রিটিশরা ভারতের বহু-ঈশ্বরবাদকে ‘বর্বর’ ও ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন’ বলে যে সমালোচনা করতো, তার জবাবেই এই পুনর্গঠন করা হয়। মুসলিম আর হিন্দুদের আলাদা পরিচয় তৈরির বিষয়টিকে সাদরে গ্রহণ করেছিলো তারা। অথচ এরা বহু শতাব্দি ধরে একসাথে বাস করে আসছিল এবং তাদের মধ্যে প্রথাগত, বুদ্ধিবৃদ্ধিক, পোশাক, খাবার, এবং মিউজিকের দিক থেকে অভিন্ন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। 

হিন্দু আর মুসলিমদের মধ্যে যখন সীমা টেনে তাদেরকে আলাদা করে দেয়া হচ্ছিল, তখন উদীয়মান প্রিন্ট মিডিয়াও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। আর্য সমাজের মতো সংস্কারবাদী গ্রুপগুলো হিন্দুস্তানী ভাষাগুলোকে বাদ দিয়ে দেব নাগরি স্ক্রিপ্ট গ্রহণ করে। প্রিন্টিংয়ের জগতে উর্দু আর ইংরেজির পাশাপাশি দেবানগরীর ব্যবহার শুরু হয়, যেটা সংস্কারবাদীদের আলাদা হিন্দু পরিচয় তৈরিতে সাহায্য করেছিল। 

এখনকার মতো তখনও ভারতের সংস্কারের বড় বাধা ছিল জাত প্রথার মারাত্মক বিভাজন। সে কারণে তখন উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণদের মর্যাদা কমিয়ে আনার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটা করা হলে পুরো সংস্কারের কাঠামোটাই ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। 

ঔপনিবেশিক থেকে উত্তর-ঔপনিবেশিকে

এক শতাব্দি আগে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন, তখন সংস্কারবাদীদের দ্বিধার একটা সমাধান হয়। গান্ধী দাবি করেন যে, অধিকাংশ হিন্দুর মতোই তার ধর্ম হলো সনাতম ধর্ম, সংস্কারবাদীদের পুঁথিগত নিয়মকানুন নয়। জাত প্রথাকে উপমহাদেশের জন্য অশুভ হিসেবে মন্তব্য করেন তিনি। তবে এটার অস্তিত্ব মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।

গান্ধী যে প্রস্তাব করেন, সেখানে ব্যক্তিকে মানুষ হতে বলা হয়েছে এবং বাহুল্য পরিত্যাগ করতে বলা হয়েছে। হিন্দু আর মুসলিমরা যেমন বিত্ত ও পেশার দিক থেকে অভিন্ন হতে পারে, তেমনি শান্তি আর সমৃদ্ধির অভিন্ন স্বার্থ নিয়েও তারা পাশাপাশি কাজ করতে পারেন। 

গান্ধীর এই সমাধান সাদরে গ্রহণ করে নেয় কংগ্রেস পার্টি, যারা ভারতে ঔপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য প্রচারণা চালালেও ব্রিটিশ ভারতের জন্য গান্ধীর সমাধানকে তিনি মেনে নিয়েছিলেন। তার দূরদৃষ্টি থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, আধুনিকায়নের সাথে সাথে এই বাণীর আবেদন হারিয়ে যাবে এবং ভারতীয় মুসলিমদের ভাগ্য তখন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে চলে যাবে। 

গান্ধীর সমাধানের প্রধান সমালোচক – জাতবিরোধী চিন্তক ভিমরাও রামজি আম্বেদকার এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী তাত্ত্বিক বিনায়ক দামোদর সাভারকারের মতো ব্যক্তিরা ১৯ শতকের সংস্কারের সমস্যাগুলোর আরও আধুনিক ও সমন্বয়মূলক সমাধানের পক্ষে ছিলেন। আম্বেদকার আর সাভারকার দুজনেই রাজনীতি আর সমাজে সমতা চেয়েছিলেন, জাতভেদের মধ্যে নয়। আম্বেদকার তার সমাধানের জন্য গেছেন নতুন সাংবিধানিক উদারতন্ত্রের দিকে। অন্যদিকে, সাভারকার ভারতকে এক করার জন্য নতুন রাজনৈতিক ধর্ম তৈরি করেন, যেটাকে বলা হচ্ছে হিন্দুত্ববাদ। 

স্বাধীনতার পরের দশকগুলোতে কংগ্রেসের সরকার জাত প্রথার স্তর এবং সম-নাগরিকত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেছিল। এই সময়টাতে সবাই ভারতের সমান নাগরিক ছিল, এমনকি কাশ্মীরীরাও, যদিও সামাজিক স্তরভেদটা তখনও বজায় ছিল। অভিজাত মুসলিম আর খ্রিস্টানরা ঔপনিবেশিক আমলের মতোই জনজীবনে গুরুত্ব পেতেন। 

