আমরা লাইভে English বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২০

টিপু সুলতান আর হায়দার আলী যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের স্বাধীনতার প্রচেষ্টায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন

Histry -18-08-2020-05

উত্তর আমেরিকার ১৩টি ব্রিটিশ উপনিবেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস গঠিত হয়েছিল, ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই তারা ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ব্রিটেন যখন এই কলোনিগুলোকে দমনে ব্যস্ত, যুক্তরাষ্ট্র তখন ব্রিটেনের শত্রুদের থেকে নিজের সংগ্রামের জন্য অনুপ্রেরণা নেয়ার চেষ্টা করেছে। যে সব সঙ্ঘাতের ঘটনা তাদের মনোযোগ কেড়েছিল, তার একটি ছিল মহিশুর রাজ্যের সাথে ব্রিটেনের সঙ্ঘাত। 

২০১০ সালে ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার সাথে মিলে একটি ওয়েবসাইট গড়ে তোলে ন্যাশনাল আর্কাইভ কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন পিতাদের ঐতিহাসিক দলিলগুলো নিয়ে এটি গড়ে তোলা হয়, যারা হলেন জর্জ ওয়াশিংটন, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, জন অ্যাডামস, থমাস জেফারসন, অ্যালেক্সান্ডার হ্যামিলটন এবং জেমস ম্যাডিসন। দেশের জন্মকালে এর গন্তব্যকে রূপ দিয়েছিলেন এরা। তাদের যোগাযোগ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের দলিলগুলো ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে। সেখানে দেখা যাবে, সারা বিশ্বে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোকে তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ১৭৫৪-৬৩ সাল পর্যন্ত সাত বছরের যুদ্ধে ব্রিটেনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের পর ১৭৭০ দশকের মাঝামাঝি ফরাসীরা যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন প্রতিষ্ঠাতা পিতারা আশা করছিলেন যে, ব্রিটেন বিশেষ করে ভারতে তার শত্রুদের কাছে হেরে যাবে, যেখানে সবচেয়ে কঠিন সামরিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল তারা। 

বহু চিঠিপত্র রয়েছে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা পিতারা পাঠিয়েছিলেন বা তাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল, যার মধ্যে হায়দার আলী আর টিপু সুলতানের কথা এবং ভারতে ব্রিটিশদের পরিণতির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এই দুই ব্যক্তি আমেরিকার মুক্তি সংগ্রামের উপর কি ধরনের প্রভাব রেখেছিলেন, সেটা বোঝাতে বাছাই করা কিছু এখানে তুলে ধরা হলো। 

শত্রুর শত্রু

প্রতিষ্ঠাতা পিতারা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের শাসকদের ব্যাপারে জানতে পারেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনকে লেখা ফরাসী সেনাবাহিনীর লে. জেনারেল কমটে ডি ট্রেসানের চিঠিতে। ১৭৭৭ সালের ২৪ জুনে লেখা ওই চিঠিতে কমটে ডি ট্রেসান হায়দার আলীকে ‘সাহসী মুঘল রাজপুত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং যে সব ইউরোপিয় হায়দার আলীর সাথে কাজ করেছিলেন, তাদের সাথে মার্কিন কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখার প্রস্তাব দেন। তিন বছর পর যখন দ্বিতীয় ইংল্যাণ্ড-মহীশুর যুদ্ধ শুরু হয়, আমেরিকান বিপ্লবীরা সেখানে গভীর দৃষ্টি রাখেন। ১৭৮০ সালের ১০ জুন জন অ্যাডামস কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টের কাছে লেখা চিঠিতে ব্রিটিশ অ্যাডমিরাল হিউজের স্কোয়াড্রনের বিশদ বিবরণ দেন এবং হায়দার আলীকে ‘বিখ্যাত হায়দার আলী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ১৭৮০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় মহাদেশীয় কংগ্রেসে ওই চিঠিটি পড়ে শোনানো হয়। 

Histry -18-08-2020-01পুরো ১৭৮১ সাল জুড়ে ইঙ্গ-মহীশুর যুদ্ধ নিয়ে বার্তা বিনিময় করেন আমেরিকান বিপ্লবীরা। ইংল্যাণ্ডের পরাজয়ের ব্যাপারে ব্যাপক আশা আর আকাঙ্ক্ষা ছিল তাদের। ১৭৮১ সালের ৪ জুলাই, এডমুন্ড জেনিংস র‍্যানডলফ ব্রাসেলস থেকে জন অ্যাডামসকে লেখা চিঠিতে হায়দারের প্রচারণা নিয়ে বিশদ উল্লেখ করেন। চিঠিতে তিনি হায়দার আলী সেনাবাহিনীর ৮০ হাজার ঘোড়া এবং আরকোট অবরোধের বিষয় উল্লেখ করেন। এতে কর্নেল বেইলি ও কর্নেল ফ্লেচারের রুটের বর্ণনা দিয়ে ৪০০ ইউরোপিয়ান এবং ৪,০০০ ভারতীয় সেপাইয়ের মৃত্যুর কথা জানানো হয়। এতে হায়দার আলীর ভূখণ্ড জয় এবং কর্নেল মানরোর মাদ্রাজে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। র‍্যানডলফ ১৭৭৫ সালে জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটনের সহযোগী ছিলেন এবং থমাস জেফারসনের পর ১৭৯৪ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 

