আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

নাগারনো-কারাবাখের ঐতিহাসিক সংযোগ

FOCUS-ENG-20-11-2020

নাগারনো-কারাবাখের সঙ্কটকে যারা আঞ্চলিক রাজনীতির চশমায় দেখার চেষ্টা করছেন, তারা যে বিষয়টা দেখতে পাচ্ছেন না, সেটা হলো ককেসাসে আসলে প্রাচীন মানুষের বাস রয়েছে। রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মস্কোতে মিডিয়ার সাথে আলাপকালে এই কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনইয়ানের বিরুদ্ধে মস্কোর একটা ক্ষোভ রয়েছে, এমন ধারণাকেও নাকচ করে দেন পুতিন। 

পুতিন বলেন, “রাশিয়া আর আর্মেনিয়ার জনগণের মধ্যে বহু শতকের পুরনো সম্পর্ক। আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি হলো সাংস্কৃতিক আর ধর্মীয় মেলবন্ধন, সাথে রয়েছে জোরালো ইতিহাসে, আর এই সম্পর্কটা ব্যক্তি পর্যায়ের সম্পর্কের চেয়েও বড়”।

আসলেও আর্মেনিয়ার সাথে রাশিয়া আর ইরানের সম্পর্কটা বহু পুরনো। ঐতিহাসিকভাবে আর্মেনিয়ার ভূমিকা ছিল ব্যবসায়ীর, অনেকটা ভারতের মারোয়ারিদের মতো। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংযোগবিন্দুর কাজ করতো আর্মেনিয়া। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আর প্রাচীন সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট ছিল এই দেশটি। 

কিন্তু ১৪৫৩ সালে অটোম্যান তুর্কিরা কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করার পর প্রাচ্য পাশ্চাত্যের এই ব্যবসাটা বন্ধ হয়ে যায়। ইউরোপিয় ব্যবসায়ীরা তখন এশিয়ার মধ্যস্থতাকারীদের সাহায্য নিতে বাধ্য হয়। সেখানেই আর্মেনিয়ার ব্যবসায়ীদের সুযোগের দুয়ার খুলে যায়। 

অটোম্যানরা আর্মেনিয়ানদের উপর নির্যাতন করেছিল কিন্তু অন্যদিকে ইরানের সাফাবিদ শাসকরা তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল, এবং আর্মেনিয়ার বনিকদের বিশেষ অধিকার দিয়েছিল। 

আর্মেনিয়ান বসতি স্থাপনকারীদের কখনও পেছনে তাকাতে হয়নি। ষোল শতকের শেষ দিকে এবং সতের শতকের শুরুর দিকে পারস্যের আর্মেনিয়ান বনিকরা খোজায়ুত বা খোজা (ফারসিতে ‘লর্ড’ বা ‘ধনী’) হিসেবে পরিচিত ছিল এবং পৃথিবী তাদের পায়ের কাছে চলে এসেছিল এবং প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মধ্যে রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী হয়েছিল। ইউরোপের অর্থনীতি তখন শক্তিশালী হয়েছিল এবং সেখানে প্রাচ্যের বিভিন্ন পণ্যের প্রচুর চাহিদা তৈরি হয়েছিল। 

আর্মেনিয়ার প্রাচীন ব্যবসায়িক ঐতিহ্য, সম্পদ ও ভৌগলিক অবস্থানের জন্য তাদের সুপরিচিতি সবকিছু কাজে লেগেছে। ব্যবসা একদিকে আর্মেনিয়ানদের মর্যাদা, সমৃদ্ধি আর শক্তির প্রতীক ছিল, অন্যদিকে ইউরোপিয়দের কাছে তারা খ্রিস্টান আর্মেনিয় হিসেবে পরিচিত ছিল, যাদের মাধ্যমে প্রাচ্যের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঠিক রাখতো ইউরোপ। 

আর্মেনিয়দের ব্যবসায়িক চরিত্রের সাথে আরও রয়েছে ভাষাগত দক্ষতা, দর কষাকষির দক্ষতা, এবং মধ্যস্থতা ও সঙ্ঘাত নিরসনের ব্যাপারে বিরল দক্ষতা, যেটা তাদেরকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। 