১৯৮০ থেকে অর্থনৈতিক উদারবাদ ও নব্যউদারবাদী বিশ্বায়নের কারণে পুরনো স্তরগুলো নড়বড়ে হয়ে যায়। ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন জাতগুলো আরও ভেঙ্গে যায়, তাদের আলাদা পরিচয় গড়ে ওঠে এবং একে অন্যের বিপরীতে সমতা অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ফলে জাতীয় ঐক্যের বদলে জনজীবনে অনেক ভিন্নমতের সৃষ্টি হয়। 

জবাবে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিশেষ করে মোদির অধীনে সাভারকারের হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক ধর্মের ভিশন সামনে নিয়ে আসে, তবে ভিন্নভাবে। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস আর চর্চার চেয়ে হিন্দু রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদ

কাগজে কলমে হিন্দু রাষ্ট্র জাতভিত্তিক বৈষম্যের বিরোধী। মোদির নিজের ক্ষমতায় উঠে আসার গল্পটি তাদের নতুন আধুনিকতাবাদের জ্বলজ্বলে উদাহরণ। কিন্তু বাস্তবে, ভারতীয় সমাজের সব ধরনের অত্যাচারকে গ্রহণ করছে হিন্দুত্ববাদীরা। আসলে, কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে বেশি সমান। ধনী গরিবের আধুনিক শ্রেণীর মধ্যে প্রাচীন জাতভেদের জায়গায় এখন নতুন ঢুকে পড়েছে রক্ষণশীলতা। 

রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের সাথে যাদের সম্পর্ক নেই – সেই মুসলিম, খ্রিস্টান, বামপন্থী, বর্ণবাদবিরোধী কর্মীরা এখন বৈষম্য আর বিচ্ছিন্নতাবাদের নতুন শিকারে পরিণত হয়েছে। নীতিগতভাবে, এই গ্রুপগুলোর কেউ যদি হিন্দুত্ববাদকে গ্রহণ করে তাহলে তারাও রাজনৈতিকভাবে হিন্দু গণ্য হবে। নতুন হিন্দু রাজনীতিতে যে কোন কিছু নিয়েই দর কষাকষি চলে। 

অন্তত এই মুহূর্তে হিন্দু রাষ্ট্র চরমভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সরকারে পরিণত হয়েছে এবং সেটা প্রায় ধর্মবিশ্বাসের মতো হয়ে গেছে। মোদি এখানে রাষ্ট্র এবং তার বিরোধী কেউ নেই – এমনকি বিচার বিভাগ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকও নয়। নাগরিক সমাজ, মিডিয়া আর একাডেমিয়াকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, কারণ তারা ভিন্নমত পোষণ করে। মিডিয়ার একটা অংশকে এখন প্রচারণায় নামানো হয়েছে। অন্যদিকে বিশিষ্ট সাংবাদিক, অধিকার কর্মী, এবং একাডেমিকদের গ্রেফতার করে বা চাপ দিয়ে চুপ করানো হচ্ছে। 

নির্বাচনী ব্যবস্থায় এখন একটি মাত্র রাজনৈতিক দলের আধিপত্য, সেটা হলো হিন্দুত্ববাদী বিজেপি। কংগ্রেসসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও নতুন রাজনৈতিক ধর্মের মধ্যে হিন্দুত্ববাদের ভাষায় কথা বলতে হচ্ছে। 

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মোদি আর তার পূর্বসূরীদের ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাস আর আচার প্রথার ব্যাপারে খুব সামান্যই জানি আমরা। হিন্দুত্ববাদের নতুন রাজনৈতিক ধর্মের ভিত্তিই দাঁড়িয়ে আছে মুসলিম-বিরোধিতার (বা খ্রিস্টান-বিরোদিতা) উপর। হিন্দুত্ববাদ থেকে আর যারা আলাদা ছিল, সেই বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ধর্ম এখন হিন্দুদের শাখা প্রশাখা হয়ে গেছে। 

ভারত যদি এখন হিন্দু জাতি হয়ে থাকে, তাহলে এখানে ব্যক্তির পরিচয় চিহ্নিত হচ্ছে অন্যের প্রতি তার ঘৃণার দ্বারা। ভারতের তরুণরা যখন এই ঘৃণার রাজনীতির ব্যাপারে ক্লান্ত হয়ে যাবে, তখন হয়তো তারা সমৃদ্ধিশালী, সমতাপূর্ণ ও সভ্য দেশ গড়ার জন্য ভিন্ন পথগুলোর কথা চিন্তা করবে।