আমরা লাইভে English বুধবার, অক্টোবর ২৭, ২০২১

গণতন্ত্র শাসকদের ইচ্ছানির্ভর ব্যবস্থা নয়

prothomalo-english_2021-04_f880d1cb-05f1-441b-a34d-190bb6747cec_ar

পৃথিবীজুড়ে গণতন্ত্র সংকটাপন্ন, এ কথা বারবার আলোচিত হচ্ছে। ফ্রিডম হাউসের ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ১৫ বছর ধরে গণতন্ত্রের পশ্চাৎযাত্রা অব্যাহত আছে, এই নেতিবাচক ধারা গত বছর সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়েছে। ২০২০ সালে ৭৩টি দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবনতি হয়েছে, উন্নতি ঘটেছে মাত্র ২৮টিতে। যেসব দেশে অবনতি ঘটেছে, সেগুলো পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের আবাসভূমি।

অবনতিশীল গণতন্ত্রের দেশগুলোর ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের অগণতান্ত্রিক বলে মনে করেন না, বরং নিজেদের গণতন্ত্রের রক্ষাকারী বলেই দাবি করেন এবং বলে থাকেন, যেহেতু গণতন্ত্রের কোনো সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নেই এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কোনো একক রূপ নেই, সেহেতু তাঁরা যাকে গণতন্ত্র বলে অভিহিত করছেন, সেটাই গণতন্ত্রের এক নতুন রূপ।

গণতন্ত্রের কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই—এ কথার মানে এই নয় যে গণতন্ত্রের মূলনীতি বলে কিছু নেই। গণতন্ত্র কোনো ধরনের বিশেষ শাসনব্যবস্থাকে আদর্শ বলে বিবেচনা করে না—এ কথার অর্থ এই নয় যে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কিছু উপাদান অত্যাবশ্যকীয় নয়। গণতন্ত্র একাদিক্রমে একটি আদর্শ ও একটি শাসনব্যবস্থা। এর দুটি দিককে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান ও মূলনীতিগুলোর অনুসন্ধানের সূচনা হয় প্রাচীন গ্রিসে অ্যারিস্টটলের সময়। তবে ষোড়শ শতাব্দী থেকে রাষ্ট্র ও নাগরিকের অধিকার নিয়ে আলোচনায় এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্যারন ডি মন্টেস্কু, টমাস হবস, জন লক, জেরেমি বেনথাম, জেমস মিল, জন স্টুয়ার্ট মিল, ডেভিড হিউম ও জাঁ জাক রুশোর অবদান এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের আলোচনাগুলোর শুরু হয়েছে স্বৈরবাদী (অ্যাবসলুটিস্ট) রাষ্ট্রের বিরোধী অবস্থান থেকে, ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়ে।

হবসের (১৫৮৮-১৬৭৯) কিছুটা ঝোঁক ছিল স্বৈরবাদের দিকে, মূলত ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। কিন্তু হবস জনগণের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তির ওপর জোর দিয়েছেন। কিছু অধিকার বিসর্জন দেওয়ার বিনিময়ে ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’ জনগণকে সুরক্ষা দেবে, এমনটাই তিনি জোর দিয়ে বলেছেন। জন লক (১৬৩২-১৭০৪) সামাজিক চুক্তির প্রশ্নে শুধু যে হবসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, তা-ই নয়; বরং ধারণাটিকে আরও দূরে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সামাজিক চুক্তিটি হতে হবে অবশ্যই রাষ্ট্র ও শাসিতের মধ্যে। লক খুব স্পষ্টভাবে রাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে খারিজ করেননি। কিন্তু সম্মতির ভিত্তিতে সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং সরকার ও তার প্রতিনিধিরা ‘শাসিতের কল্যাণ’ বজায় রাখতে না পারলে সেই সম্মতি উঠিয়ে নেওয়া যাবে, এ ধারণার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। এটি যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ই সরকার ও শাসিতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান পূর্বশর্ত হয়ে উঠেছে। আইনসভা ও নির্বাহী ক্ষমতাকে পৃথক করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

মন্টেস্কু (১৬৮৯-১৭৫৫) তিন ধরনের সরকারের কথা বলেছেন: প্রজাতন্ত্রী সরকার, যা হয় গণতান্ত্রিক, নয় অভিজাততন্ত্রের রূপ গ্রহণ করতে পারে; রাজতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্র। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তিনি জনগণের সার্বভৌমত্বের কথা বলেছেন, জনগণই সার্বভৌম। গণতান্ত্রিক সরকার কাঠামোয় ভোটাধিকার ও ভোটদান পরিচালনার আইন অপরিহার্য হয়ে ওঠে এই মূলনীতিগত ধারণা থেকেই।

