আমরা লাইভে English রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

‘অতীতের অভিজ্ঞতায় আমার মনে হয় সশস্ত্র সংঘাত বাড়বে’, বললেন কাশ্মীরের সাবেক মধ্যস্থতাকারী রাধা কুমার

Radha-Kumar

কাশ্মীরে শতাধিক শিশু নিহত হওয়ার পর ছয় মাস ধরে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে কাশ্মীরীদের শান্ত করতে ভারত সরকার ২০১০ সালের অক্টোবরে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে সিনিয়র সাংবাদিক দিলিপ পাদগোয়ানকার, শিক্ষাবিদ রাধা কুমার ও সাবেক তথ্য কমিশনার এম এম আনসারিকে নিয়োগ করে।

এই তিনজন এক বছর কাশ্মীরে অবস্থান করে জম্মু ও কাশ্মীরের ২২টি জেলার সবগুলো থেকে ৭০০-এর বেশি প্রতিনিধির সাথে কথা বলেন। এই কমিটি সুপারিশমালাসহ ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের কাছে তাদের প্রতিবেদন পেশ করেন। তাদের সুপারিশমালার মধ্যে ছিল উপত্যকায় সশস্ত্র বাহিনী হ্রাস করা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটানো, বিতর্কিত আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্টের (আপসা) পর্যালোচনা করা। কিন্তু নয়া দিল্লী এসব সুপারিশ অগ্রাহ্য করে।

সাউথ এশিয়ান মনিটর-কে দেয়া বিশেষ সাক্ষাতকারে এই কমিটর অন্যতম মধ্যস্ততাকারী রাধা কুমার ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বিষয়ক বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী দৃশ্যপট নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাতকারটি এখানে তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সংবলিত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের পর এক বছর শেষ হয়ে গেছে। জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে কী পরিবর্তন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

রাধা কুমার: কী পরিবর্তন হয়নি? স্বায়ত্তশাসন বাতিল ও রাজ্যটিকে বিভক্ত করে এর মর্যাদা অবনমনের ফলে কাশ্মীর উপত্যকার লোকজন ভারতের জনগণ ও দেশ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উপত্যকা থেকে প্রতিক্রিয়া অনুমান করে মোদি প্রশাসন জম্মু ও কাশ্মীরকে পুরোপুরি লকডাউন করে ফেলে। টেলিফোনের মতো ছোটখাট শিথিলতা ছাড়া গত বছরে আরোপিত লকডাউন অব্যাহত রয়েছে। এই সময় লোকজনের বেশির ভাগ অধিকার প্রশাসন কেড়ে নিয়েছে। নির্বাচিত নেতৃত্বের সাথে আলোচনা ছাড়াই নতুন ডোমিসাইল আইন, নতুন মিডিয়া নীতিসহ নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

আমরা কাশ্মীরে কেবল বিদ্রোহ-দমন ও সরকারি প্রপাগান্ডা দেখছি। আমরা নাগরিক নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে দেখছি। গত দুই মাস ধরে একেবারে প্রতিটি দিন উপত্যকায় ঘেরাও ও অনুসন্ধান অভিযান চলছে।

Kashmir Interview_bn_1

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন ৫ আগস্ট-পরবর্তী অবস্থা কাশ্মীর ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণ করেছে, যা আগে কখনোই হয়নি? তাছাড়া আপনার কি মনে হয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন কাশ্মীর সঙ্ঘাত ও এর সমাধান নিয়ে আগের চেয়ে বেশি স্পর্শকাতর?

রাধা কুমার: না, আসলে তা নয়। পাকিস্তান যখন ১৯৪৭ সালে আক্রমণ করে তখন কাশ্মীর ‘আন্তর্জাতিকীকরণ’ হয় এবং পরবর্তী ১০ বছরের মতো জাতিসঙ্ঘের উত্তপ্ত আইটেম হিসেবে বহাল থাকে। তবে এরপর ভারত ও পাকিস্তান শান্তি আলোচনা শুরু করলে আন্তর্জাতিক এজেন্ডা থেকে এর অবনমন ঘটে। আমরা গত ২০ বছরের প্রেক্ষাপটে বলতে পারি, কাশ্মীর এ সময় খুবই গুরুত্বহীন আন্তর্জাতিক এজেন্ডা ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের আগস্টের পর তা আন্তর্জাতিক নজরে আসে। বর্তমনে কোভিড-১৯ ও চীনা সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক এজেন্ডাকে দখল করে রেখেছে। অদূর ভবিষ্যতে বিরূপ বিবৃতি ইস্যু করা ছাড়া বেশি কিছু হবে বলে মনে হয় না।

প্রশ্ন: অনেকে বলছে, গত বছরের ৫ আগস্ট যে পরিবর্তন ঘটেছে তা ছিল ‘আস্থার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা’। ভারতীয় ইউনিয়নে প্রবেশে রাজ্যটি যে আস্থা স্থাপন করেছিল, তা নাকচ করে দেয়া হয়েছে। আপনি কি এই ধারণার সাথে একমত?

রাধা কুমার: হ্যাঁ, আমি একমত। তবে আমি এর সাথে যোগ করব যে, আস্থার সাথে বিশ্বাসঘাতকতার চেয়েও বেশি কিছু করা হয়েছে। এটা ছিল ইনস্ট্রুমেন্ট অব এক্সেশনের লঙ্ঘন। এটি ভারতীয় এবং জম্মু ও কাশ্মীর সংবিধানের লঙ্ঘন। এটি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এটি গণতন্ত্রের লঙ্ঘন। মোদি প্রশাসন জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের প্রতি চরম তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করেছে।

প্রশ্ন: যেভাবে স্পেশাল স্ট্যাটাস বাতিল করা হয়েছে, তা কি বৈধ ছিল?

