আমরা লাইভে English রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

কাশ্মীর থেকে মেঘালয়: দেশের ভেতরেই শত্রু

enimy-within

সাম্প্রতিক অতীতজুড়ে ভারত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ‘বন্ধুদের’ মধ্যে তার অবস্থান কেবল হারাচ্ছে। দেশটি প্রতিবেশীদের সাথে বন্ধুত্ব লালন করার বদলে সম্ভবত শক্তি প্রয়োগ করেছিল, বড় ভাইসুলভ পেশী প্রদর্শন করেছিল, কিন্তু এখন এমনকি ওই বাধ্যবাধকতাপূর্ণ বন্ধুত্বেও টানাপোড়ন দেখা যাচ্ছে। নেপাল সাহসিকতার সাথে তার ভূখণ্ডগত দাবি প্রকাশ করেছে। পাকিস্তান কখনো ভারতের শক্তি প্রদর্শনীতে ভীত হয়নি, ভারতও এই প্রতিবেশীর পরমাণু শক্তি ও সামরিক ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত রয়েছে। অন্য দেশগুলোও সামান্য যে আনুগত্য প্রদর্শন করছিল, তাও ত্যাগ করছে। এমনকি দৃঢ় ও অবিচ্ছেদ্য বন্ধু বাংলাদেশ এখন কিছু সময় ধরে পূর্ব দিকে তাকাচ্ছে, আর চীন বিনিয়োগ ঢালছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি সম্ভবত পুরোপুরি ঢেলে সাজানো উচিত। আঞ্চলিক বিশ্লেষকেরা এমনটাই মনে করছেন।

অবশ্য, কেবল সীমান্তে অবস্থিত দেশগুলোই ‘প্রতিবেশীদের ওপর বল প্রয়োগে’ ভারতের ভূমিকার কারণে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছে তা নয়। দেশের ভেতরেও, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোও মোহমুক্তির কারণে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছে। অবহেলিত, নিপীড়িত ও উপেক্ষিত হয়ে এসব রাজ্যের লোকজন দেশের অন্তর্ভুক্ত থাকার অনুভূতি হারিয়ে ফেলছে। ভারত যদি তাদের যত্ন না করে, তবে তারা আর কত দিন ভারতের প্রতি যত্নশীল থাকতে বলে প্রত্যাশা করা যায়?

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এই অসন্তুষ্টি দৃশ্যমান হয়েছে। বস্তুত, সেখানে এমনকি বাংলাদেশে যোগদান নিয়ে পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে! অনেক লোক অবহেলিত ও বঞ্চনার মধ্যে না থেকে উন্নয়নের স্বার্থে এই বিকল্পের কথা বলেছেন।

Lifts-SAM Special-Bangla-6 July 2020-1

প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্ত-সংলগ্ন মেঘালয়ের গ্রামবাসীরা চারটি গ্রাম ও এর অধিবাসীদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ করেছেন। সরকার তাদের জন্য একটি ভালো রাস্তা নির্মাণ করে না দেয়ায় তারা হতাশ। এটি তাদের জন্য একটি অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন ইস্যু হিসেবে দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে মোবাইল কানেকটিভিটি ও চিকিৎসা সুবিধার অভাবে। সরকার তাদেরকে বঞ্চিত করায় অত্যন্ত মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্যও তাদেরকে বাংলাদেশের দিকে তাকাতে হয়।

আরও পড়ুনঃ কাশ্মীরে একবিংশ শতকের গ্রেট গেম

মেঘালয় হলো ‘সাত বোনের’ মাত্র একজন। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই সাতটি রাজ্যই দিল্লির কাছে পুরোপুরি উপেক্ষিত রয়েছে। অনেক দিন থেকেই সেখানে বিদ্রোহ ধূমায়িত হচ্ছে, লোকজন মনে করে, ভারত তাদের নিজের বলে মনে করে না বা মালিকানার কোনো অধিকার আছে বলে অনুভব করে না। লোকজনকে শান্ত করা ও খনিজসম্পদপূর্ণ অঞ্চলটির উন্নয়ন না করে সরকার যেকোনো প্রতিবাদ দমনের জন্য তার নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করার মাধ্যমে লোকজনের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

দেশটিতে এসব নতুন কিছু নয়। অন্যদিকে পাকিস্তান-সংলগ্ন দেশের পশ্চিম অংশে ব্যাপকভাবে অন্যায় ও ট্রাজিক বিদ্যমান। লোকজনের মধ্যে চাপা ক্রোধের কারণ বোধগম্য। এটা হলো কাশ্মীর, ভারতীয় অধিকৃত কাশ্মীরের অংশবিশেষ। এই অঞ্চলের স্থিতিবস্থা গোপন কিছু নয় এবং এগুলো নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। তবে অনেক সময় কিছু ঘটনা ধর্ষকাম নৃশংসতার তীব্রতা থাকে। এটা কি ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে চরম ও কঠোর সমালোচনার মতো শোনায়?

