আমরা লাইভে English বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২১

‘এটি আমাদের সংস্করণের করোনাভাইরাস, আমরা অসুস্থ’: দিল্লির দাঙ্গা নিয়ে অরুন্ধতী রায়

অরুন্ধতী রায়

ভারতের নয়াদিল্লিতে ঘটে যাওয়া সহিংসতা এবং দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বদলে দেওয়ার প্রয়াস সম্পর্কে খ্যাতিমান লেখক ও সাম্রাজ্যবাদের কঠোর সমালোচক অরুন্ধতী রায় বলেছেন, ‘এটি আমাদের সংস্করণের করোনাভাইরাস। আমরা সবাই অসুস্থ।’ দিল্লির যন্তর মন্তরে রোববার এক সমাবেশে দেওয়া বক্তৃতায় এ কথা বলেছেন তিনি।

প্রিয় বন্ধু, কমরেড ও আমার সহকর্মী লেখকদের উদ্দেশ্য করে বক্তব্য শুরু করেন অরুন্ধতী রায়।

তিনি বলেছেন, ‘যে জায়গায় আজ আমরা সমবেত হয়েছি, সেখান থেকে ওই এলাকাটি খুব দূরে নয়। বাসে চড়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে যাওয়া যাবে, যেখানে চার দিন আগে একটি ফ্যাসিস্ট সংঘাত ঘটে গেছে, যা কিনা শাসক দলের সদস্যদের বক্তব্যের কারণে সৃষ্ট হয়েছিল, পুলিশ তাতে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছে, ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমগুলোর একটি বড় অংশ তাতে ক্ষণে ক্ষণে সমর্থন দিয়ে গেছে এবং এই সংঘাতের পেছনে এমন বিশ্বাসও ছিল যে আদালত তাদের পথে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এভাবেই উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে শ্রমিকশ্রেণির কলোনিতে মুসলিমদের ওপর সশস্ত্র ও প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়েছে।’

আরও পড়ুনঃ মোদির নতুন আটক ক্যাম্পগুলোতে শেষ হতে পারে লাখ লাখ লোকের জীবন

দিল্লির এই সহিংস পরিস্থিতির কিছুটা বর্ণনাও দিয়েছেন অরুন্ধতী। তিনি বলেন, ‘বাজার, দোকানপাট, বাড়িঘর, মসজিদ ও যানবাহন পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। রাস্তাঘাটে পড়ে আছে অসংখ্য পাথর ও ধ্বংসস্তূপ। হাসপাতালগুলো আহত ও মরণাপন্ন মানুষে ভর্তি। মর্গগুলো মৃতদেহে পূর্ণ। মৃতদেহের মধ্যে মুসলিম, হিন্দু, পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যও আছেন। হ্যাঁ, সব পক্ষের মানুষই নিজেদের নিষ্ঠুর দিকটি ফুটিয়ে তুলেছে এবং একই সঙ্গে অভাবিত সাহস ও দয়ার চেহারাও দেখিয়েছে।’

নির্বাচনের আগ দিয়ে এ ধরনের সহিংসতা প্রায়ই দেখা যায় বলে উল্লেখ করেন অরুন্ধতী রায়। তিনি বলেন, ‘এবারকার মতো সংঘাত ও সহিংসতা এর আগে দেখা গেছে, নির্বাচনের আগ দিয়ে এমন হয়। ভোটের পরিবেশে মেরুকরণ আনার জন্য বর্বর নির্বাচনী প্রচার চালানো হয়। কিন্তু দিল্লিতে যে হত্যাযজ্ঞ হয়েছে, তা ঠিক নির্বাচনের পরপরই ঘটেছে। এই নির্বাচনে বিজেপি-আরএসএসকে অপমানজনক পরাজয় হজম করতে হয়েছে। এটি দিল্লির জন্য একটি শাস্তি এবং আসন্ন বিহার নির্বাচনের জন্য একটি ঘোষণা।’

নয়া দিল্লিতে মোহাম্মদ যুবাইরকে নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছে গুন্ডারা, ২৪ ফেব্রুয়ারি

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে অরুন্ধতী বলেন, এই আইন পুরোপুরি অসাংবিধানিক এবং মুসলিমবিরোধী। এনআরসির সঙ্গে মিলে সিএএ শুধু মুসলিম নয়, বরং যেসব কোটি কোটি ভারতীয়র নাগরিকত্বের প্রামাণ্য দলিল নেই, তাদের অবৈধ আখ্যা দিচ্ছে এবং অপরাধী বানাচ্ছে।

অরুন্ধতী রায় মনে করেন, এনপিআর-এনআরসি-সিএএ নামের আইনগুলোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে সাধারণ জনগণকে বিভক্ত করা ও তাদের মধ্যে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেওয়া। আর এই বিভক্তি ও অস্থিতিশীলতা শুধু ভারত নয় বরং পুরো উপমহাদেশেই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে থাকা হিন্দুধর্মাবলম্বীরা হুমকির মুখে পড়ছেন, যাঁদের বিষয়ে ‘সচেতন’ থাকার ভান করছে বিজেপি-আরএসএস। আসলে নয়াদিল্লিতে সম্প্রতি যে গোঁড়ামির ঘটনা দেখা গেছে, তার প্রতিক্রিয়ায় তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ভুগতে পারেন।

আরও পড়ুনঃআঞ্চলিক নিরাপত্তায় পাকিস্তানের বিজয়ের মুহূর্ত

অরুন্ধতী বলেছেন, ‘যে গণতন্ত্র সংবিধান দ্বারা চালিত হয় না এবং যার সব কটি সংস্থা বিবর্ণ হয়ে পড়ছে, সেটি অবশ্যই একটি সংখ্যাগরিষ্ঠের রাষ্ট্র হয়ে ওঠে। আপনি একটি সংবিধানের পুরো বা আংশিক বিষয়ের সঙ্গে একমত হতে পারেন, আবার দ্বিমত পোষণও করতে পারেন। কিন্তু সংবিধান নেই-ই, এমন আচরণের মধ্য দিয়ে এই সরকার গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। হয়তো এটিই লক্ষ্য ছিল। এটি আমাদের সংস্করণের করোনাভাইরাস। আমরা সবাই অসুস্থ।’

অরুন্ধতী মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরো ভারতের শাসনব্যবস্থাই ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি বলেন, এই অবস্থায় সাহসী সাংবাদিক, আইনজীবী ও লেখক-কবি-চিত্রশিল্পী-চিত্র নির্মাতাসহ সব শিল্পীকে মুখ খুলতে হবে, এগিয়ে আসতে হবে। কারণ অনেক কাজ করা যে বাকি।