আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

নেপালে ওলির সঙ্গে ভারতের প্রভাবও নিচের দিকে নামছে

TOP NEWS-ENG-03-07-2020

নেপাল-ভারত সম্পর্ককে ‘ঘনিষ্ঠতা থেকে বিতৃষ্ণা’ সৃষ্টির উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কটা বহুমুখী এবং অনন্য। তাদের মধ্যে পার্থক্যের চেয়ে অভিন্নতাই বেশি। আর তাদের একসাথে চলার ইতিহাসও অনেক দীর্ঘ। 

দুই দেশেরই জনসংখ্যার ৮০ শতাংশের বেশি হিন্দু। তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সভ্যতা ও ধারাগুলোও অভিন্ন। নেপালের বিদেশী বাণিজ্যের ৭০ শতাংশই হলো ভারতের সাথে। নেপালের মুদ্রার মান ভারতের মুদ্রার সাথে জড়িত। নেপালের ৭৭টি জেলার মধ্যে এক-চতুর্থাংশেরই ভারতের সাথে সীমান্ত রয়েছে এবং এই সব জায়গায় দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে বিয়ের বিষয়টিও খুবই স্বাভাবিক। নেপালের নদীগুলো দিয়ে প্রবাহিত অবাধ পানি দিয়ে ভারতের মাটিতে সেচকাজ চালানো হচ্ছে। 

মনে হচ্ছে, দুই দেশের একসাথে সমৃদ্ধির জন্য বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু একই সাথে এটাও সত্য যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আশ্বাস সত্বেও ভারতের গ্রহণ করা অনেকগুলো প্রকল্প – যার মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পই সবচেয়ে বেশি– অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ২০১৪ সালে ভারতের ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র তিন মাস পরেই নেপালে প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরে এসে মোদি বলেছিলেন, ভারত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ শেষ করবে। তবে দুই দেশের ‘একসাথে সমৃদ্ধি অর্জনের’ সম্ভাবনা এখনও অধরাই রয়ে গেছে। 

আরও পড়ুনঃ হিমালয়ে ভারতের বিরুদ্ধে বেতার তরঙ্গের যুদ্ধ

দুই দেশ তাদের সম্পর্কের মধ্যে অনেক উত্থান-পতন দেখেছে। স্থলবেষ্টিত দেশ নেপাল এ পর্যন্ত তিনবার অর্থনৈতিক অবরোধের শিকার হয়েছে। প্রথম অবরোধ আসে সত্তর দশকের শুরুর দিকে। দ্বিতীয়বার অবরোধ আরোপ করা হয় ১৯৮৮-৮৯ সালে, যেটা ১৮ মাস স্থায়ী হয়েছিল। চীনের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার কারণে ওই অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল। তৃতীয়বার ভারত অবরোধ আরোপ করে ২০১৫ সালে। সীমান্ত এলাকার কিছু মানুষ– যাদেরকে ‘ভারতীয় বংশোদ্ভুত’ দাবি করা হয়– তাদের অধিকার রক্ষার জন্য দিল্লির পরামর্শ না শোনার কারণে ওই অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল। নেপাল বলেছিল, নেপালিরা যেখানেই থাকুক তাদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি নেপালের বিবেচ্য, প্রতিবেশীদের অধিকারের বিষয়ে তাদের সেই দায়িত্ব নেই। 

এই বিবাদের ধারাবাহিকতায় ১৩৪ দিনের অবরোধ আরোপ করা হয় নেপালের উপর। ফলে নেপালে পেট্রোলিয়াম পণ্য, ওষুধ ও অন্যান্য দরকারী সরঞ্জামাদির প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি দ্রুত পদক্ষেপ নেন এবং ভারতের উপর একক নির্ভরতার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত চীনের সাথে বাণিজ্য ও ট্রানজিট চুক্তি করেন। 

