আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

ইলিশ কূটনীতি ভালোই চলছে, তিস্তার পানির খবর কি?

Screenshot 2020-10-07 070305 top
বঙ্গঅঞ্চলের দুই প্রভাবশালী নারী: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (ডানে) ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি

২০১১ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার বাঙালিদের প্রিয় খাবার ইলিশ, বিশেষ করে পদ্মা নদী থেকে সংগৃহীত ইলিশ রফতানি বন্ধ করার পর প্রতিবেশীরা এক ধরনের হিংসার মধ্যে রয়েছে। 

ইলিশ বাঙালিদের যেভাবে ঐক্যবদ্ধ করে, আর কোনকিছুই সেভাবে করে না। এই সুস্বাদু মাছের জন্য তাদের ভালোবাসা চিত্রকলা, সাহিত্য, গান থেকে নিয়ে রূপালি পর্দায় পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। এটা এখন ট্রান্স-বাউন্ডারি নদী রাজনীতির অংশ হয়ে গেছে। 

আর এর ঠিক কেন্দ্রে রয়েছে দুই প্রতিবেশী আর বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠির দুই ক্ষমতাধর নারীর মধ্যে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। এদের একজন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর অন্যজন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। আর দ্বন্দ্বটা হলো একটি নদীর পানি বণ্টন নিয়ে, যে নদীর উৎস হিমালয়ের উচ্চ অঞ্চলে আর যেটা পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। 

বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনা নদীতে যে ইলিশ পাওয়া যায়, ২০১২ সাল থেকে সেই ‘পদ্মার ইলিশ’ পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের থালায় আর শোভা পাচ্ছে না, কারণ পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ২০১২ সাল থেকে এই রূপালি ইলিশ রফতানি নিষিদ্ধ করেছে শেখ হাসিনার সরকার। ২০১১ সালে মমতা ব্যানার্জি তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পর হাসিনা সরকার ওই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। 

ইলিশ কূটনীতি

বন্ধুত্বের প্রকাশ হিসেবে হাসিনা সরকার গত মাসে বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গা পূজার আগে বাংলাদেশ থেকে ১৪৫০ মেট্রিক টন পদ্মা নদীর ইলিশ রফতানির অনুমতি দেন, যেটা আট বছরের মাথায় সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত মাছ রফতানির আশা নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। 

হাসিনা সরকার সদ্ভাবের প্রকাশ হিসেবে সাময়িকভাবে ভারতে ইলিশ রফতানির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় মাঝে মাঝেই। প্রথম ২০১৮ সালে এই পদক্ষেপ নেয়া হয় এবং পরবর্তী বছরগুলোতেও সেটা জারি ছিল। এটা করা হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানসিকতা, অনুভূতি তাদের ইচ্ছার মাত্রা বুঝে, যারা পদ্মা-মেঘনার দুর্মূল্যের ইলিশ কেনার সামর্থ রাখেন। এ মন্তব্য করেন কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ পর্যবেক্ষক ও কৌশলগত বিশ্লেষক ড. সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী। 

দুই বাংলাতেই ইলিশ মাছ উপভোগের একটা ঐতিহ্য রয়েছে, তবে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ‘পদ্মার ইলিশের’ প্রতি বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে, যে ইলিশটা আহরণ করা হয় পদ্মা নদী থেকে, সাউথ এশিয়ান মনিটরকে এ কথা বললেন রায় চৌধুরি। 

চিকেনস নেকের নাজুকতা?

ভারতের সাথে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসার পর বাংলাদেশ সরকার এখন তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও এর নাব্যতা বজায় রাখার জন্য চীনের কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব বিবেচনা করছে। 

বেইজিংয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ও নদীর নাব্যতা প্রকল্পের প্রস্তাবটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে, কারণ এই অঞ্চলের মানুষ বর্ষায় বন্যা ও নদী ভাঙন এবং শুকনা মওসুমে মারাত্মক পানি সঙ্কটের শিকার হচ্ছে।

চীনা অর্থায়নের এই মেগা প্রকল্পটি শিলিগুড়ি করিডোরের অনেক কাছে বলে ভারতের অনেকে এটাকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখলেও, ভারতের কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা এ ধরনের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন। 

প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) অরুণ রোয়ে বলেন, বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ শিলিগুড়ি করিডোরের জন্য হুমকি হবে বলে যে উদ্বেগ রয়েছে, সেটি অতিরঞ্জিত। নেপাল ও বাংলাদেশের মাঝখানে ২৯ কিলোমিটার চওড়া এই ভূখণ্ডটি ‘চিকেন নেক’ নামেও পরিচিত। এটার মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তরপূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের সংযোগ তৈরি হয়েছে। 

রোয়ে বলেন, “চীনের পিপলস লিবারেশান আর্মিকে (পিএলএ) চিকেনস নেকে যেতে হলে তাদের সড়ক লাগবে। সে কারণে শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে উদ্বেগ ভিত্তিহীন”। রোয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের নেতৃত্ব দিয়েছেন আগে। বর্তমানে তিনি কলকাতা-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক রিসার্চ সেন্টার ফর ইস্টার্ন অ্যান্ড নর্থ ইস্টার্ন স্টাডিজ-কলকাতা (সেনার্স-কে)’র সাথে জড়িত। 

“বাংলাদেশ আর চীন দুটোই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ এবং তাদের অর্থনীতি ও সুরক্ষা জোরদার করার সব ধরনের অধিকার তাদের রয়েছে। 

রোয়ে বলেন, ভারতের অতিরিক্ত কর্তৃত্বপরায়ন মনোভাবের কারণে এরই মধ্যে প্রতিবেশী একাধিক দেশের ক্ষেত্রে ভারতকে মূল্য দিতে হয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশের জনগণের শুধু তিস্তা নদী নয়, বরং ভারতের সাথে অভিন্ন ৬৪ নদীর সবগুলো থেকে পানি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। 

রোয়ে বলেন, “বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারত-বেষ্টিত, তাই তারা তাদের কৌশলগত ও নিরাপত্তা প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে সংবেদনশীল। ভারতের স্বার্থকে আঘাত না করে যে কোন দেশের সাথে যে কোন বোঝাপড়ায় যেতে পারে বাংলাদেশ”।

মমতা ব্যানার্জির বোকামি

তবে, পশ্চিমবঙ্গে যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে মারাত্মক বিভেদ রয়েছে, সেখানে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির ব্যাপারে ব্যানার্জির কড়া বিরোধিতার প্রতি সবগুলো রাজনৈতিক দলের আবার একনিষ্ঠ সমর্থন রয়েছে। ব্যানার্জি যে ‘পশ্চিমবঙ্গ প্রথম’ নীতি গ্রহণ করেছেন, সেটার ব্যাপারে হিন্দু ডানপন্থীসহ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতারা বিরোধী নন, এবং এটাকে তারা সঠিক মনে করেন। নয়াদিল্লীও এখন পর্যন্ত এটাকে অস্বীকার করার কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। 

বিশ্লেষকরা বলেন, তিস্তা নদীর পানি বন্টনে বিরোধিতা করলেও ব্যানার্জি জানেন যে, তিনি হয়তো এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতির প্রতি চোখ বন্ধ করে রেখেছেন, যে নীতি অনুযায়ী তিনি বাংলাদেশের মধ্যে নদী প্রবাহিত হওয়া আটকে দিতে পারেন না। 

কিন্তু মেজাজি ব্যানার্জির নিজের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তার দৃষ্টিভঙ্গি হলো তিস্তা নদীর পানির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে এবং এর সাথে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত অন্যান্য নদীর সংযোগ ঘটাতে হবে। ভারত থেকে বাংলাদেশের মধ্য ছোট বড় মিলিয়ে অন্তত ৬৪টি নদী প্রবাহিত হয়েছে। 

তিস্তা নদীর পানির পরিমাণ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন যদিও মুখ বন্ধ রেখেছে, বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, ব্যানার্জি মনে করেন যে, বাংলাদেশের সাথে তিস্তা নদীর পানি বিনিময় করলে সেটা পশ্চিমবঙ্গে সেচের উপর প্রভাব ফেলবে, যেটা তার জন্য একটা রাজনৈতিক ঝুঁকি।

রায়চৌধুরী বলেন, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি কেবল তখনই ফলপ্রসূ হতে পারে এবং সমস্যা কেবল তখনই সমাধান হতে পারে যদি ঢাকা ও দিল্লী পানি বণ্টন দর কষাকষির মধ্যে কলকাতা আর গ্যাংটককে অন্তর্ভুক্ত করে। 

রায়চৌধুরী বলেন, “উদাহরণ হিসেবে বলা যায় তিস্তা নদীর উৎপত্তিস্থল হিমালয় অঞ্চলের সিকিম এবং সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গে নদীতে বাঁধ দেয়ার কারণে অনেক বছর ধরেই নদীর পানির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে এসেছে”।

সংবেদনশীল তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে উত্তর বঙ্গে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক মানুষের মানসিকতাকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেছেন ব্যানার্জি। রায়চৌধুরী বলেন, “ব্যানার্জির দিক থেকে এটা একটা স্পর্শকাতর রাজনৈতিক কৌশল”।

তবে রোয়ে বলেন যে, ভারত যথেষ্ট পানি পেয়েছে এবং তাদের পানি ভাগাভাগি করা উচিত। 

রোয়ে বলেন, “আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোকেরা খুবই আরামপ্রিয়… প্রতিবেশীদের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হওয়ার আগে আসুন আমরা নিজের দেশকে ঠিক করি”।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সাথে ঢাকা সফর ব্যানার্জি শেষ মুহূর্তে বাতিল করায় ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সেটাকে ভালোভাবে নেয়নি। কংগ্রেস এই আচরণকে আত্মকেন্দ্রিক আখ্যা দিয়ে সেটাকে প্রত্যাখ্যান করে।

পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে উভয় জায়গাতেই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে এবং কৃষিজমিতে সেচের জন্য তিস্তা নদী বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 

পশ্চিমবঙ্গে ১২০,০০০ হেক্টর জমিতে সেচের কাজে সহায়তা করে তিস্তার পানি। 

নয়াদিল্লী-ভিত্তিক মনোহার পারিকর ইন্সটিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস (আইডিএসএ)-এর রিসার্চ ফেলো ড. শ্রুতি এস পাটনায়েক বলেন, মমতা ব্যানার্জি তিস্তার পানিবণ্টনের আসল বিষয় নিয়ে কখনোই বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে আলোচনা করেননি।

তিনি বলেন, “এটা মমতার অহং এবং ঠিক তাই। যদি ২০১১ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের একেবারে আগ মুর্হূর্তে তার সঙ্গে আলোচনা না করে একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে তাকে আলোচনার একটি পক্ষ করা যেতো তাহলে তিনি নিজে থেকেই কিছু ছাড় দিতেন।”

পাটনায়েক বলেন, পানিবণ্টন চুক্তিতে রাজি হতে মমতার জন্য কিছু থাকতে হবে। তাই বাংলাদেশ ও ভারতকে এ চুক্তি করতে হলো খুবই সৃজনীলভাবে কাজ করতে হবে। হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি একজন উদার নেতার মতো। তিস্তা পানি চুক্তিটি উত্তর-বঙ্গের প্রয়োজনীয় পানির চেয়ে আরো অনেক বেশি কিছু।”

কৌশলগত বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, মমতার বিরুদ্ধে মারদাঙ্গা মনোভাব নিয়ে থাকা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বা তার দল বিজেপি কেউই দ্রুত তিস্তা সমস্যা সমাধানের মনোভাব দেখায়নি। এটা বিশেষ করে উত্তর পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ও তৃণমূল উভয়ের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচনের আগে তিস্তা চুক্তি নিয়ে পানি ঘোলা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আগামী বছরের শুরুতে বা মাঝামাঝি এ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচনী ফলাফলের উপর অনেক কিছু নির্ভর করবে বলে মনে করেন প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গৌতম লাহিড়ি। 

লাহিড়ি টেলিফোনে স্যামকে বলেন, “মোদি সরকার তিস্তা চুক্তি করতে চাইলেও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর অংশের ক্ষেত্রে এই চুক্তির বিরোধিতা করা মমতার জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে এখানে বিজেপি’র কাছে মমতার দল হেরেছিলো।” 

লাহিড়ি বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য তিস্তাচুক্তি যে গুরুত্বপূর্ণ সেট মমতা জানেন। কিন্তু তার কথা মতো ৫২:৪৮ অনুপাতে পানি ভাগাভাগি না হলে তিনি কোন চাপের কাছে মাথা নত করবেন না। উত্তর পশ্চিমবঙ্গের বিজেপিও বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা পানিচুক্তির বিপক্ষে।

আগামী নির্বাচনে রাজ্যের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলে মমতা হয়তো বাংলাদেশকে তিস্তার পানিতে ভাগ দেয়ার ক্ষেত্রে একটি মাঝামাঝি পথ বেছে নিতে পারে।