আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, জুন ১৭, ২০২১

কলকাতার চায়না টাউনের পছন্দ মমতা?

57073474_303

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় গালওয়ানে ভারত ও চিনের জোরদার সামরিক উপস্থিতি এবং করোনা মহামারী নিয়ে ২০২০ সাল বেশ কষ্টেই কেটেছে কলকাতা তথা ভারতের প্রাচীনতম চায়না টাউনের বাসিন্দাদের। করোনা আতঙ্কে রেস্তোরাঁগুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির বাইরে কেউ বেরোতে পারছিলেন না। অতি উৎসাহী দেশপ্রেমীদের অন্ধ রোষ সামলাতে স্থানীয় প্রশাসন তাদের সাহায্য করেছে। পাশাপাশি লকডাউনে প্রশাসনই খাবার পৌঁছেছে তাঁদের বাড়ি। বছর ঘুরতে না ঘুরতে এসে পড়েছে বিধানসভা ভোট। গত লোকসভা ভোটে চোখে পড়েছে চীনাপাড়ার দেয়ালে দেয়ালে ভোটের প্রচার— ‘তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিন'। তবে বাংলা অক্ষরে নয়, হরফগুলি ম্যান্ডারিন ভাষায়। এবারের বিধানসভা ভোটেও একই ছবি। চোখে পড়ল, তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী, এন্টালির বিদায়ী বিধায়ক স্বর্ণকমল সাহার নামও দেয়ালে চীনা ভাষায় লেখা। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, "প্রতি বছরই তারা এমন দেয়াল লেখেন। আগে যে পরিমাণ চীনা ছিলেন, এখন তা নেই। তাদের সঙ্গে আমাদের হৃদ্যতা খুব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তারা পছন্দ করেন। তাই আমার নামে দেয়াল লিখেছেন।”    

১৯৭০ সাল থেকে চীনারা ট্যাংরা-তপসিয়ায় স্থায়ী বাসিন্দা। স্বাধীন ব্যবসার পাশে ধর্মতলা থেকে পার্ক স্ট্রিটে বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁর সঙ্গে যুক্ত তারা। আবার তাদের পরিবারের অনেকেই এ দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কলকাতার বাকি জনগোষ্ঠীর তুলনায় সংখ্যায় তারা খুবই কম। অভিযোগ ওঠে, তারা অবহেলিত।

অপরিকল্পিত নগরায়ন

চল্লিশটির বেশি চীনা রেস্তোরাঁ, বহু ছোট খাবারের দোকান, চীনা সস কারখানা নিয়ে যথেষ্ট ঘিঞ্জি এই এলাকা আদতে অতীতে গড়ে ওঠা এক অপরিকল্পিত নগর। কলকাতা পুরসভার ৫৮ এবং ৬৬ নং ওয়ার্ডে বর্ষাকালে জল জমে, বাড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ। রাস্তাঘাটের দৈন্যদশা। চীনাপাড়ার বাসিন্দা ৬৬ বছরের বৃদ্ধ লি ইয়াও সিয়েন বলেন, "প্রশাসনকে বছরের পর বছর এই সমস্যার কথা বলেছি। আমরা এলাকার ভোটার। কর দিই। তাও এই বিষয়গুলি দেখা হয় না।” স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকার অধিকাংশ স্থানে আলো, পানীয় জল নেই। অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর তৈরি, জলাভূমি ভরাট করা-সহ নানা অপরাধমূলক কাজকর্মের আখড়া। দক্ষিণ কলকাতার বিজেপি যুব মোর্চার সভাপতি দেবাশিস নাথ বলেন, "এখানে মানুষের জীবনযাপন খুবই নিম্নমানের। সবার আগে চায়না টাউনে নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি দরকার। কিছু নেতার মদতে অলিখিতভাবে পুকুরগুলো ভরাট হচ্ছে। সেটা বন্ধ করতে হবে।”

পরিবেশ দূষণ

চীনাপাড়ার বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ বংশ পরম্পরায় চর্মশিল্পের সঙ্গে যুক্ত সেই অতীত থেকে। ৩৫০টির বেশি ট্যানারি বানতলায় কলকাতা লেদার কমপ্লেক্সে স্থানান্তরিত হলেও কিছু ট্যানারি এখনও সরানো যায়নি। পাশাপাশি বেআইনি ট্যানারিও আছে। পরিবেশবিদরা বারবার বলছেন, দূষণ কমানো যায়নি।

পরিবেশকর্মী নব দত্ত ডয়চে ভেলেকে বলেন, "ট্যানারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রিত নয় বলেই বিদ্যেধরী নদীতে মাছের সঙ্কট। মিনাখাঁ, হাড়োয়াতে মৎসজীবীরা সমস্যায়। বারবার আন্দোলন করেছি। কোনো সুরাহা হয়নি।” কিন্তু কেন? অভিযোগ আছে, ট্যানারির মালিকদের থেকে কোটি কোটি টাকা তোলা আদায় করা হয়। তাই পরিবেশ বা দূষণবিধি নিয়ে ট্যানারি মালিকরা মাথা ঘামান না।

ভোটের লড়াই

গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের কসবা বিধানসভার প্রার্থী জাভেদ আহমেদ খান ১১,৮৮৪ ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলেন। তিনি রাজ্যের মন্ত্রীও বটে। সিপিএমের শতরূপ ঘোষ ছিলেন তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী। ডয়চে ভেলেকে শতরূপ বলেন, "চায়না টাউন এলাকায় যারা বাংলায় কথা বলেন, তাদেরও যা সমস্যা, যারা চীনা ভাষায় কথা বলেন, তাদেরও একই সমস্যা। পুরো এলাকায় বেকারত্ব, গুণ্ডারাজ, অনুন্নয়ন।” তার দাবি, "এলাকার বড় বড় ঝিল, পুকুর বেআইনিভাবে ভরাট করে বড় বড় বিল্ডিং বানানো হচ্ছে। মোটা টাকার বিনিময়ে জাভেদ খানের প্রশাসনই এসব করাচ্ছে।” এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগ করা হলে জাভেদ আহমেদ খান ফোন ধরেননি।

বড় বড় রেস্তোরাঁ, সুখাদ্যের ঘ্রাণ, চামড়ার শৌখিন দ্রব্যের দোকান পেরিয়ে চীনাপাড়ার অন্ধকার গলিতে এসে দাঁড়ালে অস্বস্তি হতে পারে। বাসিন্দারা অনেকেই সন্দেহের চোখে তাকিয়ে থাকেন, মন খুলে কথা বলতে চান না। তারা ভোট দিতেও কিছুটা ভয় পাচ্ছেন বলে অভিযোগ। কসবার বিজেপি প্রার্থী ডাঃ ইন্দ্রনীল খাঁ ডয়চে ভেলেকে বলেন, "ডেঙ্গু বা দূষণ ছাড়াও সিন্ডিকেটরাজ, অপরাধমূলক কাজকর্মের জেরে এলাকার মানুষ যথেষ্ট ভীত। ভোট দিতে পারবেন কিনা সে ব্যাপারে তারা উদ্বিগ্ন।”