Lifts-Top News-Bangla-4 July  2020-1

প্রথমবারের মতো ভারত উপলব্ধি করেছে যে, নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ২০০৫-০৬ সালের পরে হস্তক্ষেপের মাত্রা নির্লজ্জ মাত্রায় চলে গিয়েছিল। ২০১৭ সালে ভারতের উপদেশকে পাত্তা না দিয়ে চীনের সাথে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের অধীনে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। রাজনৈতিকভাবে, বিশেষকরে অবরোধকালে বলিষ্ঠতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করায় রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছিলেন ওলি। ২০১৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি ক্ষমতায় ফিরে আসেন। কিন্তু একই সাথে ভারত-বিরোধিতাকে তিনি যেন একটা মন্ত্র হিসেবে নিয়েছেন এবং ভেবেছেন, সবসময় এতে সুবিধা পাওয়া যাবে। 

ভারতকে নিয়ে ওলি সম্প্রতি যে সমালোচনা করেছেন, ২০১৫ সালের অবরোধ সময়ের চেয়ে এটা ছিল অনেক বেশি প্রবল। তিনি বলেছেন যে, ভারত তার সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা করছে। কাঠমাণ্ডুর ভারতীয় দূতাবাস এবং তার বিরোধী কিছু নেপালি রাজনীতিবিদের দিকে এখানে ইঙ্গিত করেছেন তিনি। 

ক্ষমতাসীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির সমালোচনার কেন্দ্রে এখন ওলি। ভারতকে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে এমন সময় তুলে ধরলেন তিনি, যখন দলের ক্ষমতাধর স্ট্যান্ডিং কমিটি দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কড়া সমালোচনা করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। ভারত তার প্রতিপক্ষের সাথে ষড়যন্ত্র করছে, এ রকম একটা অভিযোগ তুলে স্পষ্টতই তিনি সারা দেশে জাতীয়তাবাদী মানসিকতাকে নিজের পক্ষে উসকে দেয়ার চেষ্টা করছেন, অবরোধকালে যেটা করে তিনি নায়ক হয়ে উঠেছিলেন। 

কিন্তু তার সরকারের অদক্ষতা, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের ব্যাপক দুর্নীতি এবং সবগুলো তদন্ত সংস্থাকে প্রধানমন্ত্রীর অধীন নিয়ে আসার প্রচেষ্টার কারণে জনগণের চোখে তিনি ভিলেন হয়ে উঠেছেন। 

ওলির স্বাভাবিক শক্তিশালী বক্তৃতা, তার রসবোধ, প্রতিপক্ষকে মাঝে মাঝে আঘাত হানার সক্ষমতা – এগুলোকে আর মানুষ পছন্দ করছে না। এগুলো এখন হিতে বিপরীত হয়ে গেছে। বিশেষ করে গত নির্বাচনে আগে তিনি দেশের এ মাথা- ও মাথা ট্রেন সার্ভিস চালু, ঘরে কাজকে সহজ করতে কেন্দ্রীয়ভাবে রান্নার গ্যাস সরবরাহের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এগুলো সবই ধাপ্পাবাজি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। 

ওলি ভারতকে নিয়ে সম্প্রতি যেটা বলেছেন, সেটা দিল্লিতে বোমার মতো আঘাত হানার কথা। কিন্তু সাধারণভাবে আগ্রাসী দিল্লিও এই কথার কোন জবাব দেয়নি। দিল্লি ও কাঠমাণ্ডু এই মুহূর্তে নেপাল, তিব্বত ও ভারতের ত্রিদেশীয় সংযোগ পয়েন্টের ৩৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কালাপানি, লিপুলেখ ও লিম্পিয়াধুরার উপর ভারতের দাবির প্রতিবাদে এই তিনটি জায়গাকে নেপালের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে কাঠমাণ্ডু। 

