আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে ভুল

FOCUS-ENG-29-09-2020

“কর্মপদ্ধতিবিহীন কৌশল বিজয়ের গতি কমিয়ে দেবে। কৌশলবিহীন কর্মপদ্ধতি পরাজয়ের আগে একটু তোড়জোড় মাত্র”। - সান জু, চীনের সামরিক জেনারেল ও কৌশলবিদ, খৃষ্টপূর্ব ৫ শতাব্দি। 

১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী শেখ হাসিনা যেভাবে কোভিড-১৯ মোকাবেলা করেছেন, সেটা নিয়ে মন্তব্য করেন এসপার। 

বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, তারা একইসাথে “অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্রশান্ত গড়ার অভিন্ন প্রতিশ্রুতি নিয়ে কথা বলেন, যেখানে সব দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হবে”। এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে নৌ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং বৈশ্বিক শান্তি রক্ষা। 

দূতাবাস আরও জানিয়েছে যে “দুই নেতা আরও ঘনিষ্ঠ দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন”।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী যে সময়টাতে টেলিফোন করলেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির ঘাটতি ছিল বা বাংলাদেশ নিয়ে তাদের তেমন তৎপরতা ছিল না। 

যুক্তরাষ্ট্র তাদের গত কয়েক দশকের পররাষ্ট্রনীতি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-কেন্দ্রিক করে তুলেছে, যেখানে তারা ইসরাইলের স্বার্থকে রক্ষা করছে। এই প্রক্রিয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে তারা যে নীতি বাস্তবায়ন করেছে, সেটাকে ব্যর্থই বলা যায়। 

কোয়াড

এরপর এলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোয়াড্রিল্যাটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ, যেটা কোয়াড নামেই বেশি পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান আর ভারতের জোট এটা। কোয়াডের মূল উদ্দেশ্য চীনের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি আর গতিশীলতার বিরুদ্ধে একটা ভারসাম্য তৈরি করা। 

ট্রাম্প প্রশাসন স্বাভাবিকভাবেই চীনের প্রভাবিত একটা এশিয়া দেখতে চায় না, যে চীন তার বেল্ট অ্যাণ্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছে যে, চীনের সাথে বাণিজ্যে সমস্যা নেই কিন্তু চীনের প্রভাব বাড়তে থাকলে সেটা এ অঞ্চলে তাদের স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। 

সে কারণে চীনকে মোকাবেলার জন্য একটা নিরাপদ ও সুরক্ষিত এশিয়া প্রয়োজন। সে কারণে বিশেষ নৌ সীমার মধ্যে কোয়াডের অধীনে সমন্বয় গড়ে তোলা হচ্ছে। 

এই চিন্তা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছে যে, বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম শিল্প শক্তি ভারতকে বন্ধু করতে হবে এবং তাদের বেশি করে সহায়তা দিতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করেছে যে, ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষার জন্য সমর্থন করতে হলে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র দেশগুলোর উপর ভারতের কর্তৃত্ব তৈরি হবে। 

বাংলাদেশের তাৎপর্য

এই জায়গাটাতেই বাংলাদেশের গুরুত্ব। এটা অনস্বীকার্য যে ভারত আর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। তাছাড়া, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিল। সত্যি বলতে কি এ জন্য বাংলাদেশকে বহুবার মূল্য দিতে হয়েছে। 

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিগত ১২ বছরে ভারত তার এই ছোট প্রতিবেশী দেশের উপর আধিপত্যবাদী ও সুবিধাবাদী শক্তি খাটিয়েছে, বিশাল বাণিজ্য বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, পানি বন্টনে অনীহা প্রদর্শন এবং নিরপরাধ বাংলাদেশীদেরকে সীমান্তে হত্যা করেছে। 

এর সাথে বলতে হবে যে, ভারতের আধিপত্য আর প্রভাব বাংলাদেশের জন্য মোটেই কোন লাভজনক বিষয় হয়নি। বাংলাদেশীদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করে ভারতের সাথে সম্পর্কটা মূলত একপেশে, ভারত যা দিচ্ছে তার চেয়ে বহুগুণে নিয়ে যাচ্ছে। আবার বাংলাদেশ সরকারের প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা হস্তক্ষেপ করছে বা নাক গলাচ্ছে। 

