আমরা লাইভে English শুক্রবার, জুন ০২, ২০২৩

শ্রীলংকা: ভারত মহাসাগরীয় গ্রেট গেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ

ভারত মহাসাগর যে নিয়ন্ত্রণ করবে, যে এশিয়ায় রাজত্ব করবে… বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে এই জলসীমাতেই” – আলফ্রেড থায়ের মাহান

দ্বীপ প্রজাতন্ত্রগুলো বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক ভূমিকা রাখতে পারে। নৌ বাণিজ্যের উপর নির্ভরতা এবং বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে এর যে সম্ভাবনা, সেটার কারণে সমুদ্র পথে যোগাযোগের বিষয়টি সকল নৌ কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে বৈশ্বিক শক্তিগুলো তাদের মিত্রদের সহায়তা সমন্বয়ের চেষ্টা করছে এবং এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে উপকূলীয় দেশগুলো। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার নৌ উপস্থিতির মাঝখানে ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে শ্রীলংকা একটা প্রধান উপাদান হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

এটা দৃশ্যমান যে ভারত আর চীন কিভাবে তাদের অর্থনৈতিক বাজার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য নৌ ‘আউটপোস্ট’ স্থাপনের পেছনে আর্থিক পদক্ষেপ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমেরিকার জন্য এই মুহূর্তে হয়তো এটা কোন হুমকি হবে না কারণ, আগে থেকেই এখানে তাদের উপস্থিতি আছে। কিন্তু এই মাত্রাটা কিছু সীমা পার হলে অবশ্যই প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। নতুন নিরাপত্তা পরিবেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে অচলাবস্থা তৈরির প্রেক্ষিতে এর বিকল্পগুলোর উপর চাপ বাড়ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্র পথের উপর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে শ্রীলংকা। শ্রীলংকার বন্দরগুলো তাদের বিনিয়োগকারীদেরকে সরাসরি আন্তর্জাতিক নৌ পথ ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। শ্রীলংকার মাত্র দশ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে রয়েছে পূর্ব-পশ্চিম সমুদ্রপথ, যে পথ দিয়ে ৬০,০০০ জাহাজ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কার্গো বহন করছে এবং বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ তেলও পরিবহন করা হচ্ছে এই পথ দিয়ে। শ্রীলংকার যেহেতু পূর্ব আর পশ্চিমের মাঝখানে নটিক্যাল করিডোরের উপর দাঁড়িয়ে আছে, তাই চীনের মতো দেশগুলো এ ব্যাপারে যথেষ্ট অবগত আছে যে, ভারত মহাসাগরে তাদের সাফল্যের বিষয়টি শ্রীলংকার সাথে সম্পর্কের উপর নির্ভর করছে।

শ্রীলংকার যে উপকূলরেখা রয়েছে, সেটা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্যও ব্যবহার করা যায় যেখান থেকে বেশি ওজনের কার্গোগুলো উঠানামা করা যাবে। তাছাড়া এটা নজরদারির জন্যও একটা আদর্শ জায়গা যেখান থেকে শত্রুপক্ষের জাহাজগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। চীন মালাক্কা সমস্যার পরবর্তীকালে কলম্বো ও হামবানতোতা বন্দরে এমনভাবে বিনিয়োগ করেছে যাতে শ্রীলংকা আর চীনের স্বার্থ একাকার হয়ে গেছে এবং ভারত মহাসাগরের রাজনীতিতে এটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

আমেরিকা বিশ্বাস করে যে, চীন চাবাহার, গোয়াদর, কলম্বো আর হামবানতোতা বন্দরকে সংযুক্ত করছে যাতে বিশ্ব বাণিজ্যের উপর চীনের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো যায়। যুক্তরাষ্ট্র যে বিকল্প দিয়েগো গার্সিয়া নৌ চুক্তির কথা বলছে, সেটা আরও জোরালো এবং এই চুক্তির অর্থ হবে শ্রীলংকাকে এতটা সহায়তা দেয়া যাতে তারা বোঝাপড়ার ভিত্তিতে একটা মাঝামাঝি পর্যায়ে আসতে রাজি হয়। আদর্শিক দিক থেকে, সেটার অর্থ হলো শ্রীলংকাকে চীন আর আমেরিকার স্বার্থের মধ্যে একটা ভারসাম্য আনতে হবে। শ্রীলংকার জন্য এটা একই সাথে একটা সুবিধা আবার দ্বিধাদ্বন্দ্বও বটে। একটি রাষ্ট্রকে বেছে নেয়ার অর্থ হলো অন্যটিকে অসন্তুষ্ট করা, যেটা করার মতো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা শ্রীলংকার নেই।

ভারতেরও ভারত মহাসাগরে রাজত্ব করার গভীর আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এখন ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব বাড়তে থাকায়, এ অঞ্চলে ভারতের স্বার্থ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যে দেশগুলো তেল সরবরাহ করে, সেগুলো সাথে সম্পর্ক শক্তিশালী করার সাথে সাথে উপকূলীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে ভারত যাতে সমুদ্র সীমায় টিকে থাকাটা সুবিধাজনক হয়। ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের বাইরে প্রথম সফরে মালদ্বীপ আর শ্রীলংকাকে বেছে নেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, যেটার মাধ্যমে ভারতের অগ্রাধিকারের বিষয়টি ফুটে উঠেছে।

ভারত মহাসাগর চীন, ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে যাচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে এটা সঙ্ঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠবে। ভারত মহাসাগরে তিন দেশেরই নিজস্ব স্বার্থ এবং অগ্রাধিকার রয়েছে। শ্রীলংকার যেহেতু পূর্ব পশ্চিম করিডোরের উপর গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দাঁড়িয়ে, সে কারণে এই দেশগুলোর জন্য শ্রীলংকা আধিপত্য বিস্তারের একটা গুরুত্বপূর্ণ চাবি। সে কারণে শ্রীলংকা নিরপেক্ষ থাকলে বা এই তিন আঞ্চলিক শক্তির কারো দিকে ঝুঁকে পড়লে সেটার বড় ধরণের ভূরাজনৈতিক প্রভাব পড়বে। এই গ্রেট গেমে কে বিজয়ী হবে, সেটা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা বড় একটা ভূমিকা রাখবে।