পারস্যের সম্রাট প্রথম শাহ আব্বাস আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ীদের দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, ইস্পাহানের একপ্রান্তে সিল্ক রফতানি বাণিজ্যে তাদেরকে একচেটিয়া আধিপত্য দিয়েছিলেন তিনি। 

সেটা ছিল আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ীদের সোনালী যুগ, যেটা দেড়শ বছরের মতো স্থায়ী হয়েছিল। ইরানের শাসকরা ধনী আর্মেনিয় ব্যবসায়ীদের এতটাই পছন্দ করেছিল যে, তাদেরকে সেখানকার নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছিল এবং স্বাধীনভাবে খ্রিস্টান ধর্ম পালনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। 

এর কারণটা হলো ইরানের শাসকদের এই বাস্তব জ্ঞান ছিল যে, বিদেশী বাণিজ্য তাদের দেশের জন্য প্রচুর সম্পদ নিয়ে আসবে। বাস্তবেও সেটা হয়েছে। আর্মেনিয় খোজারা নিজেরাই শুধু ধনী হয়নি বরং পারস্যের শাহের কোষাগারও ভরে দিয়েছিল তারা। 

অন্যদিকে, পারস্যের সমর্থনের কারণে আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পেরেছিল। 

তাদের নৌ নেটওয়ার্ক পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপ থেকে নিয়ে রাশিয়া, ভূমধ্যসাগরের পূর্বাংশ, মধ্য প্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, ভারত ও দূর প্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। 

একটা উপনিবেশ, রাষ্ট্রহীন একটা জাতির জন্য ব্যবসায়িক উপস্থিতির মাধ্যমে নিজেদের ‘সাম্রাজ্য’ গড়ে তোলার এটা একটা অসামান্য উদাহরণ। 

এই ‘সাম্রাজ্যের’ চারপাশে রয়েছে ভারতের সুরাট, মাদ্রাজ এবং কলকাতা, তুরস্কের কন্সট্যান্টিনোপল ও ইজমির, রয়েছে মস্কো, ক্রাকৌ, লুও, ভেনিস, আমস্টারডাম এবং আরও বিভিন্ন কেন্দ্র। 

আর্মেনিয়ান বণিকদের আদি বাণিজ্য রুট ছিল অটোম্যান সাম্রাজ্যকে পাশ কাটিয়ে, রাশিয়ার ভেতর দিয়ে। ইরানের ইস্পাহান থেকে তাবরিজ হয়ে শেমাখা দিয়ে এই বাণিজ্য রুট কাস্পিয়ার সাগরে পার হয়ে আস্ত্রাখানে রাশিয়ার ভোলগা নদীর কাছে গিয়ে পৌঁছেছে। সেখান থেকে ভোলগা নদী ধরে কোসত্রোমাকে স্পর্শ করে দক্ষিণে মস্কোর দিকে চলে গেছে। 

নিশ্চিতভাবে মস্কোতে পুতিনের মন্তব্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ‘কালার বিপ্লব’টা কি? রাশিয়ান আর আর্মেনিয়ান জনগণের মধ্যে সভ্যতাকেন্দ্রিক সম্পর্কটা অনেক গভীর। 

রাশিয়ার মতো ইরানেরও ককেসাস অঞ্চলের ব্যাপারে একটা ঐতিহাসিক চেতনা রয়েছে। কৌতুহলের ব্যাপার হলো, ইরান যদিও নাগারনো-কারাবাখে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় সম্পাদিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে, কিন্তু তেহরান আর্মেনিয়া-ইরান সীমান্তে কোন ধরনের ভূখণ্ডগত বিবাদের মুখে পড়বে না। এ ব্যাপারে ইরানের মিডিয়াতেও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। 

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো যাতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য রুটগুলোর উপর বেশি প্রভাব না পড়ে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে ককেসাস অঞ্চল থেকে তুরস্ককে দূরে সরিয়ে রাখার ব্যাপারে রাশিয়া আর ইরান উভয়েরই অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আর ফ্রান্সও এখানে একই ধরনের মনোভাব পোষণ করে।