এই কাশ্মীরের রাজপথেই সম্প্রতি চরম নৃশংস ঘটনা দেখা গেছে। ক্যামেরায় ধারণা করা এই ছবিটি কেবল এই অঞ্চলে নয়, গোটা বিশ্বকে শোকাহত করলেও ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্টের বিবেককে সম্ভবত নাড়া দিতে পারেনি।

ছবিটিতে দেখা যায়, একটি ছোট্ট বালক তার দাদার বুকের ওপর বসে আছে। শিশুটি অবশ্যই আরো অনেকবার তার প্রিয় দাদার বুকে বসেছিল, খেলেছিল, হেসেছিল, কথা বলেছিল। কিন্তু এবার ছিল ভিন্ন। এবার তার দাদা আর জীবিত ছিলেন না।

Lifts-SAM Special-Bangla-6 July 2020-2

উত্তর কাশ্মীরের সাপরে দাদার লাশের ওপর বসে তিন বছরের শিশুটি কাঁদছিল। সে ক্রসফায়ারে পড়ে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সে দেখেছে, তার দাদাকে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। একটি শিশু এ ধরনের কষ্ট কিভাবে সহ্য করবে? এই ক্ষত কিভাবে সে সারা জীবন বয়ে বেড়াবে? কিন্তু কাশ্মীর, নাগাল্যান্ড, ঝাড়খণ্ডসহ ভারতের উত্তপ্ত অনেক অঞ্চলের অনেক শিশু এ ধরনের দৃশ্য, এ ধরনের নির্মমতা থেকে মুক্ত নয়।

আরও পড়ুনঃ কেন হাতে অস্ত্র তুলে নিচ্ছে এত বেশি সংখ্যক কাশ্মীরী যুবক

ভারতের মুসলিমরা কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করছে, তারা এখন অ-নাগরিক হিসেবে বহিষ্কৃত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। আপনি যদি বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম হন, তবে আপনাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হতে পারে। অথচ বাংলাদেশ আপনি জীবনেও দেখেননি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলবে, তুমি অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে প্রবেশ করেছ। দেশটির অন্যান্য অংশে ধর্মের কারণে মুসলিমেরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। এর বাইরে অন্য কিছু কিভাবে প্রত্যাশা করা যেতে পারে? গুজরাটের স্মৃতি সজীব রয়েছে।

ভারত ইতোমধ্যেই আঞ্চলিক পরাশক্তির দাবি করছে। সে বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে গর্ব করে। সে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে অহংকার করে। কিন্তু এই ছদ্মবেশ কতক্ষণ ধরে রাখা যাবে? নিজ দেশের লোকজনের কাছে আড়াল করা যায়নি। আপনার পেট যখন খালি থাকে, কিংবা আপনার দেহে যখন বুলেট বাসা বাঁধে, তখন বাগাম্বড়তায় আপনি বোকা বনবেন না। 

তাহলে ভারত কোন দিকে যাচ্ছে? তার ‘উজ্জ্বল’ ছবির চাকচিক্যময় অবস্থা ফুরিয়ে গেছে। সে মানবতা ও ন্যায়বিচারের প্রান্তসীমা অতিক্রম করছে। এর প্রতিক্রিয়াতেই লোকজন হয়তো সীমান্ত পরিবর্তন চাচ্ছে। অপর প্রান্তের ঘাষ সম্ভবত বেশি সবুজ। মেঘালয়ের ওইসব গ্রামবাসীর উদ্দীপনা যদি কোনো ইঙ্গিত দিয়ে থাকে, তবে তারা হয়তো ব্যাগ, ব্যাগেজ ... ও ভূমি নিয়ে সীমানা অতিক্রম করতে পারে!