আমরা লাইভে English বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২০

বাংলাদেশের ‘ক্রসফায়ার’ সংস্কৃতি একটি নির্মম সত্য

FOCUS-ENG-05-09-2020

৩১ জুলাই বাংলাদেশ পুলিশ যেটা করেছিল, সেটা তারা নিয়মিত কাজের অংশ মনে করতো। ঠাণ্ডা মাথায় তারা একজনকে গুলি করে হত্যা করেছে। কিন্তু এখানে টার্গেট ব্যক্তিটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ‘মাদক ব্যবসায়ী’ ছিল না। তিনি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত একজন সামরিক কর্মকর্তা, যিনি একসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের সুরক্ষা টিমের সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশের আতঙ্কিত নিরাপত্তা পরিবেশে যে হাজার হাজার মানুষ নিহত হচ্ছে, মেজর সিনহা রাশেদ খান তাদের মধ্যে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আরেকটি শিকারে পরিণত হন। 

এই হত্যাকাণ্ড এতটা ঔদ্ধত্বের সাথে হয়েছে যে, জনগণের প্রতিক্রিয়া হয়েছে খুবই তীব্র। ফলে হাসিনা তার পুরনো প্রতিশ্রুতির দিকে ফিরতে বাধ্য হয়েছে, যেটা তিনি বহু আগেই লঙ্ঘন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তার সরকারের অধীনে বিচারবহির্ভূত হত্যার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখানো হবে। 

২০০৮ সালে লণ্ডনে আমি যখন নির্বাসিত হাসিনার সাথে তার বোনের বাসায় দেখা করেছিলাম, তার দেশের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য তখন তিনি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, পরের বছরের নির্বাচনে তিনি যদি জিততে পারেন, তাহলে এই চর্চা তিনি বন্ধ করবেন, যেটার কড়া সমালোচনা তখন তিনি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “এই হত্যাকাণ্ড আমি আর হতে দেবো না। আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন”।

এই প্রতিশ্রুতির পরও বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী তার এক দশকের শাসনামলে ২৪০০ জনের বেশি মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই দাবি যতই জোরালো হোক, কর্মকর্তারা সবসময় অভিযোগ নাকচ করেন কিছু অজুহাত দিয়ে: ভিকটিমকে মাদকসহ পাওয়া গেছে, বা সে একজন ভয়াবহ সন্ত্রাসী। একের পর এক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, যেটাকে বলা হয়ে থাকে ‘ক্রসফায়ার’ – সাজানো একটা বন্দুকযুদ্ধে ভিকটিমকে হত্যা করা হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী এটা বলার চেষ্টা করে যে, আত্মরক্ষার্থে তাদের গুলি করা হয়েছে। 

‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে, কর্তৃপক্ষের হাতে মৃত্যুর প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে এটা। চলতি বছরের শুরুর দিকে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাসহ এমপিরা পর্যন্ত আহ্বান জানান যাতে অভিযুক্ত অপরাধীদের ‘ক্রসফায়ারে’ দেয়া হয়। 

মেজর সিনহার হত্যার পর পুলিশ তাদের গতানুগতিক বক্তব্য দিয়েছে: তার গাড়ি থেকে মাদক পাওয়া গেছে এবং সিনহা পুলিশের দিকে বন্দুক তাক করেছিলেন, সে কারণে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি করেছে। কিন্তু মিথ্যার জাল দ্রুতই ছিঁড়ে গেছে। কর্তৃপক্ষ এখানে তদন্ত শুরু করতে বাধ্য হয়। এ পর্যন্ত ২১ পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আরও দুইজনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করা হয়েছে। সরকার এমনকি প্রকাশ্য শুনানিরও ব্যবস্থা করেছে এবং জনগণ এখন জানতে চাচ্ছে যে, এই বার অন্তত ন্যায় বিচার পাওয়া যাবে কি না। 

