আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

মহাত্মা গান্ধীর খুনি এখন বিজেপির জাতীয়তাবাদের প্রতীক

Screenshot 2021-01-18 074059

মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসে এখন ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। গডসের নামে তৈরি হচ্ছে পাঠাগারসহ আরও কত কি। গান্ধী যে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বিজেপির শাসনামলে ক্ষয়ে পড়েছে। তাঁর হত্যাকারীই তাই নতুন ভারতে পূজিত হচ্ছেন বিজেপির নেতৃত্বে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটির দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি হান্নাহ এলিস-পিটারসেন প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরেছেন, ভারতে বিজেপির নেতৃত্বে হিন্দু জাতীয়তাবাদ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আর সেই জাতীয়তাবাদী ধারণা ছড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে দেশটির জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারীকে। নাথুরাম গডসের ভাবমূর্তিকে মহান করে তোলার চেষ্টা চলছে।

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীকে গুলি করেছিলেন নাথুরাম গডসে। খুব কাছ থেকে ৩টি গুলি করেন তিনি। হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন গডসে। গডসে বিশ্বাস করতেন, দেশভাগে সমর্থন দিয়ে মহাত্মা গান্ধী ভারতের হিন্দুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। দেশভাগের কারণেই পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল এবং এর মধ্য দিয়ে মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ হওয়ার পথ তৈরি হয়েছিল বলে মনে করতেন নাথুরাম গডসে। গান্ধীকে হত্যার দায়ে ১৯৪৯ সালে গডসের ফাঁসি হয়।

এর পরবর্তী দশকগুলোতে গডসে একজন সন্ত্রাসী ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে ভারতে চিহ্নিত হয়ে আসছিলেন। জাতির পিতার হত্যাকারী হিসেবে ভারতে ঘৃণিত ছিলেন তিনি।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যখন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির মাধ্যমে হিন্দু জাতীয়তাবাদ কট্টর রূপ থেকে ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে নাথুরাম গডসের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টাও শুরু হয়ে যায়। বর্তমানে জনসাধারণের চোখে গডসের ভাবমূর্তি একজন বিশ্বাসঘাতক থেকে ধীরে ধীরে দেশপ্রেমিক সত্তার প্রতি ঝুঁকছে।

২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মহাত্মা গান্ধীর ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে।

গত রোববার ভারতের দিল্লির ২০০ মাইল দক্ষিণে গোয়ালিয়রে নাথুরাম গডসের নামে একটি পাঠাগার উদ্বোধন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে বিশাল জনসমাগম হয়েছিল। এর আয়োজক ছিল হিন্দু মহাসভা নামের একটি সংগঠন। এর সাধারণ সম্পাদক দেবেন্দ্র পান্ডে বলেন, ‘মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করে ঠিক কাজটিই করেছিলেন গডসে।’ দেবেন্দ্র মনে করেন, ভারতকে হিন্দু দেশ হিসেবে ঘোষণা করা উচিত এবং দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

নাথুরাম গডসেকে দেশপ্রেমিক মহান ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অসংখ্য পদক্ষেপের একটি উদাহরণ হলো তাঁর নামে এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির রুটগারস ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষক অড্রে ট্রুশ্চকে বলেন, ‘গডসেকে মহান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা এবং সহিংস আচরণকে গৌরবময় করে দেখানো—এই দুটোই বিজেপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। গত দশকের শেষ থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং কিছুদিন ধরে ভারতে তা গতি পেয়েছে। ভারতের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী এখন এটি গ্রহণ করতেও ইচ্ছুক এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রতি সাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’

ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ বলেন, ‘বিজেপি সব সময় গান্ধীকে অপছন্দ ও অবিশ্বাস করে এসেছে। দলটির সদস্যদের মধ্যে নাথুরাম গডসের প্রশংসা করার প্রবণতা আছে।

বিজেপি মনে করে, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতি ভারতকে দুর্বল করে দিয়েছে। গান্ধী মনে করতেন মুসলমানদের ভারতে সমান অধিকার আছে। এতেও আস্থা নেই বিজেপির। বিজেপি এখন রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনেক শক্তিশালী অবস্থায় আছে। এ পরিস্থিতিতে এটি মোটেই আশ্চর্যের নয় যে তারা নাথুরাম গডসের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে কাজ করবে এবং তা জনসমক্ষে প্রচার করবে।’