জাঁ জাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) তাঁর বহুল প্রচারিত সামাজিক চুক্তি (১৭৬২) বইয়ে জোর দিয়ে বলেছেন যে মানুষ সামাজিক চুক্তি গ্রহণ করবে। এতে কিছু অধিকার তাদের বিসর্জন দিতে হবে। কিন্তু তা কোনো রাজার কাছে নয়, বরং পুরো সমাজের কাছে, জনগণের কাছে। জনগণ তখন তাদের ‘সাধারণ ইচ্ছার’ প্রয়োগ ঘটাবে ‘জনকল্যাণের’ স্বার্থে আইন তৈরি করার জন্য। রুশোর মতে, সব রাজনৈতিক ক্ষমতাই থাকা উচিত জনগণের হাতে, যা জনগণের সাধারণ ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে। ‘জনগণই নিয়মনীতি তৈরি করবে, যা তারা নিজেরা মেনে চলবে আর তাই হচ্ছে সার্বভৌম ক্ষমতা।’

এই সাধারণ ইচ্ছা কার্যকর করবে সরকার, এ পর্যন্ত উল্লেখ করা প্রায় সব তাত্ত্বিকই এ কথা বলেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব যে সরকার সীমা লঙ্ঘন করবে না। জেরেমি বেনথাম (১৭৪৮-১৮৩২) ও জেমস মিল (১৭৭৩-১৮৩৬) এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছেন। তাঁদের মতে, শাসিতের কাছে শাসকের দায়বদ্ধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেনথাম লিখেছেন, গণতন্ত্রের অংশীদারেরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য যে নির্বাহীদের নিযুক্ত করেন, তাঁদের হাতে তাঁরা যেন জুলুম বা লুণ্ঠনের শিকার না হন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করে গণতন্ত্র। সেটাই গণতন্ত্রের লক্ষ্য এবং তার প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ স্বৈরাচারী ক্ষমতার হাত থেকে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার দরকার পড়ে। গণতন্ত্রকে রক্ষা করার দরকার পড়ে এমনকি তাঁদের হাত থেকেও, যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ‘সাধারণ ইচ্ছার’ বাস্তবায়ন করতে। ফলে বেনথাম ও মিল দুজনই জোর দিয়ে যা বলেছেন, তার সারসংক্ষেপ, বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড হেল্ডের ভাষায়, ‘ভোট, গোপন ব্যালট, সম্ভাব্য রাজনৈতিক নেতাদের (প্রতিনিধিরা) পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নির্বাচন, ক্ষমতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পৃথক্‌করণ, বক্তৃতা ও জনসংশ্লিষ্টতাই পারে সাধারণত সমাজের স্বার্থ বজায় রাখতে।’

জন স্টুয়ার্ট মিল (১৮০৬-৭৩) দুটি বিষয়ের উল্লেখ করেছেন—গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা। মিলের যুক্তি ছিল, আমাদের জীবনযাপনের জন্য স্বাধীনতা বা লিবার্টি অত্যাবশ্যক। স্বাধীনতা না থাকলে জনগণের কণ্ঠরোধ হবে এবং তারা নতুন চিন্তার অন্বেষণ, আবিষ্কার এবং জনগণ হিসেবে তাদের পরিপূর্ণ বিকাশের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলবে। তাঁর কথা ছিল, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বসবাসরত সক্রিয় জনগোষ্ঠীর হাত ধরেই স্বাধীনতার সর্বোত্তম সুরক্ষা সম্ভব। মিল যে তিন ধরনের স্বাধীনতার কথা বলেছেন, তার মধ্যে প্রথমটি হলো চিন্তা ও আবেগের স্বাধীনতা, যার মানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। মিলের বক্তব্য হচ্ছে, শাসনক্ষমতার অতিগুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে অনিবার্য শর্ত হিসেবে একটি সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকা দরকার, যেখানে জনগণের সম্মতির বিষয়টি জনগণের প্রতিনিধিদের ওপর বহাল থাকে। অর্থাৎ ক্ষমতায় যাঁরা থাকবেন, তাঁদের ওপর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সংবিধানের মধ্যেই থাকা দরকার।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের কাজের সংক্ষিপ্তসার থেকে দেখা যায়, গণতন্ত্রের চারটি মৌলিক আদর্শ রয়েছে—জনগণের সার্বভৌমত্ব, প্রতিনিধিত্ব, দায়বদ্ধতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

