আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

নেপাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা প্রধানের ‘রহস্যময়’ বৈঠক, চীনের জন্য বার্তা

Screenshot 2020-10-26 070111
নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি

ভারতীয় বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর শীর্ষ পর্যায়ের কোন কর্মকর্তা নেপালে সফরে গেলে সেটা সাধারণত সবার অগোচরেই থাকে। এর একটা কারণ হতে পারে তাদের এ ধরনের সফর মাঝে মাঝেই হয়ে থাকে, অথবা নেপালের অভ্যন্তরীণ ইস্যুসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের তৎপরতার বিষয়টি মোটেই ‘গোপন’ কিছু নয়। 

বহু ভারতীয় ও নেপালি লেখক – যাদের কেউ কেউ ভেতরের লোক – তারা ২০০৬ সালে নেপালের বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে পরিকল্পনা ও সেটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের রিসার্চ অ্যাণ্ড অ্যানালিসিস উইং (র) এর সক্রিয় ভূমিকাটি বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে চীনাদের দূরে রাখতে মাওবাদীদের সাথে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করেছে ‘র’, যে মাওবাদীদেরকে ভারত নিজেই ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। 

কিন্তু রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হলেও নেপালের রাজনীতি, সুশাসন, ক্ষমতার কেন্দ্র এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনের উপস্থিতি এবং প্রভাব নজিরবিহীনভাবে বেড়ে গেছে। ভারত আর চীনের মধ্যে বিদ্যমান বর্তমান উত্তেজনা, প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের সুনাম ও প্রভাব হ্রাস পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নয়াদিল্লী এখানে সত্যিকারের পরীক্ষার মধ্যে পড়ে গেছে। 

এরই প্রেক্ষাপটেই ‘র’-এর প্রধান সামন্ত কুমার গোয়েল বুধবার (২১ অক্টোবর) নয় সদস্যের শক্তিশালী দল নিয়ে বিশেষ বিমানে নেপালে সফরে আসেন। পুরো ১৬ ঘন্টার জন্য ত্রিভূবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অবস্থান করে ছিল এই বিমান। 

ভারতীয় টিম কাদের সাথে বৈঠক করেছে, সেটা এখনও অজানা। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বৈঠকের আগে বা পরে ব্রিফ না করে প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলির সাথে বুধবার রাতে গোয়েলের দুই ঘন্টার একান্ত বৈঠকের বিষয়টি এর অস্বচ্ছতা এবং গোপন এজেন্ডা নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন তৈরি করেছে। 

‘গোপনীয়তা’ বজায় রাখার কারণে এবং সুস্পষ্ট প্রটোকল লঙ্ঘনের কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতাসীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির সিনিয়র নেতারা এই বিষয়টি তুলে ধরছেন। শেষ পর্যন্ত ওলির প্রেস উপদেষ্টা সুর্য থাপা আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন: “ভারত নেপাল-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য উদগ্রিব, আলোচনার মাধ্যমে তারা বিদ্যমান ইস্যুগুলোর সমাধান করতে চায় এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়াতে চায়”।

নেপাল-ভারত সম্পর্ক এখন নিম্নমুখী। এবার নেপাল নতুন একটি রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে ৩৭০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল – যেটাকে ভারত আর নেপাল উভয়ের নিজেদের বলে দাবি করে – সেই অঞ্চলকে নেপালের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভারত নিজে নভেম্বর মাসে কালাপানি, লিম্পিয়াধুরা এবং লিপুলেখ এলাকাকে নিজেদের মানচিত্রে যুক্ত করে। তারা যখন এই অঞ্চলকে নেপালের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য বলেছিল, নেপাল সেটা মানেনি। সর্বসম্মতিতে নেপালের পার্লামেন্ট নতুন মানচিত্র গ্রহণ করে এবং নতুন লোগোসহ জাতীয় প্রতীকের অনুমোদন দিয়েছে। ভারত বলেছে এটা নেপালের দিক থেকে ‘নজিরবিহীন মানচিত্রগত আগ্রাসন’। তারা এটাও বলেছে যে, এই পদক্ষেপ সীমান্ত বিবাদ মীমাংসার জন্য আলোচনার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে। 

কিন্তু এ অঞ্চলে যেহেতু চীনের প্রভাব এবং উপস্থিতি বাড়ছে, এ অবস্থায় ‘সংলাপ না করার’ জায়গায় শক্ত হয়ে বসে থাকলে সেটা ভারতের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মনে হয়। কিন্তু কৌতুহলের বিষয় হলো নিয়মিত কূটনীতিক চ্যানেলকে ব্যবহার না করে দিল্লী তার মনোভাব পরিবর্তনের বিষয়টি জানানোর জন্য বেছে নিলো গোয়েলকে। 

নেপালে চীনা উপস্থিতির পরিমাপের ক্ষেত্রে ভারতীয় ধারণা কি বাস্তবতাকে ছাপিয়ে গেছে? বৈঠকের ব্যাপারে একমাত্র আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এসেছে থাপার কাছ থেকে এবং তার বক্তব্যকে মেনে নিলে বলতে হবে গোয়েল বিদ্যমান সমস্যাগুলো সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের কথা বলেছেন, যেটা সীমান্ত ইস্যুতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। 

ভারত এটাও মনে করে যে, নেপালের বড় দুটো কমিউনিস্ট পার্টি – কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল – ইউনিফায়েড মার্ক্সসিস্ট লেনিনিস্ট এবং নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি মাওয়িস্টদের একত্র করে ক্ষমতাসীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের পেছনে চীনের ভূমিকা রয়েছে। এমন এক সময় গোয়েলের সফর হলো যখন প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি আর দলের কো চোয়ার পুষ্প কমল দহল প্রচণ্ডের নেতৃত্বাধীন দুই অংশ পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। চীন যেটা করেছে, সেটা বাতিল করে দিতে পারলে সেটা ভারতের জন্য সুখের খবর তো বটেই। 

তবে, প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারি এবং প্রধানমন্ত্রী ওলি উভয়েই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। ওলি যেভাবে গোয়েলের সফর নিয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করেছেন, সেটা নিয়ে প্রচণ্ড এরই মধ্যে তার সমালোচনা করেছেন। 

ওলি সেই ব্যক্তি ২০১৫ সালের অবরোধের আগে যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতো ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চেয়েও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হতো ওলির। মনে হচ্ছে, ভারতের সাথে সম্পর্কের অচলাবস্থা নিরসনের জন্য তার প্রচেষ্টাতেই গোয়েল নেপাল সফর করলেন। এই ‘গোপন’ বৈঠক চীনের কাছে যে বার্তা দিলো, সেটা হলো নেপালের ব্যাপারে ভারতের আগ্রহে মোটেই ভাটা পড়েনি। 

প্রতিবেশী দেশগুলোর কূটনীতির ক্ষেত্রে ভারতের নিরাপত্তা সংস্থার ভূমিকা সবসময়ই ছিল। কিন্তু এবার গোয়েন্দা সংস্থা কি সরাসরি ভারতীয় কূটনীতির প্রকাশ্য প্রতিনিধিত্ব শুরু করবে? নেপালে চীনের উপস্থিতি এবং জনপ্রিয়তাকে কমিয়ে আনার জন্য ভারত বদ্ধপরিকর বলে মনে হচ্ছে। 

গোয়েলের সফর বিচ্ছিন্ন হিসেব কষা কোন পদক্ষেপ, না কি এ ধরনের আরও সফর সামনে অপেক্ষা করছে, সেটাই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে নয়াদিল্লীর কর্মপদ্ধতি এখানে কি হবে। কিন্তু চীন এগুলো দাঁত কামড়ে সহ্য করবে কি না, সেটাই হলো মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। তাছাড়া নেপাল নিজের দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে কতটা শান্তি বজায় রাখতে পারবে, তার উপরও প্রভাব পড়বে এই সফরের।