দুর্ভাগ্যজনক হলো জাতীয় পুলিশ প্রধান বেনজির আহমেদকে তদন্ত টিমের সহ-প্রধান রাখার কারণে এই তদন্তের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। র‍্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) প্রধান থেকে আহমেদকে সম্প্রতি পুলিশ প্রধানের দায়িত্বে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। শুধু তার দায়িত্বকালেই র‍্যাব অন্তত ৮০টি গুম করেছে এবং ৪৫০টির বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যা করেছে। 

২০১৭ সালের এপ্রিলে আহমেদ দায়িত্বে থাকাকালে সুইডিশ রেডিও গোপনে রেকর্ডকৃত সিনিয়র এক র‍্যাব কর্মকর্তার একটি সাক্ষাতকার প্রচার করেছিল, যেখানে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, র‍্যাব প্রায় নিয়মিত মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে এবং এরপর লাশ লুকিয়ে ফেলে। ২০১৮ সালে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা আকরামুল হককে গুলি করে হত্যা করা হয়, তখন সেই গুলির বিষয়টি ফোনে শুনেন তার পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের সদস্যরা যে রেকর্ডিং প্রকাশ করে, সেখানে শোনা গেছে: এক ব্যক্তি বলছে, “গুলি বের কর”। আরেকজন জিজ্ঞাসা করে, “তার হাত কি বাঁধা আছে?”। কিন্তু র‍্যাব বলেছে যে, হাসিনার রক্তাক্ত ‘মাদক বিরোধী যুদ্ধের’ অংশ হিসেবে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে হক। এই সময় র‍্যারের নেতৃত্বে ছিলেন আহমেদ। 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দীর্ঘদিন ধরে র‍্যাবকে বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী কমিটি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যাতে র‍্যাবকে অন্তত পুরোপুরি সিভিলিয়ান বাহিনীতে পরিণত করা হয়। 

র‍্যাব যখন গঠন করা হয়, তখন অন্যতম আশঙ্কা ছিল যে, র‍্যাবের মধ্যে পুলিশ ও সেনা উভয়ই থাকার অর্থ হলো বাহিনীর এই অপকর্মগুলো সহজেই পুলিশের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। এখন সেই আশঙ্কা সত্য হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নামে অপকর্মের তদারকি করার জন্য আগ্রহের যারা প্রমাণ দিয়েছে, তাদের পদোন্নতি ও পুরস্কার দেয়া হয়েছে, এবং সেই ধারার অংশ হিসেবেই আহমেদের পদোন্নতি হয়েছে। মেজর সিনহার হত্যাকাণ্ডের পর যে সব পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে এক সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানোর অভিযোগ রয়েছে। তবু গত বছর এই কর্মকর্তাকে মর্যাদাপূর্ণ পুলিশ মেডেল দেয়া হয়, যে কি না ‘মাদক ব্যবসায়ীদের’ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যার জন্য গর্ব করে বেড়াতো। মাত্র কয়েক মাস পরেই সে প্রকাশ্যেই স্বীকার করে যে, ইচ্ছা করেই ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে সে। তার টিম ‘শুধু অপরাধীদের টার্গেট’ করে বলেও মন্তব্য করেছে সে। 

কিন্তু সিনহা হত্যাকাণ্ড দেখিয়েছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ৫ আগস্ট গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকে বাংলাদেশে একটি ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা ঘটেনি। 

শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে গণতন্ত্র আর মানবাধিকার চ্যাম্পিয়ন দাবি করে আসছেন। তার উচিত তার নিজের মধ্যে ২০০৮ সালের সেই ব্যক্তিটিকে খুঁজে বের করা, যে আমাদের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো যে, অবৈধ হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করা হবে। তার উচিত ক্রসফায়ারের ঘটনায় অভিযুক্ত সবাইকে বরখাস্ত করা এবং সবগুলো বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করা এবং দায়িদের বিচারের মুখোমুখি করা। কেবল তখনই জিরো টলারেন্সের প্রতিশ্রুতি রক্ষা হবে তার। 

 

ব্র্যাড অ্যাডামস হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া ডিরেক্টর