আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

বলিউডের এক তারকার মৃত্যু মোদির ভারতে জীবন সম্পর্কে যা বলে

c48bddad8e5aab041a3f754ca28be78e-1
ওয়াক অব শেম-এ টিভি অ্যাঙ্কর সুধীর চৌধুরী ও অর্নব গোস্বামীর নাম

ভারত বুধবার আরেকটি ভয়াবহ মাইলফলক অতিক্রম করেছে। চার মিলিয়ন মাইলফলক ছাড়ানোর দুই সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যেই দেশটিতে করোনাভাইরাসে শনাক্তের সংখ্যা পাঁচ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। একই দিন মৃতের সংখ্যা পৌঁছে গেছে ৮২,০৬৬-এ, নতুন মৃত্যু ঘটেছে ১,২৯০। এটি একক কোনো দিনে সর্বোচ্চ।

দেশের সীমান্তে আগ্রাসন ঘটছে, কৃষক আত্মহত্যা বাড়ছে, বেকারত্বে রেকর্ড গড়ছে, অর্থনীতির পতন হতাশা বাড়াচ্ছে।

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এসব ইস্যুর দিকে নজর দেয়ার বদলে ভারতের মিডিয়া এখন বলিউড মুভি স্টার সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যা নিয়ে অন্ধভাবে মত্ত রয়েছে।

একটি খুনের সত্যহীন কাহিনী আর তার গার্লফ্রেন্ড ২৮ বছর বয়স্ক অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তীর ছলাকলার শিকার জটিলতার মধ্যে পড়ে ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত টেলিভিশন নিউজ অ্যাঙ্করেরা ঘোষণা করেছেন যে সুশান্তের মৃত্যু্ ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ঘটনা।’

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার পোষা ময়ূরকে নিজ হাতে খাওয়ানোর ভিডিও প্রকাশের জন্য এমন এক সময়কে বেছে নিয়েছেন যখন বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯-এ ভারত দুই নম্বর স্থানে ওঠে এসেছে। এটি রোম নগরী পুড়ে ছাই হওয়ার সময় রোমান সম্রাট নিরোর বাঁশি বাজানোর কিংবদন্তির কথাই মনে করিয়ে দেয়। 

মোদি অনেকবারই অপ্রাসঙ্গিক তবে মুখরোচক খবরের পেছনে লুকিয়েছেন। আর তা প্রায়ই তার সমর্থকদের ড্রাগ মাফিয়ায় বলিউড সেলিব্রেটিদের কথিত সম্পৃক্ততা, গোশত খাওয়ার জন্য মুসলিমদের হত্যা করার মতো গুজবভিত্তিক সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়ানোর কাজে ইন্ধন দিয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে দিল্লীতে ৪০ জনের বেশি মুসলিমকে নৃশংসভাবে হত্যার সময় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির অর্থে অনলাইন ট্রল করার মোদির বাহিনী ওই ঘটনাকে সমান শক্তির দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যকার সঙ্ঘাত হিসেবে অভিহিত করে। প্রভাবশালী টেলিভিশন সাংবাদিকেরা সত্যকে বিকৃত করতে সহায়তা করে, বিভ্রান্তি সৃষ্টির কৌশল অবলম্বন করে এবং সেইসাথে বিজেপির চরম হিন্দু এজেন্ডা এগিয়ে নেয়ার কাজটিও করতে থাকে।

তবে ২০১৬ সালের দুর্ভাগ্যপীড়িত নোট বাতিলকরণ নাটক, সংখ্যালঘুদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে অভিহিত করা জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের মতো অব্যবস্থাপনাগত সিদ্ধান্তের কারণে এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি মোদির জন্য খুবই দরকারি বিষয়। সম্ভবত মোদির সবচেয়ে বড় সাফল্য নিহিত রয়েছে এসব কাজ এত ব্যাপকভাবে করার দক্ষতার ওপর। সরকারি সংবাদ সম্মেলনের অস্তিত্ব নেই। সামাজিক মাধ্যম বা বিরোধী রাজনীবিদ ও সাংবাদিকদের আসা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা হয়ে থাকে।

আর আছে ভিন্নমত দমনের মারাত্মক প্রয়াস। এটা কেবল পেশাদার ট্রলের মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে নৃশংসভাবে অপব্যবহারের মাধ্যমেই আসছে না। ভারতীয় পুলিশ ও বিচার বিভাগও সরকারের কাছে নতজানু হয়ে রয়েছে। তারা বিরোধীদের চুপ করিয়ে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করছে, নির্বিচারে গ্রেফতার করছে। অথচ একই সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়িতদের দায়মুক্তি দিয়ে আসছে।

তরুণ শিল্পীদের নতুন ধরনের প্রতিবাদ দেখতে পাওয়াটা হৃদয়বিদারক। ভারতীয়রা প্রকাশ্য ভিন্নমত প্রকাশকে পছন্দ করে না। এখন গেরুয়া রাজনীতির কঠোর মুঠোর মধ্যে তরুণরা অবশেষে কথা বলতে শুরু করেছে।

ভিন্নমতের নতুন ধারাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘ওয়াক অব শেম।’ টেলর নামে পরিচিত মুম্বাই পথশিল্পীদের সৃষ্ট এটি হলো ভারতের সবচেয়ে নির্লজ্জ ব্যক্তিদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ। 

এখন পর্যন্ত অর্নব গোস্বামী, অমিশ দেবগন ও সুধীর চৌধুরীসহ নিউজ মিডিয়া সুপারস্টার, বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র সম্বিত পাত্র, বলিউড অভিনেত্রী কঙ্গনা রানয়াউত এই অনন্য প্রতিবাদের শিকার হয়েছেন। এসব শিল্পকর্ম মুছে ফেলা সম্ভব হলেও সামাজিক মাধ্যমে মোছা যায় না।

মতভিন্নতা প্রকাশের আরেকটি উদাহরণ হলো হাজার হাজার নেটিজেনের অনলাইনে প্রচারিত মোদির মান কি বাত বক্তৃতার প্রতি ডিসলাইক দেয়া। তাদের প্রতিবাদ এতই সরব ছিল যে প্রধানমন্ত্রীর অফিস ভিডিওর মন্তব্য সেকশনকেই ডিসঅ্যাবল করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

এছাড়া কমিকস ও অ্যামেচার কার্টুনিস্টরা ব্যাঙ্গ করার মাধ্যমেও সরকারকে খেলো প্রমাণ করছে। অযোধ্যার নাটক, মোদির পোষা ময়ুরকে খাওয়ানো- সবকিছু নিয়েই সরব হচ্ছে। জাতীয় মিডিয়া যা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তারা তাই করে দেখাচ্ছে।

তবে নাগরিক নিবন্ধন আইনের বিরোধিতা করে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমরা যেভাবে নির্যাতিত হয়েছে, এসব কমেডিয়ান ও শিল্পীও নাজেহাল হচ্ছে। তাদের অনেকে খুনের হুমকি পর্যন্ত পাচ্ছে। 

কিন্তু তবুও তারা থেমে নেই। গত বৃহস্পতিবার তারা দুর্দান্তভাবে তাদের রসবোধের পরিচয় দিয়েছে। ওই দিন ছিল মোদির জন্মদিন। আর তারা ওই দিনটিকে ‘জাতীয় বেকার দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। আর ভিন্নমতের এই কণ্ঠস্বরই ভবিষ্যতের জন্য ভারতের সবচেয়ে বড় আশা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

 

লেখক: ভারতীয় ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, বর্তমানে কুয়ালামপুরে থাকেন