আমরা লাইভে English রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

আঞ্চলিক নিরাপত্তায় পাকিস্তানের বিজয়ের মুহূর্ত

আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তিক্ততা সৃষ্টির পরও যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে ‘সহিংসতা হ্রাসে’র পরিকল্পনা নিয়ে আফগানদের মধ্যে একটি সাধারণ ঐক্যমত সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে এই পরিকল্পনা কার্যকর হয়েছে।

হতাশার বদলে আশাবাদ জেগেছে। সহিংসতা কমানোর এই পরিকল্পনা একই সুরে স্বাগত জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি, প্রধান নির্বাহী আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ এবং প্রভাবশালী রাজনীতিক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই।

আব্দুল্লাহ’র কণ্ঠে মিলনের সুর, তিনি বলেন: আফগানরা এই চুক্তিকে আমাদের নাগরিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য আন্ত:আফগান আলোচনা, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী নিষ্পত্তির পথে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। দায়িত্বশীল পক্ষ হিসেবে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ঐক্যমত তৈরির লক্ষ্যে সব বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাবো।

২১ ফেব্রুয়ারি দেয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর তালেবানের সঙ্গে আলোচনাকে একটি রাজনৈতিক নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা, আমেরিকান সেনাদের উপস্থিতি কমিয়ে আনা এবং আফগান মাটিতে যেন কোন সন্ত্রাসী গ্রুপ আবারো তৎপরতা চালাতে না পারে তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চালিত বলে উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়, ২৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান চুক্তি সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং এরপর আন্ত:আফগান আলোচনা শুরু হবে, যার মাধ্যমে একটি ব্যাপকভিত্তিক ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রোডম্যাপ অর্জনের চেষ্টা করা হবে। মার্কিন বিবৃতি মতে, ‘একটি সত্যিকারের সুযোগ’ হাতের নাগালে এসেছে।

আলাদা বিবৃতিতে তালেবানও ২৯ ফেব্রুয়ারি শাক্তি চুক্তি সইয়ের কথা বলেছে। তার আগে চুক্তি সইয়ের জন্য এক সপ্তাহ ‘উপযুক্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতি’ তৈরি হবে বলে তারা আশা করে। অবশ্য মার্কিন বিবৃতি থেকে আলাদাভাবে তালেবানরা বন্দি মুক্তির বিষয়টিকে পরিবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে উল্লেখ করে।

তালেবান বিবৃতিতে আন্ত:আফগান আলোচনা বলতে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনা বলে উল্লেখ করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র বা তালেবান – কারো বিবৃতিতেই আশরাফ ঘানির নেতৃত্বাধিন আফগান সরকারকে প্রধান চরিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। এতে বুঝা যায় আসন্ন আন্ত:আফগান সংলাপে ঘানি ও আব্দুল্লাহ দু’জনেই সমান অংশীজন হচ্ছেন।

আফগান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এখনো কোন মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান বা ইরান কেউই ঘানিকে অভিনন্দন জানায়নি। (এই অঞ্চলে ভারতকে গণ্য করা হয়নি।)

সত্যি বলতে কি, এটা হলো পাকিস্তানের বিজয়ের মুহূর্ত। সহিংসতা হ্রাস চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার মাধ্যমে আফগান শান্তি প্রক্রিয়া গতি পেলো।

সময় নষ্ট না করেই আফগান শান্তি চুক্তি’র মূল আয়োজক হিসেবে কৃতিত্ব দাবি করেছে পাকিস্তান, ২৯ ফেব্রুয়ারি এই চুক্তি সই হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশি একে ‘ঐতিহাসিক অচলাবস্থার নিরসন’ হিসেবে উল্লেখ করে এক্ষেত্রে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের বিষয়টি তুলে ধরেন। শুক্রবার ইসলামাবাদে তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তির একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছি।’

ঘানির উপদেষ্টাদের মধ্যে কট্টরপন্থীদের প্রতি ইংগিত করে কোরেশি বলেন, আমি মার্কিন দূত জালমে খালিলজাদ ও এই অঞ্চলে তার মিত্রদের বলেছি যে তাদেরকে ওইসব লোকদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে যারা যুদ্ধ থেকে ক্রমাগত ফায়দা হাসিল করেছে। তারা এই শান্তি প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করতে পারে বলেও মার্কিন দূতকে আমি সতর্ক করেছি।

তাই চুক্তি সই অনুষ্ঠানে ভারতকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তা বেশ অবাক করা বিষয় হবে। কোরেশি জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের উপস্থিতিতে চুক্তি সই হবে। কারণ আমাদের প্রচেষ্টা ছাড়া এই চুক্তিতে পৌছা অসম্ভব ছিলো।

চুক্তির সুফল গোলায় তুলতে পাকিস্তান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এটা হবে মূলত পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হওয়ার মাধ্যমে।

গত বছর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও’র পাকিস্তান সফর প্রসঙ্গে কোরেশি বলেন: পম্পেও আমাকে বলেছেন যে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কে সমস্যা দূর করার পথটি কাবুলের মধ্য দিয়ে আসতে হবে। এখন আমি তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে আমরা আমাদের ওয়াদা রেখেছি। আমরা শুধু শান্তির দল তৈরি করিনি, আলোচনা যেন সফল হয় তা নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রেখেছি।

কোরেশি তার কার্ডগুলো টেবিলে রেখেছেন।

এর ফলে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটবে। আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পাচ্ছি যে এফএটিএফে’র ‘ধুষর তালিকায়’ থাকা নিয়ে পাকিস্তানের মনে কোন খেদ নেই।

খুবই সাধারণ বিষয় হলো গত ২-৩ বছরের প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ আফগানিস্তান যখন পরিবর্তনের একটি সন্ধিক্ষণে উপনীত তখন পাকিস্তানকে শায়েস্তা করার ধকল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সইতে পারবে না।

গত শুক্রবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে চীনা পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র গেং শুয়াং এই ইংগিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, এফএটিএফের বেশিরভাগ সদস্য পাকিস্তানের সন্ত্রাস-বিরোধী আর্থিক ব্যবস্থা জোরদারের ব্যাপক প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে পাকিস্তানকে আরো সময় দেয়া হবে তার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য। এফএটিএফের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো দেশটির প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা, যাতে তারা মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়নের বিরুদ্ধে তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা নিরাপদ থাকে।

আগামীতেও আন্ত:আফগান আলোচনায় পাকিস্তান চালকের আসনে থাকবে। কোরেশি বলেন, ফেব্রুয়ারির পর আমরা আন্ত:আফগান শান্তি প্রক্রিয়া জোরদার করার জন্য একটি প্রতিনিধি দল তৈরি করবো। এবং কখন ও কিভাবে এই আলোচনা শুরু হবে সে ব্যাপারে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পাকিস্তান সর্বান্তকরণে ও সততার সঙ্গে এই প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা রেখেছে, এখন আফগান সরকারকেও একই ভূমিকা পালন করতে হবে।

যেকোন উপায়ে পাকিস্তান নিশ্চিত করবে যেন কাবুলে একটি বন্ধুপ্রতীম সরকার ক্ষমতায় থাকে, যারা ভারতের দ্বারা প্রভাবিত হবে না।