আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১

অর্থনৈতিক ইস্যু: ভারতের খামার পুনর্গঠন: ‘১৯৯১ সালের মুহূর্ত’?

Screenshot 2020-10-01 073916

কোভিড-১৯ এর বড় সঙ্কটের মধ্যেই ভারত সরকার সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকে খামার পুনর্গঠনের জন্য তিনটি আইন পাস করেছে। কিছু অর্থনীতিবিদ বলেছেন এই পদক্ষেপ শুধু কৃষি খাতকেই বদলে দেবে না, বরং সার্বিকভাবে অর্থনীতির উপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। 

তারা বলেছেন, এটাকে ‘১৯৯১ সালের মুহূর্তের’ সাথে তুলনা করা যায়। ওই বছর ভারতের শিল্পখাতকে বহু দশকের পুরনো ‘লাইসেন্স রাজ’-এর বোঝা থেকে মুক্ত করা হয়েছিল, যে আইনের অধীনে উৎপাদন, প্রতিযোগিতা ও আমদানির উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপিত ছিল। ওই সিদ্ধান্তের ফলে অর্থনীতির গতি বেড়ে গিয়েছিল, যেটা প্রায় ২০ বছর স্থায়ী হয়। 

কিন্তু সেই প্রসারটা এখন থমকে গেছে। তবে সেই সুবিধাটা ভারতের কৃষকদের জন্য প্রযোজ্য ছিল না, যেখানে দেশের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশই হলো কৃষক। রাজনৈতিক দলগুলো বারবার উচ্চাকাঙ্ক্ষী কৃষি পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু কখনও সেটা বাস্তবায়ন করেনি, কারণ দেখা গেছে, রাজনৈতিকভাবে সেগুলো অনেক স্পর্শকাতর। 

কৃষকদের বোঝা কমানো

তিনটি পুনর্গঠন কার্যকর হলে এগুলো এখন পরিবর্তন হতে শুরু করবে। 

একটা হলো তথাকথিত ইসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্টের (ইসিএ) সংশোধন। যেটাকে ১৯৫৫ সাল থেকে কার্যকর রয়েছে। 

এই আইনের অধীনে সরকার যে কোন সময় গুদামজাত করে দাম বাড়ানো ঠেকাতে খাদ্য গুদামজাতের পরিমাণের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরাও এ ধরণের একটি আইন কার্যকর করেছিল। 

জরুরি পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষের সময়ের জন্য এই আইন প্রযোজ্য হলেও বাস্তবে স্বাভাবিক সময়েও এটার ব্যবহার হয়েছে। 

এর ফল হয়েছে নেতিবাচক এবং কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই এখানে ক্ষতির শিকার হয়েছে। 

একটা সহায়ক চক্র

এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সমর্থক শুধু ভারতীয় জনতা পার্টিই (বিজেপি) নয়, বরং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশান্সের ড. অশোক গুলাটি এবং নয়াদিল্লীর ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব পাবলিক ফাইনান্স অ্যাণ্ড পলিসির ড. ইলা পাটনায়েকের মতো নিরপেক্ষ কৃষি অর্থনীতিবিদরাও এটাকে সমর্থন করেছেন। 

তারা উল্লেখ করেছেন যে, সম্মিলিতভাবে এই পুনর্গঠন একটা বড় প্রভাব ফেলবে বিশেষ করে কৃষকদের উপরে। তবে অর্থনীতির উপরও প্রভাব পড়বে এটার। 

এটা বাস্তবায়িত হলে অন্যের উপর থেকে নির্ভরতা কমবে কৃষকদের, তারা আরও ভালো মূল্য পাবে এবং তাদের আয়ের একটা ধারাবাহিকতা আসবে। 

তারা খাবারের আরও ভালো দাম নির্ধারণ করতে পারবে, যেটার কারণে মূল্যস্ফীতি আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং ভোক্তাদেরকেও এটা সুবিধা দেবে। কৃষকরা সরাসরি রফতানিকারকদের সাথে লেনদেনের সুযোগ পাওয়ার কারণে খাদ্যের রফতানিও বাড়বে। 

চীনের শিক্ষা

চীনের নেতা দেং শিয়াওপিংয়ের অধীনে ১৯৭৮ সালে কৃষি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চালুর পর সরকার একটা সহায়ক চক্র গড়ে তুলেছিল। 

এর আগে, কৃষকরা ছিল জনসংখ্যার একটা বড় অংশ এবং তারা মূলত একটা সম্প্রদায়ের মধ্যে কাজ করতো। তারা শুধু সরকারের কাছে শস্য বিক্রি করতে পারতো এবং তাদের উৎপাদনও শস্যের মধ্যে সীমিত রাখতে হতো। 

কিন্তু পুনর্গঠনের পর, তারা এখন প্রাইভেট খামারের জন্য  জমি লিজ দিতে পারে এবং তাদের উৎপাদিত ফসলের অংশ বাজার দরে যার কাছে খুশি বিক্রি করতে পারে। 

তাছাড়া তারা কি উৎপাদন করবে, সেটাও তারা নির্ধারণ করতে পারে। অনেকেই শস্য উৎপাদন কমিয়ে ফল, সবজি ও পশুখাদ্যের উৎপাদন শুরু করেছে, যেগুলোতে মুনাফা আরও বেশি। 

তাদের আয় বাড়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিও প্রবৃদ্ধির পেছনে চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। 

বিরোধীদের চাপ

কিন্তু এই পুনর্গঠনের সিদ্ধান্তগুলো বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। সব রাজনৈতিক দল এটাকে সমর্থন করেনি। এদের মধ্যে বিজেপির কিছু মিত্রও রয়েছে। 

পার্লামেন্টে কণ্ঠভোটে পুনর্গঠন বিল পাস করা হয়েছে। যে পক্ষে শব্দ বেশি হয়েছে, তাদের পক্ষে রায় দেয়া হয়েছে, এবং কোন গণনা করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উচ্চকক্ষে সোরগোল হয়েছে। 

হাজার হাজার কৃষকরাও আপত্তি জানিয়েছে, মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে তারা প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে। 

তাদের আপত্তি অনেক রকম। কৃষকরা ভয় পাচ্ছে যে, তাদের নিজের পণ্য বাজারজাত করার স্বাধীনতা দেয়ার নামে সরকার ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ নীতির জায়গা থেকে সরে যাবে, বিশেষ করে শস্য জাতীয় ফসলের ক্ষেত্রে যে মূল্যটার জন্য কৃষকদের নিশ্চয়তা দেয়ার কথা সরকারের। 

সঙ্কটকে অপচয় করতে নেই

এটা বোঝা যাচ্ছে যে, ক্ষমতাসীন বিজেপি খামার পুনর্গঠনের জন্য কোভিড-১৯ মহামারীর সুযোগটা নিয়ে দ্রুত এগুনোর চেষ্টা করছে এবং এ ব্যাপারে তারা এমনকি মিত্রদের সাথেও কথা বলেনি। 

১৯৯১ সালের শিল্প পুনর্গঠনের সময়ও সেটা হয়েছিল। একটা ঋণ পরিশোধের সঙ্কটের সময় পি ভি নরসিমা রাওয়ের নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু একটা সরকার ভালো মতো বিতর্ক ছাড়াই সেটা পাস করেছিল। 

ভারতের সরকারগুলো এই শিক্ষা নিয়েছে যে, সঙ্কটের সময়গুলো অপচয় করতে হয় না, এবং এটাই আসলে স্পর্শকাতর পুনর্গঠণের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের আদর্শ সময়, কারণ স্বাভাবিক সময়ে নানা ধরণের রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।