সার্বভৌমত্বের মানে জনগণই সরকার প্রতিষ্ঠা করবে এবং সরকার জনগণের ইচ্ছার অধীন হবে। এ ধারণা শুধু স্বৈরাচারী ক্ষমতা বা অভিজাততন্ত্রের শাসনই অস্বীকার করে, তা-ই নয়; বরং আইনের শাসনের দিকেই ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ আইনের চোখে সবাই সমান, এটিই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। সার্বভৌমত্ব একটি অবিচ্ছেদ্য বিষয়। সুতরাং একে কোনো দৈব ক্ষমতা, উন্নয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা অথবা রাজনৈতিক মতাদর্শের নামে জনগণের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।

প্রতিনিধিত্ব হচ্ছে শাসকের প্রতি শাসিতের সম্মতি প্রদানের উপায়। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে জীবন, স্বাধীনতা ও সুখশান্তির অন্বেষণকে অপরিহার্য অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং ‘এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে সরকার গঠন করা হয়েছে, যা তার ন্যায্য ক্ষমতা শাসিতের সম্মতি থেকে আহরণ করবে।’ শাসিতের সম্মতিই সরকারকে শাসন করার নৈতিক অধিকারের বৈধতা প্রদান করে। ইংরেজ কবি জন মিল্টনের ভাষায়, ‘রাজা ও আধিকারিকদের ক্ষমতা হচ্ছে তা-ই, যা শুধু জনগণের আস্থার ভিত্তিতে, জনগণের সাধারণ মঙ্গলের উদ্দেশ্যে তাদের হস্তান্তর ও প্রদান করা হয়েছে। আর এ ক্ষমতা মূলগতভাবে জনগণের কাছেই থাকে। জনগণের স্বাভাবিক জন্মগত অধিকার লঙ্ঘন না করে তাদের হাত থেকে এ ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া যায় না।’

দায়বদ্ধতা এমন একটি ধারণা, যা একদিকে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের (checks and balances) ওপর ভিত্তি করে বিকাশ লাভ করে; অন্যদিকে সরকারের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে নাগরিকদের ভূমিকা নিশ্চিত করে। দায়বদ্ধতাকে কেবল খাড়াখাড়ি (উল্লম্ব) পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে না। একটি টেকসই ও কার্যকর গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা হচ্ছে উল্লম্ব, আনুভূমিক ও সামাজিক। উল্লম্ব বা খাড়াখাড়ি দায়বদ্ধতা হচ্ছে নির্বাচনব্যবস্থা। আবার সরকারের আনুভূমিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয় আপেক্ষিকভাবে স্বাধীন কিছু ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে, যেগুলো কাজ করে জালের মতো। এগুলো হচ্ছে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত কতগুলো সংস্থা, যেমন দুর্নীতিবিরোধী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সামাজিক দায়বদ্ধতা হচ্ছে নাগরিকদের সংগঠনের কাছে জবাবদিহির ব্যবস্থা।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কেন্দ্রে আছে বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সংঘ গঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতা। মানবাধিকারের অন্যতম উপাদান এটি। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি বেনজামিন কারডোজো ১৯৩৭ সালে এক মামলায় একে অধিকারগুলোর মধ্যে ‘অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী সাংবিধানিক অধিকারগুলোর ‘স্তরবিন্যাস’ আছে আর সেখানে বাক্‌স্বাধীনতা সব সময়ই সবার ওপরে থাকবে। তাঁর মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই মূল, স্বাধীনতার অন্যান্য প্রায় সব রূপের অপরিহার্য পূর্বশর্ত।

গণতান্ত্রিক শাসনের তিনটি উপাদান

গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের মুখোশধারীদের আক্রমণ এখন বৈশ্বিক সমস্যা। একদিকে তাঁরা নিজেদের দাবি করেন গণতন্ত্রী বলে, অন্যদিকে তাঁরাই আবার গণতন্ত্রের মূলনীতি এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গণতন্ত্র, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্বৈরাচারী ব্যবস্থা এবং সরকার বিষয়ে প্রায় চার শ বছরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের আলোচনায় দেখা গেছে যে গণতন্ত্রের চারটি মূল আদর্শ হচ্ছে জনগণের সার্বভৌমত্ব, প্রতিনিধিত্ব, দায়বদ্ধতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু গণতন্ত্র কেবল কতগুলো আদর্শিক নীতিই নয়, বরং এটি শাসনের একটি পদ্ধতিও। একটি শাসনব্যবস্থায় কী কী থাকলে আমরা তাকে গণতান্ত্রিক বলে বিবেচনা করব?

