আমরা লাইভে English বুধবার, অক্টোবর ২৭, ২০২১

বাইডেন আমলের আতঙ্ক তাড়া করছে ভারতকে

ISSUE-1-ENG-09-11-2020-India

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট আমলটি টি এস ইলিয়টের ওয়েস্ট ল্যান্ডে উল্লেখ করা ‘আকাঙ্ক্ষার সাথে মেশানো স্মৃতির’ সময়ে পরিণত হতে পারে। প্রথম দর্শনে ভারতের প্রতি মনোভাবের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেয়ার তেমন কিছুই নেই। ভারতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রে সমঝোতা আছে। কিন্তু তারপরও ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়ে গেছে। 

ভারতীয় বিশ্লেষকেরা তাদের উদ্বেগ গোপন করতে পারছেন না যে বাইডেনের আমলে ভারতের মানবাধিকার রেকর্ডের কারণে মোদি সরকার কঠিন অবস্থায় পড়তে পারে। প্রবল চাপ ভারত কিভাবে সামাল দেবে- তার চেয়ে ভারতকে কতটুকু চাপ প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনে সম্মিলিত ধারণা রয়েছে। আবার ভারতের বৈদেশিক হস্তক্ষেপ থেকে তার মূল স্বার্থগুলো আলাদা করার অভিজ্ঞতাও আছে বিপুল। 

ভারত যেভাবে কাশ্মীরকে পরলোকগত ‘আফ-পাক’ সনদ থেকে আলাদা করতে পেরেছিল, তা ভারতীয় কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। উইকিলিকস দিল্লীতে মার্কিন দূতাবাস থেকে ভয়াবহ অনেক তথ্য প্রকাশ করেছিল এ নিয়ে। 

২০১৪ সাল থেকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিচ্যুতি নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যে বিদ্যমান সংশয়কে অবমূল্যায়ন করা যায় না। ফলে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা ও মুসলিমবিরোধী অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কে প্রভাব বিস্তার করবে। অবশ্য তা দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের মধ্যে বাধার প্রাচীর হয়ে নাও দাঁড়াতে পারে। 

ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্য থাকা প্রভাবশালী কণ্ঠগুলো- বার্নি স্যান্ডার্স, ন্যান্সি পেলোসি ও প্রমিলা জয়পাল এবং খোদ কমলা হ্যারিস- উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিনিধি পরিষদের আবহ ভাইডেনের ভারতনীতি নির্ধারণ করে দেবে। বস্তুত, মার্কিন রাজনীতির বিশেষ স্পর্শকাতর সময়ে মোদি সত্যিই পীড়াদায়ক অবস্থায় থাকবেন। 

একইভাবে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সুস্পষ্টভাবেই বামপন্থার দিকে সরে গেছে। আমেরিকান ব্যতিক্রমধর্মিতা আর যে বিশ্বাসযোগ্য বিবেচিত হচ্ছে না। 

বাইডেনের নজর থাকবে অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলোর দিকে। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে বাইডেন বুঝতে পারছেন যে ট্রাম্পের ব্যাপক অস্বীকৃতি নির্বাচনে প্রত্যাশিত মাত্রায় কাজ দেয়নি। ডেমোক্র্যাটরা নৈতিক বিজয় কামনা করেছে, কিন্তু তা হয়নি। বরং আমেরিকান রাজনীতির বিভাজন আরো বেড়েছে। 

এই ব্যতিক্রমী সময়ে যদি কেউ দুই পক্ষের মাঝ দিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন, ঐকমত্য বা অভিন্ন ভিত গড়তে পারেন, তবে তিনি হলেন বাইডেন। আর তিনিও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত। 

এ কারণে পররাষ্ট্রনীতি বাইডেনের অগ্রাধিকারের বিষয় নয়। আর ভারতও সম্ভবত পররাষ্ট্রনীতিতে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় হবে না। অবশ্য জলবায়ু পরিবর্তন, কোভিড-১৯, মহামারি-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ইরানের পরমাণু বিষয় বা আফগানিস্তানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভারত তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থানেই থাকবে। 

ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন ব্যক্তিগতভাবে আফগান সমস্যার সাথে জড়িত ছিলেন বব উডওয়ার্ডের গ্রন্থ ওবামার ওয়ারে বাইডেনের যুদ্ধ ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। 

