আমরা লাইভে English বুধবার, মার্চ ০৩, ২০২১

ভুটানের কাছে পরিবেশ সবার আগে, বললেন লোটে শেরিং

ড. লোটে শেরিং

গত সপ্তাহে ভুটান সরকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেগুলো বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রথমটি হলো ভারত, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের পর্যটকদের জন্য ফি-মুক্ত প্রবেশ সুবিধা বাতিল। এটা হলো টেকসই উন্নয়ন ফি (এসডিএফ) ধার্য করা। আর দ্বিতীয়টি, চারজাতি মটরযান চলাচল চুক্তিতে (বিবিআইএন-এমভিএ) যোগ না দেয়ার ব্যাপারে দেশটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ভুটান চুক্তিতে থাকবে শুধু পর্যবেক্ষক হিসেবে।

এই পত্রিকার সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাতকারে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিং তার দেশের সিদ্ধান্তগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে পর্যটক ও মটরযান দূরে রাখতে তাদেরকে আরো কিছু করতে হবে।

নতুন ফি ধার্য করে কি আপনারা পর্যটকদের দূরে রাখতে চাইছেন?

অবশ্যই না। আমরা বরং তাদের উৎসাহিত করতে চাইছি। আমাদের নীতি হলো, ‘উচ্চ মূল্য, নিম্ন আকারে।’ কারণ আমাদের দেশটি ছোট, আমাদের পর্যটক সামাল দেয়ার সামর্থ্যও কম। আমাদের সড়ক কম এবং দেশের ৭২% বনে আচ্ছাদিত। এটা আমরা আরো বাড়াতে চাচ্ছি।

আগামীতে ভারতসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দেশ থেকে অনেক পর্যটক আসবে। গত কয়েক বছরে তাদের সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে কয়েক শত হাজারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের অর্থের ভালো মূল্য দিতে তাদেরকে আরো ভালো ব্যবস্থা উপহার দিতে হবে। তাদেরকে আমরা ছড়িয়ে দিতে চাই। ফলে ২০টি গন্তব্যস্থলের মধ্যে মধ্য ও পূর্ব ভুটানের ১১টিতে গেলে কোন এসডিএফ লাগবে না। শুধু পশ্চিমের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর জন্য ফি দিতে হবে।

তারপরও পর্যটকদের উপর এই ফি ধার্য করায় তা কি ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না?

আসল উদ্বেগের বিষয়টি হলো আমরা হাজার হাজার পর্যটককে খাওয়াতে পারবো কিনা। আরো বড় উদ্বেগ হলো আঞ্চলিক পর্যটকরা যদি মটরযান দুর্ঘটনার শিকার হন, সেটা। তাই পরিণামে আমাদের দুই প্রতিবেশির ভালো সম্পর্কে শুধু মূল্য-সংযোজন ঘটবে বলে আমি মনে করি। ১,২০০ রুপি কোন সমস্যা না। বেশিরভাগ ভারতীয় পর্যটকের এই অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য রয়েছে।

ভারতীয়রা নোংরা করছে, পবিত্র জায়গাগুলো অপবিত্র করছে, ভুটানের স্থানীয় ঐহিত্যের তোয়াক্কা করছে না বলে ভুটানের মিডিয়ায় অভিযোগ করা হয়। এগুলো কি বড় করে দেখানোর বিষয়?

এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, আমাদের লেভি আরোপের সিদ্ধান্তের সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক নেই। নুতন পর্যটন নীতিমালার কারণে আঞ্চলিক পর্যটকদের উন্নতমানের সেবা প্রদান সম্ভব হবে আমাদের পক্ষে। তখন এসব ঘটনা ঘটবে না বলে আমি মনে করি। 

এই সিদ্ধান্তের কারণে পর্যটক কমে গেলে ভুটানের স্থানীয় হোটেল শিল্পের কী হবে?

হ্যা, এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি এটা হবে সাময়িক এবং শেষ পর্যন্ত কোন নেতিবাচক প্রভাব আর থাকবে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সামান্য কিছু কমলেও পর্যটক সংখ্যা তেমন কমবে না। দামি হোটেলগুলোর কোন সমস্যা নেই, সমস্যা হলো বাজেট হোটেলগুলোকে নিয়ে। তাদেরকে কিভাবে উন্নত করা যায় সে বিষয়ে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলবো। যেকোন সমস্যা কাটানোর জন্য আমাদেরকে আর্থিক নীতি নতুন করে সাজাতে হবে।

ভুটান কি বাংলাদেশ-ভুটান-ইন্ডিয়া-নেপাল মটর ভেহিকেল এগ্রিমেন্ট (বিবিআইএ-এমভিএ) পুনর্বিবেচনা করবে?

এই চুক্তির বাইরে থাকার ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত পর্যটন ফি বাড়ানোর মতো একই: ভুটানের মধ্য দিয়ে ট্রাক চলাচলের সুবিধা দেয়ার মতো অবকাঠামো আমাদের নেই। কখনো আমাদের অবকাঠামো উন্নত হলে, অর্থনীতি জোরদার হলে, বাণিজ্য বাড়লে তখন আমরা অবশ্যই এই চুক্তির অংশীদার হবো। এখন যে অবকাঠামো রয়েছে তা দিয়ে নিজেদের চাহিদাই পূরণ করতে পারছি না। ফলে এই চুক্তির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকার পরও এই মুহূর্তে আমরা এটি বিবেচনা করতে পারছি না।

ভুটান কার্বন নেগেটিভ দেশ, আর গাড়ি হলো সবচেয়ে বড় গ্রিনহাউজ গ্যাস নি:সরণকারী। তাই আমরা বেশি পর্যটক নিতে পারি না। বিবিআইএন-এমিভএ-এর অংশও হতে পারি না। এটাই হলো ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ (জিএনএইচ)-এর মূল চেতনা। সবকিছু শুধু টাকা দিয়ে মাপলে হবে না।

এটা করে ভুটান নিজেকে অভিজাত হিসেবে দেখাতে চায়, এ ব্যাপারে আপনি কি বলবেন?

আপনি কিভাবে দেখাবেন সেটা আপনার বিষয়। পর্যটন দিয়ে আমরা শুধু টাকা কামাতে চাই না। আমরা ভুটান ব্রান্ড তৈরি করতে চাই, যেন পর্যটকরা বার বার আসেন। ভুটান অর্থনৈতিকভাবে গরীব হতে পারে কিন্তু আমরা আমাদের পরিবেশকে সবচেয়ে অগ্রাধিকার দেই। এ নিয়ে আমরা গর্ব করি। এ জন্য যে কেউ সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা আমাদের নীতিতে অবিচল।