আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

ভারতের বিদেশী তহবিল আইন: নাগরিক সমাজের ‘মুখ বন্ধ করার হাতিয়ার’

FOCUS-ENG-14-11-2020

মানবাধিকারকর্মীরা ভারতে এনজিওগুলোতে বিদেশী তহবিল তদারককারী ইন্ডিয়ান ফরেন কন্ট্রিবিউশন্স অ্যাক্টের (এফসিআরএ) সংশোধনের সমালোচনা করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিষ্টস (আইসিজে) বলছে, এটি হলো নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর মুখ বন্ধ করার একটি হাতিয়ার।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ব্রিফিং পেপারে আইসিজে জানায়, এফসিআরএ ভারতের নাগরিকদের সুযোগ মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত করছে, ১.৩ বিলিয়ন লোকের দেশে এনজিওগুলোর কাছে অবৈধভাবে বাধার সৃষ্টি করে ভারতে মানবাধিকার রক্ষাকারীদের প্রতি অপ্রয়োজনীয় বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে।

আইসিজে বলছে, এফআরসিএ মত প্রকাশ, শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার অধিকার ও জনসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অংশগ্রহণ করার অধিকার সুরক্ষা করা, শ্রদ্ধা করার ব্যাপারে ভারতের আন্তর্জাতিক আইনগত বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এফআরসিএ আইনে বিদেশী দানের ব্যাপারে বলা হয়েছে, তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।

রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশী দানে বাধা দেয়ার জন্যই ১৯৭৬ সালে এই এই আইনের সূচনা হয়। এখন এই আইনের লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের সমালোচনাকারী অধিকার গ্রুপ ও পরিবেশবাদী এনজিওগুলোকে বিশেষ টার্গেট করে এই সংশোধনী আনা হয়েছে। ভারতে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বিদেশী তহবিল এখনো নিষিদ্ধ।

মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসঙ্ঘ হাই কমিশনার মাইকেল ব্যাচেলেট অক্টোবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে এফসিআরএ ব্যবহৃত হচ্ছে মানবাধিকার নিয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী এনজিওগুলোকে ভয় দেখানো বা শাস্তি প্রদান করা।

আইসিজে উদ্বেগ হলো এই যে এফসিআরএ আইনে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তা নিয়ে। কারণ তা নির্বিচারে ব্যবহার করা যাবে। মনে হচ্ছে, মানবাধিকার রক্ষকদের দমন করার জন্যই এটি করা হয়েছে। কারণ এতে নির্বিচারে গ্রেফতার ও অন্যান্য ধরনের হয়রানির সুযোগ রাখা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি আল জাজিরাকে বলেন, সব সরকারের দায়িত্ব দুর্নীতি প্রতিরোধ করা, কিন্তু আর্থিক নিয়মনীতিকে নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন থেকে বিরত রাখতে প্রয়োগ করা উচিত নয়।

বুধবার ভারত সরকার নতুন যে আইন করেছে, তার ফলে এনজিওগুলোর বিদেশী অর্থ পাওয়ার পথ আরো কঠিন হয়ে যাবে। নতুন আইনানুসারে কোনো এনজিও অন্য এনজিওকে তহবিল হস্তান্তর করতে পারবে না। এছাড়া আধার কার্ড, বায়োমেট্রিক আইটি বাধ্যতামূলক। আর বিদেশী তহবিলের ক্ষেত্রে আগেই অনুমতি নিতে হবে।

মুম্বাইভিত্তিক মানবাধিকার আইনজীবী অনুভব রোস্তোগি বলেন, নতুন অ্যাক্টের সাথে নতুন অ্যাক্টের যোগ হওয়ায় ভারতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জন্য তহবিল পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।

গ্রিনপিস অ্যান্ড অ্যামনেস্টি

অ্যাক্টটি ২০১৫ সালও নাগরিক সমাজকে বাধাগ্রস্ত করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। ওই সময় ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অ্যাক্ট ব্যবহার করে গ্রিনপিস ইন্ডিয়ার এফসিআরসি নিবন্ধন বাতিল করে দেয়। পরিবেশবাদী সংস্থাটির সদস্য প্রিয়া পিল্লাইকে যুক্তরাজ্যে যেতে দেয়া হয়নি। তিনি সেখানে উপজাতীয় লোকজনের ওপর কয়লা খনির বিরূপ প্রভাব নিয়ে কথা বলবেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

অর্থ সঙ্কটে ভুগে গ্রিনপিস ইন্ডিয়া ভারতে তার অফিস গুটিয়ে দেশটি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

মোদি সরকার ২০১৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এফসিআরএর আওতায় বিদেশী তহবিল প্রাপ্ত ২০ হাজারের বেশি এনজিওর লাইসেন্স বাতিল করেছে। গোয়েন্দা সংস্থার ফাঁস হওয়া একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, উন্নয়নকে রুদ্ধ করা সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রিনপিস ও অ্যামনেস্টি।

দলিত ও উপজাতীয়সহ প্রান্তিকদের সাথে জড়িত বেশ কয়েকজন অ্যাক্টিভিস্টকে গ্রেফতার করা হয়েছে মাওবাদীদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের অভিযোগে।

সেপ্টেম্বরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ভারতে তার অফিস বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার তাদের তহবিল বন্ধ করায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

অ্যামনেস্টি অভিযোগ করেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার অব্যাহতভাবে তাদের হয়রানি করে হচ্ছে। 

অধিকারকর্মীরা বলছে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ভারতে ৩০ লাখের বেশি এনজিওর ৪০ ভাগ পর্যন্ত তহবিল থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

তবে ভারত সরকার তার পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলছে, এনজিওগুলো নিয়ম ভঙ্গ করে তহবিল আনছে এবং অনেক সংস্থা দুর্নীতিতে জড়িত।