আমরা লাইভে English শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২১

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন নিয়ে এত সহিংসতা কেন

prothomalo-bangla_2021-04_e625d4cc-3de7-471d-8302-fa4754c9d574_18beda4c-d88b-4c9f-b9ef-f4442ef6bdaf

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের উত্তাপ বেড়েই চলেছে, প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে সহিংসতার ঘটনা। মূল দুই পক্ষ—তৃণমূল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রধানত পরস্পরকে আক্রমণ করছে আর তুলনামূলকভাবে বিজেপির কর্মী মারা যাচ্ছেন বেশি।

পশ্চিমবঙ্গের সহিংসতার সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটু চোখ বোলানো যাক। হিংসার হিসাবটা ২০২০ সালের শেষের দিকে আমাকে পাঠিয়েছিল তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দল—তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি ও সিপিআইএমের (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্ক্সিস্ট) প্রচার বিভাগ।

তৃণমূলের হিসাব হলো ১৯৯৮ থেকে ২০২০ সালের শেষ পর্যন্ত তাদের ১ হাজার ৬৭ জন মারা গেছেন, অর্থাৎ বছরে গড়ে ৯০ জন। সিপিআইএম জানাচ্ছে, ২০০৯ সালের মে মাস থেকে ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যে মারা গেছেন তাদের ৬১৫ জন, অর্থাৎ গড়ে বছরে ৬২ জন। বিজেপির তরফে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত ফেব্রুয়ারি মাসে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে তাদের ১৩০ জনের বেশি কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে।

এই রাজনৈতিক হিংসা ও হত্যা যে সম্প্রতি শুরু হয়েছে, তা নয়। মানবাধিকারকর্মী সুজাত ভদ্র ও পূর্ণেন্দু মণ্ডল তাঁদের বই পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হত্যা, ১৯৭৭-২০১০, একটি সমীক্ষাতে জানিয়েছেন ওই সময়ে বিভিন্ন দলের ৩ হাজার ৯৫৫ জনের বেশি রাজনৈতিক কর্মী মারা গেছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ১০০–এর বেশি কর্মী বামফ্রন্টের।

এর আগের তথ্য এক জায়গায় পাওয়া মুশকিল। ছয় ও সাতের দশকে নকশাল আন্দোলনের সময় অনেক মানুষ মারা গেছে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে। এর সব হিসাব এক জায়গায় নেই।

গবেষক ও রাজনৈতিক কর্মী ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী নকশাল আন্দোলন নিয়ে তাঁর প্রামাণ্য গ্রন্থ সাতচল্লিশ থেকে সত্তর এবং আগে পরেতে নাম–ঠিকানাসহ লিখেছেন পুলিশের হাতে ১৯৭১ সালের জুলাই থেকে ১৯৭২ সালের জানুয়ারির মধ্যে শুধু বীরভূম জেলাতেই মারা গেছেন অন্তত ৭১ জন। ভারতের অন্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে জাতপাতের লড়াই বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় (দেশভাগ বাদ দিলে) খুব বেশি মানুষ মারা যাননি। কিন্তু রাজনৈতিক হিংসায় মৃত্যু হয়েছে ধারাবাহিকভাবে।

প্রশ্ন হলো, কেন?

একাধিক কারণ রয়েছে। স্বল্প পরিসরে মূল কারণটিই শুধু তুলে ধরছি। কারণটি অর্থনৈতিক, আর খুব পরিষ্কার বললে এর জন্য কংগ্রেসই দায়ী। স্বাধীনতার পর থেকে যত দিন তারা টানা ক্ষমতায় ছিল (১৯৬৭ সাল পর্যন্ত), তত দিন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এমন আর্থিক নীতি বানিয়েছে, যাতে পশ্চিমবঙ্গ একটি দরিদ্র রাজ্যে পরিণত হয়। পশ্চিমবঙ্গ থেকে টাকা বেরিয়ে যায় আর এটি একটি ‘লেবার হাব’ বা শ্রমিক জোগানের কারখানা হিসেবে গড়ে ওঠে, এটাই ছিল কংগ্রেসের লক্ষ্য। গোটা পূর্ব ভারতকে শ্রমিক জোগানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে স্বাধীনতা-উত্তর ভারত।

১৯৫১ সালে কংগ্রেস নিয়ে আসে মাশুল সমীকরণ নীতি। এই নীতি আসার আগে পূর্ব ভারতের খনি থেকে উৎপাদিত খনিজের জন্য পূর্ব ভারতের রাজ্য বিহার বা বাংলা অনেক কম মালগাড়ির মাশুল দিত। এর কারণ, পূর্ব ভারতের খনি থেকে বিহারের পাটনা বা কলকাতার দূরত্ব অনেক কম।