বিংশ শতাব্দীতে যখন অনেকগুলো দেশ গণতন্ত্রকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে থাকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে এই প্রশ্নটাই প্রধান হয়ে ওঠে যে এই মূল আদর্শগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সেটা কী দেখে বোঝা যাবে। তাঁদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয় গণতন্ত্র কীভাবে চর্চা করা হচ্ছে এবং কীভাবে চর্চা করা উচিত। তাঁদের বিবেচনার কেন্দ্রে থাকে শাসনব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রের কথা। এই সব রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর প্রধানতম হচ্ছেন জোসেফ সুম্পিটার, স্যামুয়েল হান্টিংটন, অ্যাডাম প্রেজরস্কি, গিওভান্নি সার্টোরি, হুয়ান লিঞ্জ ও রবার্ট ডাল।

সুম্পিটারের সংজ্ঞা অনুযায়ী গণতন্ত্র হচ্ছে ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যেখানে জনগণের ভোটের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে কোনো ব্যক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করে।’ হান্টিংটনের মতে, ‘গণতন্ত্র হচ্ছে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সর্বাধিক ক্ষমতার অধিকারী সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা নির্বাচিত হয় একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও পর্যায়ক্রমিক নির্বাচনের মাধ্যমে। যেখানে প্রার্থীরা স্বাধীনভাবে ভোটের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং কার্যত সকল প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীই ভোটদানের উপযুক্ত বিবেচিত হয়।’ প্রেজরস্কি ও অন্যরা দাবি করেন, ‘গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দলগুলো নির্বাচনে পরাজিত হয়।’ সুতরাং এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: ১. পূর্বানুমানের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ২. ফলাফল প্রাপ্তির পর অপরিবর্তনযোগ্যতা ৩. পুনরাবৃত্তি। সহজ ভাষায় আমরা জানি না যে কে ক্ষমতায় আসবে, নির্বাচনে একবার তা নির্ধারিত হলে সেটি বদলে ফেলা যায় না এবং এই যে চক্র-অনিশ্চয়তা এবং ফলাফল গ্রহণের প্রক্রিয়া, তা চলতেই থাকে।

রবার্ট ডাল-এর মতে, কোনো ব্যবস্থাকে ‘গণতান্ত্রিক’ হতে হলে তার সাতটি পূর্বশর্ত থাকতে হবে। নির্বাচিত কর্মকর্তারা, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, সর্বজনীন ভোটাধিকার, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রার্থী হওয়ার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের বিকল্প উৎস এবং সংগঠন তৈরির স্বাধীনতা। ডাল জোর দিয়ে বলেছেন যে গণতন্ত্রের জন্য ‘শুধু অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনই নয়, বরং এগুলোকে সত্যিকারভাবেই অর্থপূর্ণ করে তোলার মতো স্বাধীনতাও প্রয়োজন (যেমন সংগঠন গড়ে তোলার স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা)। প্রয়োজন তথ্যের বিকল্প উৎস এবং নাগরিকদের ভোট ও পছন্দের ওপর ভিত্তি করে সরকারি নীতিমালা প্রণয়নের নিশ্চয়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের।’

এই সব গবেষণার ওপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য তিনটি উপাদানকে অপরিহার্য হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। সেগুলো হচ্ছে ১. সর্বজনীন ভোটাধিকার; ২. আইনসভা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদের জন্য নিয়মিত অবাধ, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, বহুদলীয় নির্বাচন ৩. নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, যার মধ্যে মতপ্রকাশ, সমাবেশ ও সংগঠন তৈরির স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, যার অধীনে সব নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা সত্যিকারের আইনি সম–অধিকার ভোগ করবেন। কোনো দেশকে গণতান্ত্রিক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে তার এই তিনটি মানদণ্ডেই উতরাতে হবে। কারণ, এর যেকোনো একটি অনুপস্থিত হলেই অন্যগুলোর উপস্থিতি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