বইতে বলা হয়েছে, রোববার সকালে বাইডেন হোয়াইট হাইসে ছুটে গিয়ে আফগানিস্তানে সৈন্য বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শেষ আবেদনটি জানিয়ে বলেছিলেন, তা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের মতো কঠিন অবস্থায় পড়ে যাবে। 

বাইডেনের লক্ষ্য সবসময় একই নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তা হলো তালেবানকে সংযত করা, আল-কায়েদার হুমকি প্রতিরোধ করা এবং সৈন্যদের দেশে ফিরিয়ে আনা। তা ছিল ২০০৯ সালের মধ্যভাগের ঘটনা। এরপর কাবুল নদী দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। তবে অতীতের রেশ রয়ে গেছে। 

প্রথমত, বাইডেন যদি হামিদ কারজাইয়ের সক্ষমতা নিয়ে সংশয়ে থেকে থাকেন, তবে তিনি আশরাফ ঘানির সামর্থ্য নিয়ে আরো বেশি সন্দিহান থাকবেন। দ্বিতীয়ত, বাইডেন জানেন, জেনারেলরা যুদ্ধে জয়ের ব্যাপারে তাদের অভিমতে ভয়াবহ মাত্রায় ভুল করছেন। তৃতীয়ত, বাইডেনের নেটওয়ার্ক আফগানিস্তানবিষয়ক পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের সাথে সম্পর্কিত এবং পাকিস্তানের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে তার অনাস্থা রয়েছে, পাকিস্তান যে দ্বিমুখী আচরণ করতে পারে, তাও তিনি জানেন। ফলে দোহা চুক্তি টিকবে না। 

এসব ভারসাম্যমূলক প্যারামিটারের আলোকে বাইডেন সম্ভবত আফগানিস্তানে সামরিক-গোয়েন্দা উপস্থিতি বজায় রাখতে চাইবেন, তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চেয়ে সন্ত্রাস প্রতিরোধেই বেশি নজর দেবেন। 

দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা হ্রাস পেতে পারে। চীনা নীতির কারণে ভারত নতুন করে ভাবতে পারে। বাইডেনের চীনা নীতিতে দিল্লীর সহযোগিতা সহায়ক হলেও তা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে না। আর যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় হবে দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান, এশিয়া-প্যাসিফিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা। কিন্তু এসব স্থানে ভারতের গুরুত্ব খুব বেশি নয়। 

আমেরিকার স্বার্থেই ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করে যাবে। কিন্তু তারা এ নিয়ে চীনের সাথে যুদ্ধ করবে না। চীনকে দমনের জন্য ভারতকে সামনে আনার কাজ বাইডেন কোনোভাবেই করবেন না। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত নেতৃত্বে কোয়াড সম্ভবত তার সুখপূর্ণ সময়টি অতিক্রম করে ফেলেছে। 

বুশের আমল থেকে ভারতে সামরিক সরঞ্জাম রফতানির ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসন যেভাবে আগ্রহ দেখিয়ে আসছিল, বাইডেনের আমলে তা সম্ভবত বহাল থাকবে। বাইডেনও ভারতে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। কিন্তু চীনকে মাত্রাতিরিক্ত বড় করে দেখানো হবে না। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাইডেনের আমলে অব্যাহত থাকলেও এর মাত্রা পরিবর্তন হবে বলে ধারণা করা যেতে পারে। 

বাইডেন ইরানের সাথে আলোচনা আবার শুরু করার ওপর বিপুল গুরুত্ব দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি সম্ভবত ওবামা প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়নে ফিরে যাবেন। আর সেইসাথে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট হ্রাস পেতে পারে। 

এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের নীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ট্রাম্পের আমলে ভারত তার ঐতিহ্যবাহী অবস্থান ত্যাগ করে ইসরাইল-সৌদি-আমিরাতি কক্ষে প্রবেশ করেছে। বাইডেন প্রশাসন এই অক্ষ থেকে তার প্রতিশ্রুতি সরিয়ে নিয়ে ইরানের সাথে সম্পৃক্ত হলে ভারতকেও নতুন বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। 

মোদি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন ট্রাম্পের ওপর। কিন্তু এখন ট্রাম্পের পরাজয় ও পম্পেওর অবসরের ফলে ভারতকে নতুন করে ভাবতে হবে। তাতে তার নীতি পুনর্বিবেচনা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।