এ জন্য বড় কয়লা বা ইস্পাত কারখানার সদর দপ্তরটি সাধারণত কলকাতায় হতো। দূরত্বের কারণে সে সময়ে সংযুক্ত বোম্বে রাজ্যকে (যার মধ্যে গুজরাটের একাংশও ছিল) অনেক বেশি মাশুল দিতে হতো। কংগ্রেসশাসিত কেন্দ্র সরকার ১৯৫৬ সালে সব রাজ্যের মাশুল এক করে দেয়।

ফলে খনি থেকে দূরের রাজ্য বোম্বেকে যে মাশুল দিতে হতো, বাংলাকেও সেই একই পরিমাণ মাশুল দেওয়া শুরু করতে হলো। ফলে বাংলা তার ‘প্রাইস অ্যাডভান্টেজ’ হারাল, ব্যবসায়ীরা অন্যত্র চলে গেলেন। এ রকম উদাহরণ অনেক।

এর ফলে যা হওয়ার তা–ই হলো। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময়ে মোট জাতীয় শিল্প উৎপাদনের ২৭ শতাংশ আসত পশ্চিমবঙ্গ থেকে। কংগ্রেসের নীতির ফলে ১৯৬০-৬১ সালে এটা কমে দাঁড়াল ১৭ শতাংশে। এ ছাড়া ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৭-এর দেশভাগ, বামপন্থীদের লাগাতার কর্মবিরতি, নকশাল আন্দোলনের প্রভাব তো ছিলই।

পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেসের নেতা বিধানচন্দ্র রায় (১৯৫২-৬২) তাঁর চিঠিতে দিনের পর দিন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে এই দুর্দশার কথা লিখেছেন। সাংবাদিক রণজিৎ রায় তাঁর বইতেও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন কীভাবে কেন্দ্র সর্বনাশ করল পশ্চিমবঙ্গের।

এটাই ভারতের অভ্যন্তরীণ নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ। ইউরোপে শ্রমিক আসে অনুন্নত দেশগুলো থেকে, ভারতের ভেতরে সেটা করা হয়েছে দেশের নির্দিষ্ট অঞ্চলকে গরিব রেখে। কারণ, ভারত একটি আন্তর্জাতিক ঔপনিবেশিক শক্তি নয়, তাই তাকে শ্রমিক জোগাড় করতে হয় নিজেরই অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাজ্য থেকে।

এটা করার জন্য রাজ্য বা অঞ্চলটিকে গরিব করে রাখতে হয়। এটা শুরু করেছিল কংগ্রেস, এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাকিরা। বিজেপি বারবার বলেছে, তারা পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক উন্নতি করতে চায়, কিন্তু অতীতের নীতি নিয়ে মুখ খোলেনি।

এসবের কারণে গ্রামগঞ্জে বেশির ভাগ মানুষের বাঁচার রাস্তা হয়ে দাঁড়াল ‘পার্টি করা’। পার্টিই মানুষের জীবন ও জীবিকা হয়ে উঠল। বাজারে অর্থ নেই, ব্যবসা নেই, চাকরি–বাকরি নেই, ফলে বাঁচালে পার্টিই বাঁচাবে। মানুষ ভুলে যেতে শুরু করলেন পার্টি কোনো ধর্ম নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার একটা প্রক্রিয়া, একটা পদ্ধতি। যে ভালো কাজ করবে, তাকে ভোট দেব—গণতন্ত্রের এই মৌলিক শর্ত থেকে মানুষ সরে গেলেন

ব্যাপারটা এ রকম হয়ে দাঁড়াল, ভালো কাজ করুক বা মন্দ কাজ করুক, পার্টিকে চোখের মণির মতো আগলে রাখতে হবে। কারণ, এই পার্টি থেকেই সংসার চলবে। পার্টির ইচ্ছাতেই তারা এই নির্বাচনে লাগাতার বোমাবাজি, নারী নির্যাতন, ঘরবাড়ি জ্বালানো, প্রতিপক্ষকে মেরে ঝুলিয়ে দেওয়ার কাজ করছেন, অতীতেও করেছেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি ক্রমশ ‘সেক্টারিয়ান’ বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক হয়েছে।

এই গোষ্ঠীকেন্দ্রিক রাজনীতি এখন গোটা ভারতেই বাড়ছে। তবে ভারতে এটা সরাসরি অর্থনৈতিক দুরবস্থার হাত ধরে আসছে না, যদিও অর্থনীতির গতিহীনতা একটা বড় কারণ। ভারতে এই গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতা বাড়ছে ধর্মীয় ভাবাবেগকে কেন্দ্র করে। ফলে পশ্চিমবঙ্গসহ মোটামুটি প্রায় সব রাজ্যেই বাড়ছে হিংসা। এ হিংসার শেষ কোথায় তা এখনই কারও পক্ষে বলা সম্ভব নয়।

শুভজিৎ বাগচি প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।