গত কয়েক দশকে যেটা সহজেই লক্ষ করা গেছে, তা হলো, দেশে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গণতন্ত্রায়ণের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচনের ওপর এতটাই জোর দেওয়া হয়েছে যে অনেক অগণতান্ত্রিক দেশ ১৯৯০-এর দশক থেকে নিয়মিতভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে দেখাতে চায় যে তারা গণতন্ত্রের চর্চা করছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন নির্বাচনকে গণতন্ত্র সংহত হওয়া না হওয়ার পরীক্ষা হিসেবেই দেখিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি দেশের গণতন্ত্র স্থায়ী রূপ নিয়েছে কি না, সেটা বোঝা যাবে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে ওই 

দেশ পরপর দুটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে পারছে কি না, যাতে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি হচ্ছে ‘টু টার্নওভার টেস্ট’ (দুবার হাতবদলের পরীক্ষা)। পরাজিতরা ফলাফল মেনে নিয়েছে কি না এবং বিজয়ীরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠানকে পাল্টে দিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের সূচনা করেছে কি না, সেটা গণতন্ত্রায়ণের নির্ধারক পরীক্ষা।

সবার জন্য আইনিভাবে ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং নিয়মিতভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান আপাতদৃষ্টে গণতন্ত্রের দুটি আবশ্যকীয় শর্ত পূরণ করলেও নির্বাচন যদি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক না হয়, তবে সেগুলো আসলে দেশকে গণতন্ত্রের পথে তো অগ্রসর করেই না, বরং উল্টো পথে ঠেলে দেয়। দেখা দরকার যে এই সব নির্বাচন গণতন্ত্রকে সংহত করার বদলে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাকে আরও সংহত করে কি না। নির্বাচনে জালিয়াতির বিভিন্ন ধরনের উপায় এই সব ক্ষমতাসীন বের করেছেন, যেগুলোর কিছু প্রত্যক্ষ আর কিছু হচ্ছে পরোক্ষ। এটাও মনে রাখা দরকার যে নির্বাচন এক দিনের বিষয় নয়, ভোটাররা এক দিন ভোট দেন, কিন্তু নির্বাচনের প্রস্তুতি ও পদক্ষেপ নেওয়া হয় আরও অনেক আগে থেকেই। সেগুলোর মাধ্যমে আগে থেকেই ফল প্রভাবিত করার ব্যবস্থা করা হলে নির্বাচনের দিন কী হলো, তার কোনো মূল্য থাকে না, ভোটাররা তখন নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী হন না। নাগরিকদের অধিকার—কথা বলার, মতপ্রকাশের, সমাবেশের এবং সর্বোপরি এই সবের কারণে আইনি এবং বিচারবহির্ভূতভাবে লাঞ্ছিত না হওয়ার নিশ্চয়তা হচ্ছে গণতন্ত্রের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই তিনটি লক্ষণ কী অবস্থায় আছে, তা নাগরিকেরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন। ফ্রিডম হাউসের ২০২১ সালের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অবস্থান গত বছরগুলোতে ক্রমাগতভাবে খারাপ হয়েছে; মোট স্কোর ২০২১ সালের প্রতিবেদনে দাঁড়িয়েছে ৩৯, যা ২০২০ সালের প্রতিবেদনের স্কোরের সমান; ২০১৯ সালে ছিল ৪১ এবং ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে এই স্কোর ছিল ৪৫। একইভাবে রাজনৈতিক অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতা ক্রমাগতভাবে নিম্নগামী হয়েছে। রাজনৈতিক অধিকারের জন্য বরাদ্দ সর্বোচ্চ ৪০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ১৫, যা ২০১৬ সালেও ছিল ২১। ফ্রিডম হাউস বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থাকে ‘আংশিক মুক্ত’ বলে বর্ণনা করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা সীমিত, তা বোঝা যায় ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ব্যবহার থেকে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই আইনের আওতায় ৮৭৩ ব্যক্তি অভিযুক্ত হয়েছেন, যাঁদের ১৩ শতাংশের বেশি হচ্ছেন সাংবাদিক।

