আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

শুধু শান্তিচুক্তি দিয়ে আফগানিস্তানের অগণিত সমস্যা দূর করা যাবে না

focus-eng-07-11-2020-1
১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, কাতারের দোহায় আফগান সরকার ও তালেবান প্রতিনিধিনিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও

কাতারের রাজধানী দোহায় চলমান আন্তঃআফগান শান্তি আলোচনার দিকে যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর, তখন গত দুই দশকে আফগানিস্তানে ‘দুর্নীতি, অপব্যবহার ও অপচয়ে’ নষ্ট হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে প্রকাশিত নতুন একটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে যে তালেবান ও আফগান সরকারে মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শান্তিচুক্তি হলেও দেশটি অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকবে। 

২০০১ সালের শেষ দিকে তালেবান সরকারকে উৎখাতের পর থেকে মার্কিন কংগ্রেস আফগান পুনর্গঠন কর্মসূচিতে প্রায় ১৩৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। এই পরিমাণটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপ পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থ (আজকের হিসাবে ১৩৫ বিলিয়ন ডলার) ব্যয় করেছিল, তার প্রায় সমান এবং এটা যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির প্রায় ৪.৩ ভাগ। 

আফগান পুনঃনির্মাণে মার্কিন সরকারের স্বতন্ত্র তদারকি কর্তৃপক্ষ স্পেশাল ইন্সপেকশন জেনারেল ফর আফগানিস্তান রিকন্সট্রাকশন (এসআইজিএআর) অফিস সম্প্রতি ২০০২ সাল থেকে আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় করা ৬৩ বিলিয়ন ডলার হিসাবের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২০ অক্টোবর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে উপসংহার টানা হয়েছে যে পর্যালোচনা করা অর্থের ৩০ ভাগ বা ১৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে অপচয়, জাতিয়াতি ও অপব্যবহার। প্রতিবেদনে বলা হয়, কেবল ২০১৮-১৯ সময়কালেই প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলার নষ্ট হয়েছে দুর্নীতিতে। 

এসআইজিএআর প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে যে মারাত্মক দুর্নীতি, ব্যাপক নিরাপত্তাহীতা, জবাবদিহিতার অভাবে আফগানিস্তান অব্যাহতভাবে বিনিয়োগের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। এটি দুর্নীতির বিস্তার রোধে সরকারি প্রয়াসের ব্যর্থতা এবং তালেবানের সাথে সমঝোতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে পুনর্গঠন সফলভাবে তদারকির ব্যাপারে সরকারের দক্ষতার ওপর মারাত্মক সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। 

গত দুই দশকে আফগানিস্তান অনেক পথ পাড়ি দিয়েছে। লাখ লাখ মেয়ে এখন স্কুলে যাচ্ছে, সারা দেশে অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে, স্থানীয় সম্প্রদায়গুলো এখন তাদের গ্রামেই তাদের বিষয়গুলো মেটাতে পারছে। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও দারিদ্র্যতা, নিরাপত্তাহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতার মতো সমস্যা রয়ে যাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, আফগানিস্তানে এখনো টেকসই পুনর্গঠন নিশ্চিত হয়নি। বস্তুত, এ ক্ষেত্রে কোনোই অগ্রগতি হয়নি। 

দোহায় যারা আলোচনা করছেন, তাদের জন্য বিষয়টি উপলব্ধি করা দরকার যে আলোচনার ফল যাই হোক না কেন, আফগানিস্তান অদূর ভবিষ্যতে ব্যাপকভাবে বিদেশী সাহায্যের ওপরই নির্ভরশীল থাকবে। খুব কম করে হিসাব করলেও দেখা যাচ্ছে, মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর পতন ঠেকাতেই বছরে বিদেশি সহায়তা দরকার ৫ বিলিয়ন ডলার। 

তালেবান ও আফগান সরকারের মধ্যে যে সমঝোতাই হোক না কেন, যারা শাসন ক্ষমতায় থাকবে, তাদেরকে বিপুল আর্থিক দায়দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। নিষ্পত্তি-পরবর্তী বিনিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য কোনো অপচয় করা যাব না, দুর্নীতি করা যাবে না, অব্যবহার করা যাবে না। 

আর এসবের জন্য আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি ‘সেন্টার ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিমেনেটিরেয়ান স্টাডিজে’ বক্তৃতাকালে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। 

আফগানিস্তানের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি যথার্থ নয়। আবার এসআইজিএআর প্রতিবেদন থেকে আফগান সরকারের পক্ষে নিজেদের দূরে রাখাও সম্ভব হবে না। এমন অবস্থায় চলমান দোহা আলোচনার সময় আফগান সরকারের উচিত হবে তাদের পরিকল্পনা তুলে ধরা। নতুন করে সূচনার এটিই একটি ভালো সুযোগ। এর মাধ্যমেই তারা দাতা ও আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারে। 

আবার তালেবানও তাদের চিন্তাধারা এখানে প্রকাশ করতে পারে। সরকারের সাথে নিষ্পত্তির পর কিভাবে দারিদ্র্য দূর করবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জবাবদিহিতার সৃষ্টি করবে, সেগুলো তালেবান জনগণের সামনে উপস্থাপন করার কাজটি এখনই করতে পারে। 

আফগানরা যদি দোহায় রাজনৈতিক নিষ্পত্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর এগুলো নিয়ে আলোচনা করতে চায়, তবে অনেক দেরি হয়ে যাবে। বরং তারা এখনই সব ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে। 

এদিকে আফগানিস্তানের দাতারা ২৩ ও ২৪ নভেম্বর জেনেভায় বসতে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ ও সেগুলো সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা করতে পারে। 

জেনেভায় দাতাদের সম্মেলন থেকে দীর্ঘ মেয়াদি (৫-১০ বছর)পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্য একটি প্রতিনিধিত্বশীল বোর্ডও গঠন করা যেতে পারে। এতে সদস্য হিসেবে থাকতে আফগান নাগরিক সমাজের সদস্যদেরও রাখা যায়।