ওলি অভিযোগ করেছেন, নতুন মানচিত্র প্রকাশের পর ভারত তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করছে। “আমি অন্য কোন দেশের ভূখণ্ড নেয়ার চেষ্টা করছি না। নেপালের জনগণ আমাকে নির্বাচিত করেছে, এবং বাইরের কারো পক্ষে আমাকে সরানোটা সম্ভব হবে না” – তাদের দলের সাথে সংশ্লিষ্ট এনজিও মদন ভান্ডারি ফাউন্ডেশান আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ওলি এ মন্তব্য করেন। 

Lifts-Top News-Bangla-4 July  2020-2

ভারতীয় পক্ষ অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, তারা চিন্তাও করেনি যে, ওলি এই সময়ে এতদূর যাবেন, ভারত যখন সীমান্তে চীনের মোকাবেলা করছে এবং সীমান্ত নিয়ে যেখানে আরও সঙ্ঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। চীনের দৃশ্যমান সমর্থনের উপকারভোগী ওলি, বিশেষ করে দলের মধ্যে বিদ্রোহের মুখে যখন দল প্রায় ছাড়তে হচ্ছিল তাকে, তখন চীন তাকে সমর্থন দিয়েছিল। চীনা রাষ্ট্রদূত হাউ ইয়ানকি করোনা লকডাউন উপেক্ষা করে ওলির দুই সিনিয়র প্রতিদ্বন্দ্বি– মাধব কুমার নেপাল ও পুষ্প কামাল দহল প্রচণ্ডর সাথে ১ মে দেখা করেন। নেপাল-চীন সহযোগিতার জন্য একটা স্থিতিশীল সরকার পূর্বশর্ত– এমন যুক্তিতে তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন রাষ্ট্রদূত।

কিন্তু, দুই মাসের মাথায় আবারও গভীর সঙ্কটে পড়ে গেছেন ওলি। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, ভারতের সমালোচনা করলে আবার চীনের সমর্থন পাওয়াটা সবচেয়ে সহজ হবে। তবে, চীন এবার এটা এড়িয়ে যেতে পারবে না যে, ওলির দলের নেতারাই কঠোরভাবে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। 

“আমি শুনেছি সব ধরণের পদক্ষেপের কথা ভাবা হচ্ছে। এর মধ্যে আফগান, বা পাকিস্তান বা বাংলাদেশ মডেলে সামরিক অভ্যুত্থানের বিষয়ও রয়েছে”, ওলির দলের কো-চেয়ারপার্সন প্রচণ্ড স্ট্যান্ডিং কমিটির উদ্বোধনী অধিবেশনে এ কথা বলেছেন। এর অর্থ হলো রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের জন্য ওলি এমনকি সেনাবাহিনীকে পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারেন। 

আরও পড়ুনঃ সীমান্ত নিয়ে দিল্লি-কাঠমাণ্ডু বিরোধ: নেপালের  রাজনীতিতে চীনের প্রভাব বাড়ছে

ওলির মতো প্রচণ্ডর যদিও অতিরঞ্জিত করার অভ্যাস আছে, কিন্তু এটা সত্যি যে, মাত্র ২৮ মাস আগে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে যে সরকার গঠিত হয়েছিল, সেই সরকার পতন অত্যাসন্ন হয়ে পড়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে না হলেও কয়েক মাসের মধ্যে সরকারের নিশ্চিত পতন হতে চলেছে। 

প্রশ্ন হলো ‘ওলির পরে কে?’ এই প্রশ্নের স্পষ্ট কোন উত্তর নেই। কিন্তু ওলির সমর্থকরাও মনে করেন, যে সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন, সেটা তিনি নষ্ট করেছেন। রাজতন্ত্র-পন্থী রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. প্রকাশ চন্দ্র লোহানি বলেন, “নিজেকে বহিস্কার করার জন্য তাড়াহুড়া করছেন ওলি”।

কিন্তু এই সবকিছুর মধ্যে ভারত তাদের কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না, ২০০৫ সালে তারা খোলামেলাভাবে যেটা রেখেছিল। ওলির বক্তৃতা এবং ‘জাতীয়তাবাদী’ কার্ড এবং ভারতের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের বিষয়টি হিতে বিপরীত হয়েছে।