চীনের ভূমিকা

২০১৬ সালে বাংলাদেশের জন্য চীন যে বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রকাশ করে, সেটা দৃশ্যপট বদলে দেয়। ২৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে দুই দেশ, যার অধীনে বাংলাদেশে ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে চীন। তাছাড়া, চীনা আর বাংলাদেশী কোম্পানিগুলো ১৩টি যৌথ প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে, যার মূল্য প্রায় ১৩.৬ বিলিয়ন ডলার। 

বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে একটা বিতর্কের বিষয় হলো তিস্তার পানি চুক্তি। বহু বছর ধরে এটা নিয়ে দর কষাকষি চলছে। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে সবসময় আশাবাদী থাকলেও ভারত হয় প্রতিশ্রুতি রাখেনি অথবা প্রতারণা করেছে। 

তিস্তার নাব্যতা সঙ্কট নিয়ে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ভারত পানি না দেয়ায় নদীগুলোর পানির প্রবাহ শুকিয়ে গেছে। ভারতের বেশ কয়েকটি সরকার এ সংক্রান্ত চুক্তি করতে পারেনি। 

বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট আরও কিছু প্রকল্পের সাথে পানির রিজার্ভ গড়ে তোলার জন্য প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে রাজি হয়েছে, যেটা করা গেলে শুকনা মওসুমেও পানি পাওয়া যাবে। 

এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায় যে, ভারত কিভাবে বহু বছর ধরে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সংহতির ক্ষতি করছে। চীন সে কারণে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হয়ে এসেছে কারণ তারা অবকাঠামো নির্মাণে সাহায্য দিতে গিয়ে কোন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। 

ভারতের সাথে সমস্যা

ভারত যদিও বাংলাদেশে নিজেদের স্বার্থেই গভীরভাবে জড়িত, তবে এখানে তাদের সমস্যাও রয়েছে। গত ছয় বছর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সময়কালে এই সমস্যা প্রকট হয়েছে। 

বিজেপির ইসলামবিদ্বেষী দিক ছাড়াও নয়াদিল্লীর সরকার আরও সমস্যা তৈরি করেছে। 

ছয় বছর মোদি ভারতের অর্থনীতির বড় ধরনের ক্ষতি করেছেন এবং বেকারত্বের হার বহু বেড়ে গেছে। চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশকে দূরে রাখার জন্য ভারত সবসময় ঋণের ফাঁদের ভয় দেখিয়ে এলেও তারা নিজে একটি ব্যাংক থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে, যেটার সবচেয়ে বড় অংশীদার হলো চীন। 

তাছাড়া মুসলিমদের ব্যাপারে ভারতের অসহিষ্ণুতা, এবং বাংলাদেশীদেরকে বিজেপি ‘উঁইপোকা’ আখ্যা দেয়ায় বাংলাদেশে বিষয়টা ভালোভাবে নেয়া হয়নি। 

যুক্তরাষ্ট্র

মার্ক এসপার ও শেখ হাসিনার ফোন কলের ব্যাপারে বলা যায়, মনে হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে শুরু করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগতভাবে তারা ভুল করেছে এবং ভুল ঘোড়ার উপর তারা বাজি ধরেছে। ভারত চীনের বিরুদ্ধে আর কোন ভারসাম্য তৈরি করছে না। এই অঞ্চলের সবগুলো ছোট দেশ – নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা বা বাংলাদেশ – সবার সাথেই চীনের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। 

সে কারণে ভারতের ব্যর্থতার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো জেগে উঠতে শুরু করেছে এবং বাংলাদেশকে তারা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে, দুই দেশেরই একসাথে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করা উচিত। এটা একটা রাজনৈতিক গলাবাজী মাত্র এবং ঘুরিয়ে বলা যে, ‘চীনের কাছাকাছি যেও না’।

সান জু’র যে উদ্ধৃতিটা শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেখা যাচ্ছে, সেটা এমনকি ৫০০০ বছর পরও সত্যি প্রমাণিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে কোন কৌশল বা কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেনি। ছোট দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সবগুলো ডিম তারা ভারতের ঝুড়িতে রেখেছে। বোকার মতো তারা ভেবেছে যে, এটা করে তারা হয়তো চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। 

যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তার প্রতিপক্ষকে ভালোভাবে বুঝতে হবে, এবং তাকে খাটো করা চলবে না।