বাংলাদেশের নাগরিকেরা কেমন গণতন্ত্র চান

বাংলাদেশে বিরাজমান শাসনে গণতন্ত্রের মোড়ক থাকলেও মর্মবস্তুর দিক থেকে তা কতটা গণতান্ত্রিক, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায় ক্ষমতাসীন দল তার সমর্থকেরা একেই বাংলাদেশের নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বলে দাবি করেন কিন্তু আসলে বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র বলতে কী বোঝেন, তাঁরা কী চান? আমাদের স্মরণ করতে হবে যে গণতন্ত্রের চারটি মূলনীতি হচ্ছে জনগণের সার্বভৌমত্ব, প্রতিনিধিত্ব, দায়বদ্ধতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা; আর গণতন্ত্রের তিনটি অনিবার্য উপাদান হচ্ছে সবার ভোটাধিকার; আইনসভা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদের জন্য নিয়মিত অবাধ, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, বহুদলীয় নির্বাচন এবং নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা বাংলাদেশের নাগরিকেরা কি এর চেয়ে ভিন্ন কিছু আশা করেন?

বাংলাদেশের নাগরিকেরা গণতান্ত্রিক শাসনের কী রূপ চান, তা বোঝার উপায় হচ্ছে ইতিপূর্বে সম্পাদিত জনমত জরিপের সাহায্য নেওয়া ২০১৭ সালে রিজলভ-এর একটি প্রকল্পের অধীনে (প্রধান গবেষকআলী রীয়াজ ক্রিস্টিন সি ফেয়ার) এপ্রিল মাসের ১২ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত হাজার ৬৭টি পরিবারের মধ্যে আমরা একটি জরিপ চালিয়েছিলাম, যেখানে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি গণতন্ত্রের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল জাতীয়ভাবে প্রতিনিধিত্বশীল এই মুখোমুখি জরিপে আমরা দেখতে পাই যে বাংলাদেশিদের মধ্যে গণতন্ত্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির প্রতি ব্যাপক সমর্থন রয়েছে জরিপটিতে গণতন্ত্রের সূচক হিসেবে চারটি মূল বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ ছিলসম্পত্তির অধিকার, নির্বাচিত প্রতিনিধি, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং মতপ্রকাশ সমাবেশের স্বাধীনতা উত্তরদাতারা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছেন, এর পক্ষে মত দিয়েছেন প্রায় ৯২ শতাংশ উত্তরদাতা ৬৩ শতাংশ একে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ এবং ৩০ শতাংশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন এর প্রায় কাছাকাছি সমর্থন পাওয়া গেছে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে; ৯১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব হচ্ছে গণতন্ত্রের একটি মূলনীতি; ৬১ শতাংশের বেশি এই লক্ষণকে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ এবং ৩১ শতাংশ একে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন

গণতন্ত্রের লক্ষণগুলোর মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংগঠনের স্বাধীনতাকে সমর্থন করেছেন যথাক্রমে ৭৬ শতাংশ ৭৫ শতাংশ উত্তরদাতা উত্তরদাতারা নির্বাচিত নেতৃত্বের পক্ষে জোর সমর্থন দিয়েছেন ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা গণতান্ত্রিক, সেক্যুলার নেতৃত্বের পক্ষে জোর সমর্থন জানিয়েছেন যেখানে ৩৯ শতাংশ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ধর্মীয় নেতার পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন অগণতান্ত্রিক নেতৃত্ব তা সেক্যুলারই হোক বা ধার্মিক, খুব কমই এর পক্ষে সমর্থন প্রকাশ করেছেন এই ফল গণতন্ত্র বিষয়ে মানুষের ধারণা এবং গণতান্ত্রিক শাসনের লক্ষণকে চিহ্নিত করে স্মরণ করা যেতে পারে যে এই জরিপ চালানো হয়েছিল ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের তিন বছরের বেশি সময় পরে ২০১৪ সালের নির্বাচন অবাধ এবং অংশগ্রহণমূলক ছিল না, কিন্তু মানুষের কাছে এই উপাদানগুলোর গুরুত্ব অবসিত হয়নি তাঁরা তখনো এসব বৈশিষ্ট্য দিয়েই গণতন্ত্রকে চিহ্নিত করেন