রাধা কুমার: যেসব লোক ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ওই মর্যাদা রদ করেছে, তাদেরকে যারা চ্যালেঞ্জ করেছে, আমি তাদের একজন। ফলে আমি বলছি, যেভাবে কাজটি করা হয়েছে তা বৈধ ছিল না।

Kashmir Interview_bn_2

প্রশ্ন: আপনি কি আশাবাদী যে সুপ্রিম কোর্ট যথাযথভাবে হস্তক্ষেপ করবে এবং ভুলগুলো শুধরে দেবে?

রাধা কুমার: আশাবাদী হওয়া কঠিন যখন আমরা কিছু শুনতে না পাই। আমাদের আবেদনটি গত অক্টোবর থেকে ঝুলে আছে।

প্রশ্ন: মূলধারার বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মোজাফফর হোসাইন বেগ তার এক সাক্ষাতকারে বলেছেন যে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ভারত সরকার কাশ্মীরে আজাদি থেকে স্বায়ত্তশাসনে ধারাটি বদলে দিতে পেরেছে। আপনি কি একমত?

রাধা কুমার: এমনটা হোক, আমি চাই। ভারত ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা এবং সেইসাথে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার প্রতিটি শান্তি আলোচনা হয়েছে স্বায়ত্তশাসন বা স্বায়ত্তশাসন প্লাসের ভিত্তিতে। আমি একেই সমাধানের ভিত্তি মনে করি। আমার ভয় হচ্ছে, ২০১৯ সালের আগস্টের পর থেকে আমাদের সরকার এখন পর্যন্ত যা করেছ তাতে করে স্বায়ত্তশাসন আর বেসলাইন হিসেবে থাকবে না, বরং এর স্থলাভিষিক্ত হবে আরো চরম কিছু। অবশ্য দীর্ঘ মেয়াদে বলা যায়, আমাদের বর্তমান প্রশাসন শান্তিপ্রতিষ্ঠার বিরোধী।

প্রশ্ন: অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল ছিল বিজেপির মূল এজেন্ডা। আপনি কি মনে করেন, এই পরিবর্তনের ফলে বিজেপি জাতীয় নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হবে?

রাধা কুমার: বিজেপির ২০১৪ সালেও এটি ছিল মূল এজেন্ডা। বস্তুত, ২০১৫ সালে তারা পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাথে মিলে জম্মু ও কাশ্মীরে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছিল। এ সময় তারা স্ব-শাসনে রাজি হয়েছিল। অর্থাৎ কিছু স্বায়ত্তশাসন তারা গ্রহণ করেছিল। ২০১৯ সালের ইস্তেহারেও ছিল। তবে ওই নির্বাচনে তারা পুলওয়ামা ও বালাকোটকে গুরুত্ব দিয়েছিল, অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলকে নয়।

Kashmir Interview_bn_3

প্রশ্ন: লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলে চীন-ভারতের মুখোমুখি অবস্থানকে কিভাবে দেখছেন আপনি। এর কি কোনো কাশ্মীর অ্যাঙ্গেল আছে?

রাধা কুমার: লাইনটি সুযোগসন্ধানী। চীনের সাথে আমাদের সীমান্ত অমীমাংসিত রয়েছে। সুবিধাজনক কিছু অবস্থান ছাড়া চীন সীমান্ত ইস্যু নিষ্পত্তি করতে চাচ্ছে না। সীমান্ত ইস্যু নিষ্পত্তির জন্য হাতে পাওয়া কিছু সুযোগও আমরা বোকার মতো হাতছাড়া করেছি। বিশেষ করে চীন যখন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ছিল, তখন তা কাজে লাগানো যেত। চীনের অর্থনীতি ও সামরিক বাহিনী অনেক বড় হয়ে যাওয়ায় তারা ভারতকে সংযত করার দিকে নজর দিয়েছে। ফলে আমাদের ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার সুযোগ চীন সরকার কখনো এড়িয়ে যাবে না। চীন সরকার ওই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোভিড নিয়ে ব্যস্ত। এই সুযোগে চীন পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়ার অংশবিশেষে আগ্রাসী নীতির সূচনা ঘটিয়েছে। হংকংয়ে তারা যা করছে, তা একটি উদাহরণ। তবে জিনজিয়াংয়ের উইঘুরদের সাথে তারা যা করছে, তা ভয়াবহ।

প্রশ্ন: ভবিষ্যতে জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণ ২০১৯ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাটি কিভাবে দেখবে বলে আপনি মনে করেন। তারা এটা গ্রহণ করবে না প্রতিরোধ করবে? এর ফলে তরুণরা কি জঙ্গিবাদে যোগ দিতে উদ্দীপ্ত হবে না তারা স্থিতিবস্থা গ্রহণ করে নেবে?

রাধা কুমার: এ ব্যাপারে কথা বলার সময় এখনো আসিন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমার মনে হচ্ছে, সশস্ত্র সঙ্ঘাত বাড়বে।

প্রশ্ন: কাশ্মীরে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকার আর কী করতে যাচ্ছে?

রাধা কুমার: দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি বিজেপির চিন্তাধারা বা পরিকল্পনা বুঝি না। আমার দূরের অবস্থান থেকে আমি তাদেরকে সামগ্রিকভাবে অযোগ্য মনে করি। উত্তরণের সময় তারা মাত্রাতিরিক্ত দম্ভে থাকে, ব্যর্থতার সময় না জানার ভান করে।