আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১

ভারতে হিন্দুরা সঙ্কটে থাকার কারণ তাদের জাতপ্রথা

ISSUE-3-ENG-29-09-2020-India (1)

হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠিগুলো দক্ষতার সাথে একটা জিনিসের প্রচার করেছে যে, ‘সেক্যুলার’ ভারতে হিন্দুদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে গেছে। তাই হিন্দু পরিচয়কে নতুন করে তুলে ধরতে হবে এবং ভারতকে হিন্দু দেশে পরিণত করতে হবে। ‘হিন্দু খাতরে মে হ্যায়’ – এই প্রচারের অস্ত্র হিসেবে তারা অভিযোগ করছে যে, মুসলিমদের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং মিশনারীদের হাতে খ্রিস্টান ধর্মান্তরের সংখ্যা বাড়ছে। 

সন্দেহ নেই যে, এই অর্ধ-সত্য কথা ভারতের হিন্দুদের একটা বড় অংশের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছে, যদিও ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা সবসময় বাড়ছে এবং হিন্দুরা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে হিন্দুদের হাতেই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। 

মুসলিম আর খ্রিস্টানদের হিন্দুদের জন্য হুমকি হিসেবে প্রচারের ক্ষেত্রে ভালোই সফল হয়েছে হিন্দুত্ববাদী শক্তির মূল সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)। একই সাথে ব্রাহ্মণ-আধিপত্যের আরএসএস ৩০০০ বছরের পুরনো অশুভ জাত প্রথা সংরক্ষণের জন্যও সম্ভাব্য সবকিছু করেছে। আরএসএস তাদের জাতের শ্রেণীভেদের প্রতি এতটাই দায়বদ্ধ যে, তারা ভারতের আধুনিক সংবিধানের পর্যন্ত বিরোধীতা করে, কারণে ভারতের সংবিধানের অন্যতম ভিত্তি হলো মনু-স্মৃতি। ভারত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলত রাষ্ট্র, যেখানে জাত, ধর্ম ও লিঙ্গের উর্ধ্বে সবার সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু আরএসএস সেটাকে মানে না। 

বিভক্ত সমাজ

হিন্দু জাত প্রথার মধ্যে সামাজিক স্তরকে চার ভাগে ভাগ করে দলিত ও উপজাতিদেরকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। সবার উপরে হলো ব্রাহ্মণ, যারা ভারতের হিন্দু জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। ভারতের জাত ব্যবস্থার মধ্যে প্রায় ৩০০০ জাত এবং ২৫,০০০ উপজাত রয়েছে। 

ভারতের সংবিধানের প্রণেতা ড. বি আর আম্বেদকার সঠিকভাবেই বলেছিলেন: “ভারতে যতদিন পর্যন্ত জাত প্রথা থাকবে, হিন্দুদের বিভিন্ন জাতের মধ্যে সম্পর্ক হবে না বা বাইরের মানুষের সাথেও তাদের মিল হবে না এবং হিন্দুরা যদি পৃথিবীর অন্য কোথায় চলে যায়, তাহলে এক জাত প্রথা একটা বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে”।

কঠোর জাত প্রথা

জাতের বাইরে বিয়ে করার বিষয়টি এখনও স্বাভাবিক হয়নি এবং এ ধরণের বিয়ে করলে তাকে সামাজিকভাবে পরিত্যজ্য করা থেকে নিয়ে তাকে ‘অনার’ কিলিংয়ের শিকার পর্যন্ত হতে হয়। ইউনাইটেড নেশান্স পপুলেশান ফাণ্ডের হিসেবে ভারতে প্রতি বছর ৫০০ নারী ও মেয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়। আবার অনেক ঘটনায় নিম্ন জাতের মানুষকের উচ্চ জাতের হাতে নিহত হয়। 

বিয়ের বাইরে জাত প্রথার অন্যান্য বৈষম্যের দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় প্রার্থনা ও খাবার। ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানের সাথে সাথে, ধর্মীয় স্থান ও খাদ্যাভ্যাস রাজনৈতিক ইস্যুতে জায়গা করে নিচ্ছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর জরিপে দেখা গেছে যে, দলিতদের বিরুদ্ধে অপরাধের মাত্র অনেক বেড়ে গেছে। 

জাতের শ্রেণীক্রম ও দমন

উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, ও মধ্য প্রদেশে দলিত ও নিম্ন জাতের বিরুদ্ধে সহিংসতা স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে গেছে। এমনকি মিডিয়াও এগুলোকে গুরুত্ব দেয় না। এগুলোর অধিকাংশের সাথে ভুক্তভোগীদের জাতের স্তরের বিষয়টি এবং সেটা মানতে তাদের অস্বীকার করার বিষয়টি জড়িত। নিম্নজাতের মানুষদের দমনের জন্য ধর্ষণকে মূলত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভারতে প্রতিদিন অন্তত চারজন দলিত নারী ধর্ষিত হয়। উপজাতীয় নারীরা এমনকি নির্যাতনের শিকার হয় আরও বেশি। 

ভারতের জাত-সহিংসতা

ন্যাশনাল দলিত মুভমেন্ট ফর জাস্টিস জানিয়েছে যে, ২০২০ সালের এপ্রিল ও মে মাসে দলিতদের উপর হামলার মাত্রা আগের বছরের একই সময়ের তুলায় ৭২ শতাংশ বেড়েছে। জাত কেন্দ্রিক সহিংসতার চেয়েও করোনাভাইরাসে বেশি মারা যাচ্ছে দলিতরা। দলিত আর নিম্ন জাতের অভিবাসী শ্রমিকরা নিজেদের গ্রামে ফিরে যাওয়ায় তাদের উপর উচ্চবর্ণের হামলার মাত্রা বেড়েছে, কারণ সীমিত সম্পদের দখল নিয়ে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়ে গেছে। 

ভারত দলিত, উপজাতি গোষ্ঠি, এবং নিম্ন বর্ণের মানুষদের সমাজের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে করুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এদের অনেকেরই হতাশা বাড়ছে এবং সামাজিক রূপান্তরের ব্যাপারে তারা আশা হারাচ্ছে, কারণ উচ্চবর্নের হিন্দুত্ববাদী শক্তি এখন দেশের কেন্দ্র দখল করেছে এবং রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াটাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।