১৮২৫ সালে আমেরিকার ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জন কুইন্সি অ্যাডামস। ছেলেবেলায় ডায়েরি লিখতেন তিনি। ১৭৮১ সালের ৮ এপ্রিল ১৩ বছর বয়সে লেইডেন থেকে মা আবিগাইল অ্যাডামসের কাছে লেখা চিঠিতে তিনি হায়দার আলীর বিজয়, কর্নেল ফ্লেচারের মৃত্যু আর কর্নেল বেইলির আটক হওয়ার কথা লিখেছিলেন। 

১৭৮১ সালের ২৮ আগস্ট রোড আইল্যাণ্ড ডেলিগেটসরা ফিলাডেলফিয়া থেকে রোড আইল্যাণ্ডের গভর্নর উইলিয়াম গ্রিনের কাছে লিখেছিলেন যে, ভারতে ব্রিটিশদের দুর্দশায় তারা খুশি। 

Histry -18-08-2020-02
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দর কষাকষির পাশাপাশি ভারতে ব্রিটিশদের প্রতিপক্ষ হায়দার আলী আর তার ছেলে টিপু সুলতানের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে মার্কিন বিপ্লবীরা। ১৭৮২ সালের ১৩ জুন হেগ থেকে লেখা চিঠিতে জন অ্যাডামস বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে ব্রিটেনের শত্রুদের সাথে যোগাযোগ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। 

কয়েক দিন পরে ১৭৮২ সালের ২৫ জুন ফিলাডেলফিয়া থেকে এডমুন্ড জেনিংস র‍্যানডলফকে লেখা জেমস ম্যাডিসনের চিঠিতে আমেরিকার স্বাধীনতার উপর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে ইংলিশম্যান আয়ার কুটের উপর হায়দার আলীর আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টিও উল্লেখ ছিল। ম্যাডিসন ১৮০৯ সালে আমেরিকার চতুর্থ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। 

Histry -18-08-2020-03
এনডমন্ড জেনিং রেনডফ, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী

 

১৭৮৩ সালের ২০ জানুয়ারি স্পেন, ফ্রান্স আর ব্রিটিশ, সেই সাথে আমেরিকার মধ্যে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে আপাত শত্রুতার অবসান ঘটে। ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা হয়। এর মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং ব্রিটেন স্বাধীন আমেরিকাকে স্বীকৃতি দেয়। ১৭৮৪ সালের ১৪ জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেস এটার অনুমোদন দেয়। টিপু সুলতানের প্রধান ইউরোপিয় মিত্র ফ্রান্স ব্রিটিশদের সাথে সামরিক লড়াই বন্ধ করার কারণে ব্রিটিশরা ভারতে বেশি মনোযোগ দেয়ার সুযোগ পায়। ব্রিটিশদের সাথে শান্তি চুক্তিতে যাওয়া ছাড়া টিপু সুলতানের তখন আর কোন উপায় ছিল না, চলমান যুদ্ধের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক জায়গায় ছিলেন তিনি। 

Histry -18-08-2020-04
জন কুইন্সি অ্যাডামস

 

উপসংহার

যোগাযোগ আর যাতায়াতের উন্নতির কারণে বর্তমান পৃথিবীকে বৈশ্বিক গ্রাম বলা হয়। কিন্তু অবাক লাগতে পারে যে, এমনকি ১৮ শতকেও একটা আপাত স্থানীয় রাজনৈতিক ঘটনা বহু দূরের ভূখণ্ড আর সমাজের উপর প্রভাব ফেলেছিল। হায়দার আলী আর টিপু সুলতান ইংল্যাণ্ড আর ফ্রান্সের মতো ইউরোপিয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোকে বহু সামরিক আর রাজনৈতিক কৌশল শিখিয়েছিল। তাদের সাহসিকতা আর রাজনৈতিক কৌশল মহাসাগর পার হয়ে উত্তর আমেরিকার উপরও বহু দশক ধরে প্রভাব রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের গঠনকালীন সময়ে এটা শুধু তাদের প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের ভারত সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেয়নি, একই সাথে তাদের মহান জাতির নিজস্ব মুক্তি সংগ্রামের ব্যাপারেও এটা উৎসাহিত করেছে।