আমাদের জরিপের এই ফল বিস্ময়কর ছিল না, বরং পূর্ববর্তী জরিপগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণই ছিল ২০০৩ সালের শেষের দিকে ইউএসএআইডি কর্তৃক পরিচালিত একটি জরিপে প্রায় দুইতৃতীয়াংশ উত্তরদাতাই (৬২ শতাংশ) ‘গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত সরকারকেই উপযুক্ত শাসনব্যবস্থা হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন অন্য বিকল্পগুলোর মধ্যেসম্মানিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করে, ইসলামিক আইন দ্বারা পরিচালিত সরকার২১ শতাংশের সমর্থন পেয়েছিল এরপরই আছেকরিতকর্মা সামরিক নেতা কর্তৃক পরিচালিত সরকার’, যা ১১ শতাংশের সমর্থন পায় শতাংশের সমর্থন পায়বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ এবং ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ দ্বারা পরিচালিত অনির্বাচিত সরকার, যারা জানে কোনো দেশের উন্নয়ন কীভাবে করতে হয় এক দশক পরও এই মনোভাব প্রায় একই রকম ছিল ২০১৩ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, ৭০ শতাংশ বাংলাদেশিই গণতন্ত্রকে সমর্থন করছে, যেখানে ২৭ শতাংশকঠোর শাসককে অগ্রাধিকারে দিয়েছে

ইউএসএআইডি পরিচালিত জরিপে উত্তরদাতারা গণতন্ত্রকে অধিক নম্বর দিয়েছেন, ব্যক্তির অধিকার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা হিসেবে (৭৯ শতাংশ), সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য (৬৯ শতাংশ), শৃঙ্খলা সুরক্ষার জন্য (৬৯ শতাংশ), দেশকে একতাবদ্ধ রাখার জন্য (৬৮ শতাংশ) এবং সবাইকে নিজ নিজ উদ্বেগ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক সমস্যাগুলো নিরসন করার জন্য (৫৯ শতাংশ)

গভর্ন্যান্স ব্যারোমিটার সার্ভে বাংলাদেশ ২০১০ (ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত)–এর জরিপে দেখা যায়, ৮০ শতাংশ উত্তরদাতাই মনে করেন, গণতন্ত্রের তাৎপর্যপূর্ণ আদর্শই হচ্ছে নির্বাচন এরপরই আছে অবাধ গণ-বিতর্ক (৭১ শতাংশ), সম্মতির দ্বারা শাসন (৬০ শতাংশ), সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের ক্ষমতা (৫০ শতাংশ) এবং সরকারি কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা (৪০ শতাংশ)

তারও ১০ বছর আগে ২০০০ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেকশন সিস্টেম (আইএফইএস) পরিচালিত একটি জরিপে উত্তরদাতাদের মৌলিক অধিকারগুলোর একটি তালিকা প্রদান করে প্রশ্ন করা হয়, ‘বাংলাদেশে নিম্নোল্লিখিত অধিকারসমূহ সংরক্ষণকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?’ গ্রামীণ অঞ্চলের উত্তরদাতারা ব্যাপকভাবে বেছে নেনযে কেউই ভোটদানের জন্য একাধিক দল প্রার্থীদের থেকে কাউকে বেছে নিতে পারবেএই উত্তরটিকে অন্যদিকে শহুরে অঞ্চলের উত্তরদাতারানিয়মিত নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়াকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হিসেবে নির্বাচন করেন

গণতন্ত্রের লক্ষণগুলোর ক্ষেত্রে ২০০২ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত বৈশ্বিক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশিরা গণতন্ত্রের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করেছেন: জনগণ প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করতে পারবে (৮১ শতাংশ) ; নিরপেক্ষ দ্বিদলীয় নির্বাচন (৭১ শতাংশ) এবং কোনো রকম সেন্সরশিপ ছাড়াই সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারবে (৬৪ শতাংশ)

গণতন্ত্র বিষয়ে বাংলাদেশের নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা, যা প্রায় দুই দশক ধরে অপরিবর্তিতই থেকেছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের বিরাজমান শাসনব্যবস্থার পার্থক্য কোথায়, তা বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই যেকোনো নাগরিকই তা বুঝতে পারেন বিগত ৫০ বছরের ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই যে সামরিক বেসামরিক উভয় ধরনের নেতাদের হাতেই দেশের গণতন্ত্র গুরুতর সংকটে পতিত হয়েছে গণতন্ত্র এখানে ধারাবাহিক অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে বিগত তিন দশকে এবং বর্তমানে তা পশ্চাদ্যাত্রায় শামিল হয়েছে সেই পথ থেকে প্রত্যাবর্তনের জন্য গণতন্ত্রের মূলনীতিগুলোর ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক শাসনের লক্ষণ কী, তা বোঝা দরকার এবং তার ভিত্তিতেই গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর তাদের করণীয় নির্ধারণ করা উচিত

(আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর)