আমরা লাইভে English শুক্রবার, অক্টোবর ৩০, ২০২০

পাকিস্তান-বাংলাদেশ: সময় এসেছে পুনর্মিলন, পুনর্গঠন ও পুনরুত্থানের

imran-hasina-1559033982

অনেক অনেক দিন ধরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সম্পর্ক কখনো তীব্র আকর্ষণ এবং মাঝে মাঝে অতীতের বেদনাদায়ক ঘটনায় যন্ত্রণাকাতর হয়েছে। আকর্ষণ সহজাত এবং তা অভিন্ন ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ ও ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে অভিন্ন সংগ্রাম থেকে উৎসারিত। ক্ষতি ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রণা ১৯৭১ সালের ঘটনাবলী থেকে সৃষ্ট। সময় এসেছে দুই দেশের নেতাদের জন্য এই অচলাবস্থার অবসান ঘটানো এবং ধীরে ধীরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এমন এক পথে নিয়ে আসা যাতে তা নিজের গতিতেই চলতে পারে।

পাকিস্তান সৃষ্টি অনেকাংশেই সম্ভব হয়েছে মুসলিম পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিকভাবে সচেতন, শিক্ষিত ও মার্জিত নেতৃত্বের দর্শন ও সংগ্রামের কারণে। তারাই প্রথম আধুনিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কল্যাণকর দিকগুলো প্রথমে পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিল এবং পাশ্চাত্যের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তারাই প্রথম দক্ষিণ এশিয়ান মুসলিম গ্রাজুয়েটের জন্ম দিয়েছিল। তারা সর্বাত্মকরণে স্যার সৈয়দের গণশিক্ষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, পরে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের অধিকার আদায়ের জন্য নিখিল ভারত মুসলিম লিগ সৃষ্টি করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশিত শেখ মুজিবর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে নিখিল ভারত মুসলিম লিগ বাংলাকে অখণ্ড রাখার সোহরাওয়ার্দি-বসু চুক্তিকে সমর্থন করেছিল, কিন্তু ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস, বিশেষ করে বল্লভভাই প্যাটেল তা চাননি। তারা কেবল বাংলাকে ভাগই চাননি, সেইসাথে কলকাতাকেও ভারতের জন্য চেয়েছিলেন। বর্তমান মুসলিমবিরোধী হিন্দু ফ্যাসিস্টরা এবং আরএসএস ও এর সহযোগী সংগঠন ও তাদের নেতারা যে প্যাটেলের প্রশংসা করবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

আরও পড়ুনঃ পাকিস্তান-বাংলাদেশ পুনর্মিলন?

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, শুরু থেকেই পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে অনেক উদ্দীপনা ও প্রকৃত রাজনৈতিক সমস্যা ছিল। রাজনীতিবিদেরা এসব সমস্যা সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যকার বিভাজন ১৯৭১ সালের ট্রাজেডির জন্ম দেয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর শেখ মুজিবর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো উভয়ে ক্ষত নিরাময় শুরু করেন। উভয় দেশের জনসাধারণ দুই জাতির মধ্যে আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সম্ভাবনায় উল্লসিত হয়েছিল। অতীতের ট্রাজেডি দূর করতে কিছু বাধা থাকা সত্ত্বেও সম্পর্ক গতিপথেই ছিল।

অতীতে সৃষ্ট তিক্ততার কাছে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জিম্মি হয়ে আছে। আমাদের জনগণের স্বার্থে ও ঘনিষ্ঠতর সম্পর্ক রক্ষায় তাদের ইচ্ছার আলোকে আমাদেরকে অবশ্যই পরিণতবোধের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণ নিহিত থাকে আবেগের ঊর্ধ্বে এবং শান্তি ও মৈত্রির জন্য একে অপরের কাছাকাছি হওয়া এবং পুরনো ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টার মধ্যে। অতীতের বেদনাদায়ক ঘটনার জন্য আমরা সবাই শোকাহত এবং আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আসুন আমরা পুনর্মিলন, পুনর্গঠন ও পুনরুত্থানের জন্য একসাথে কাজ করি। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উভয়েই এই প্রক্রিয়া শুরুর জন্য ঐতিহাসিকভাবে যথার্থ। অবশ্য, পুনর্মিলন ও বন্ধুত্বের উত্তরাধিকার রাজনীতিবিদদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্য দিয়েও অতিবাহিত হওয়াও প্রয়োজন। 

প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান অনেকবারই বাংলাদেশের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনের প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশের সফলতা কামনা করেন। গত বছরের অক্টোবরে তিনি অসুস্থতা থেকে দ্রুত আরোগ্য লাভের ইচ্ছা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেছিলেন। তিনি আবারো ২২ জুলাই প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের বন্যা নিয়ে আলোচনা করেন। এই আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করেন, পরিবর্তনমুখী আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেন।

জম্মু ও কাশ্মীরের ব্যাপারে পরলোকগত শেখ মুজিবর রহমানও কাশ্মীরী জনগণের ওপর ভারতীয় অবিচারের ব্যাপারে অবগত ছিলেন। তিনি তার স্মৃতিকথায় টেকসই শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এই ইস্যুতে ন্যায়সঙ্গত সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।

বর্তমানে কেবল জম্মু ও কাশ্মীরই আরএসএস-বিজেপির হিন্দু ফ্যাসিবাদী সরকারের একমাত্র টার্গেট নয়। ভারতের পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ই মোদির উগ্র ঠগদের টার্গেট। আর তা পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য।

এগিয়ে যাওয়ার জন্য উভয় পক্ষের প্রয়োজন সব পর্যায়ে অব্যাহতভাবে বিনিময়। তাদেরকে অবশ্য উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক দ্বিপক্ষীয় পরামর্শ করতে হবে।

ভিসার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করতে হবে। ভিসার বিবেচনায় পাকিস্তান ইতোমধ্যেই বাংলাদেশকে এক ক্যাটাগরিভুক্ত করেছে। বাংলাদেশেরও একই ধরনের পদক্ষেপ শুভেচ্ছা ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির করবে, যা অনেক দূর যেতে সহায়ক হবে।

আরও পড়ুনঃ পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক: চোখের দেখা থেকেও বেশি কিছু

জনগণ পর্যায়ে যোগাযোগ বিকাশেরও প্রয়োজন রয়েছে। দুই দেশ তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের মধ্যেই সহযোগিতা বিকাশ করা প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে নতুন নতুন প্লাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। একইভাবে সংস্কৃতি, ওষুধ, মৎস, কৃষির মতো খাতেও সহযোগিতা হতে পারে, কৌশলগত ইস্যুতেও পরামর্শ বাড়ানো যেতে পারে।

সার্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম। আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতি ভারতের অন্তর্ঘাতমূলক মনোভাবের কারণে সংস্থাটি অকার্যকর হয়ে আছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ একসাথে কাজ করতে পারে সার্ককে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং বিআরআই প্রকল্পগুলো এর মাধ্যমে এনে আঞ্চলিক সহযোগিতার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে পারে। চীন সবসময়ই ফলপ্রসূ ও প্রায় সব আঞ্চলিক দেশের সাথে পারস্পরিকভাবে কল্যাণমূলক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

টেলিফোন কলটি নতুন পথ খুলে দিয়েছে। এখন উভয় পক্ষের নেতৃত্বের উচিত হবে এই পথ ধরে দৃঢ়ভাবে এবং আরো উন্নত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। আসুন দুই দেশ অতীতের ক্ষত ও কষ্ট ভুলে গিয়ে পারস্পরিক সম্মান এবং দক্ষিণ এশিয়া ও এর বাইরে শান্তি ও সমৃদ্ধির অভিন্ন দর্শন নিয়ে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করি।

 

লেখক: সিনিয়র গবেষক, ইসলামাবাদ পলিসি ইনস্টিটিউট