আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

পাকিস্তানকে বড্ড বেশি প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের

EDITOR’S CHOICE-ENG-03-07-2020

যেমনটা ধারণা করা হয়েছিল, আফগানিস্তানে আমেরিকান ও ন্যাটো সেনাদের হত্যার জন্য রাশিয়া যে কথিত পুরস্কার ঘোষণা করেছিল বলে বলা হচ্ছে, সেটা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস আরও তথ্য ফাঁস করেছে। সেখানে বলা হয়েছে রাশিয়ান সামরিক গোয়েন্দাদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে তালেবানদেরকে অর্থ পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া রাশিয়ান-তালেবান বিনিময়ের ব্যাপারে মার্কিন গোয়েন্দাদের আফগান সরকার কোন তথ্য সহায়তাও দেয়নি। 

এদিকে, মার্কিন কংগ্রেসকে বিষয়টি ভালোভাবেই নাড়া দিয়েছে। সম্ভবত আরেকটি ‘রাশিয়াগেট’ কেলেঙ্কারির সূচনা হতে যাচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা হাঁটছে যুদ্ধের পথে। হোয়াইট হাউজের শীর্ষ সহকারীরা সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটিকে ব্রিফিং করছে। 

বিষয়টি নিয়ে সাবেক ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজর সুসান রাইসের লেখা কলাম প্রকাশ করেছে দ্য টাইমস। আসছে নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের সম্ভাব্য ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে রাইসের নাম জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে। রাইস তার লেখায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আর প্রধান সহকারীদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। 

এটা নিশ্চিত যে, এই বিতর্ক আফগানিস্তানের ঘটনাপ্রবাহের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এর প্রথম লক্ষণ দেখা গেছে মঙ্গলবার – মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও তালেবান ডেপুটি প্রধান ও প্রধান আলোচক মোল্লা বারাদারের সাথে ভিডিও কনফারেন্স করেছেন। হোয়াইট হাউজের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পম্পেও তালেবান নেতার সাথে ফেব্রুয়ারির দোহা চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন এবং “তালেবানদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যাতে তারা তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, যার মধ্যে আমেরিকার উপর হামলা না করার বিষয়টিও রয়েছে”।

পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, মার্কিন সেনাদের উপরে তালেবানরা যাতে কোন হামলা না করে, সেজন্য সরাসরি তালেবানদেরকে সতর্ক করা হয়েছে। এপি’র রিপোর্টে তালেবান মুখপাত্র সুহাইল শাহীনের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, যিনি এক টুইটে বলেছেন যে, পম্পেও ও বারাদার একইসাথে দোহা চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে ‘সামনে এগিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন উপায় নিয়ে’ আলোচনা করেছেন। 

হোয়াইট হাউজ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে, কারণ তারা চায় অবিলম্বে আন্ত:আফগান সংলাপ শুরু হওয়া দরকার যাতে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ঘোষণা করা যায়। এমন রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছে যে, ৮৬০০ আমেরিকান সেনাদের মধ্যে আরও ৪০০০ সেনাকে প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। 

মার্কিন সেনাদের হত্যার জন্য রাশিয়ার কথিত পুরস্কার ঘোষণা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক এবং বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসে শুনানির সম্ভাবনার মধ্যে ট্রাম্প চাইবেন যাতে আফগানিস্তান থেকে পুরো মার্কিন সেনাদের সরিয়ে আনা যায়। তালেবানদের সাথে আলোচনার জন্য নিয়োজিত মার্কিন বিশেষ দূত জালমাই খলিলজাদও মোল্লা বারাদারের সাথে আলোচনার জন্য দোহা পৌঁছেছেন। 

সব মিলিয়ে ২৬ জুন থেকে টাইমসে প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলো হোয়াইট হাউজকে বাধ্য করেছে যাতে যেভাবেই হোক আন্ত:আফগান শান্তি আলোচনা শুরুর ব্যবস্থা করে তারা, যে আলোচনায় প্রধান এজেন্ডা হবে একটা সম্পূর্ণ অস্ত্রবিরতি। টাইমসের রিপোর্টগুলো আন্ত:আফগান শান্তি আলোচনার ফলাফলের উপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা দারুণভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। 

এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ভালো রকম বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণা নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি মস্কোকে হতাশ করেছে এবং আন্ত:আফগান শান্তি আলোচনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার সহযোগিতার বিষয়টি অসম্ভব হয়ে উঠেছে, যেটা আগে ভাবা হয়েছিল। 

একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং ওয়াশিংটন এখন কোনভাবেই আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় বেইজিংয়ের সহযোগিতার উপর প্রভাব বিস্তারের পর্যায়ে নেই। একইভাবে, তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন নতুন করে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে যখন পম্পেও মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হাজির হয়ে ইরানের উপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরও দীর্ঘায়িত করার প্রস্তাব উপস্থাপন করে। 

রাশিয়া আর চীন এটা স্পষ্ট করেছে যে, এ ধরনের মার্কিন প্রস্তাবে তারা ভেটো দেবে। সামনের সপ্তাহ ও মাসগুলোতে ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করবে বলে ধারণা করা যায়। 

রাশিয়া, চীন ও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি অবস্থান করছে বলে আফগান শান্তি প্রক্রিয়া সামনে এগিয়ে নেয়ার পুরো দায় বর্তেছে এখন ট্রাম্প প্রশাসনের উপর। সে কারণে পাকিস্তানের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা আগের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। (খলিলজাদ চলতি সপ্তাহেই ইসলামাবাদ সফরে যাচ্ছেন।)

স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, আফগানিস্তান থেকে সরে যাওয়ার চিত্রনাট্য আমেরিকার হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে। এটা নিশ্চিত যে, তালেবানরা একটা শক্তির জায়গা থেকে দর কষাকষিতে অংশ নেবে। জানা গেছে বুধবারের ভিডিও কনফারেন্সে মোল্লা বারাদান যে সব দাবি করেছেন, তার অনেক কিছুই পম্পেওয়ের জন্য ছিল অপমানজনক। 

প্রধান তিনটি আঞ্চলিক রাজধানী – মস্কো, তেহরান ও বেইজিংয়ের অবন্ধুসুলভ মনোভাবের কারণে তাদেরকে বাদ দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব প্রস্থান করা ছাড়া ওয়াশিংটনের সামনে আর কোন উপায় নেই। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের দীর্ঘসময় রেখে দেয়ার ঝুঁকি ট্রাম্প নিবেন না। 

কৌতুহলের ব্যাপার হলো আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিটা ১৯৮৮ সালের জেনেভা চুক্তিকালিন সময়ের সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের মধ্যে ওই চুক্তি হয়েছিল, এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সেখানে গ্যারান্টর হিসেবে উপস্থিত ছিল। 

জেনেভা চুক্তির মধ্যে বেশ কিছু দিক ছিলো। প্রধানত, এটা ছিল ইসলামাবাদ আর কাবুলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি যেটার ভিত্তি হলো পারস্পরিক সু-প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক; ছিল আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির ঘোষণা, যেখানে স্বাক্ষর করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন আর যুক্তরাষ্ট্র; আর আফগান পরিস্থিতি নিয়ে পাক-আফগান চুক্তি, যেটার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন আর যুক্তরাষ্ট্র। 

এই শান্তি চুক্তিটা ছিল চিত্তাকর্ষক, কিন্তু সেটা হয়েছিল অনেকটা বল প্রয়োগের মাধ্যমে। এর একমাত্র ইতিবাচক অর্জন ছিল যে, মস্কো বিশ্বস্ততার সাথে ব্যাগ্রভাবে চুক্তির শর্তগুলো পর্যবেক্ষণ করছিল এবং সোভিয়েত সেনাদের আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নেয়ার নির্ধারিত সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিল। (১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সোভিয়েত সেনাদের প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়।)

আন্ত:আফগান শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে আরেকটি হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্যে, যেখানে সংশ্লিষ্ট দুটো পক্ষই (আফগান সরকার ও তালেবান) অনমনীয়। আর এখানে যারা গ্যারান্টর থাকবে (যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তান), তাদেরও অগ্রাধিকার এখানে ভিন্নরকম। এখানেও, আন্ত:আফগান শান্তি আলোচনার একমাত্র ইতিবাচক অর্জন যেটা হতে পারে, সেটা হলো আফগানিস্তান থেকে ২ দশকের পুরনো আমেরিকান দখলদারিত্বের অবসান।